কেন্দ্রীয় ব্যাংকে শরীয়াহ বোর্ড গঠন: ইসলামী ব্যাংকিং খাতে নতুন দিগন্তের সূচনা
সানবিডি২৪ প্রকাশ: ২০২৫-১০-২০ ১০:৫৭:২৫
মোঃ খায়রুল হাসান, সিএসএএ: আশির দশকের গোড়ার দিকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংক ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। সেসময় অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে এই ব্যবস্থার সূচনা হলেও আজ তা দেশের অন্যতম প্রভাবশালী আর্থিক খাতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকসহ ৩১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকিং শাখা ও উইন্ডোর মাধ্যমে শরীয়াহভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। শুরু থেকে জনগণের আস্থা, চাহিদা ও সম্পৃক্ততা থাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের মূলধারার আর্থিক খাতে পরিণত হয়েছে ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থা। দীর্ঘ চার দশক ধরে এই খাতটি দেশের অর্থনীতিতে জোড়ালো ভূমিকা রাখলেও কেন্দ্রীয়ভাবে শরীয়াহ পরিপালন তদারকির জন্য কোনো স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ বা বোর্ড ছিল না। অবশেষে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক সেই ঐতিহাসিক শূন্যতা পূরণের উদ্যোগ নিয়েছে।
ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ও প্রেক্ষাপট
গত ৬ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের ৪৪৪তম বোর্ড সভায় “বাংলাদেশ ব্যাংকের শরীয়াহ অ্যাডভাইজরি বোর্ড (এসএবি)” গঠনের নীতিমালা অনুমোদিত হয়েছে। “বাংলাদেশ ব্যাংকের শরীয়াহ অ্যাডভাইজরি বোর্ডের গঠন, সদস্য নিয়োগ–অপসারণ ও দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কিত নীতিমালা–২০২৫”শিরোনামের এই প্রস্তাবটি ইসলামী ব্যাংকিং খাতে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য মুসলিমপ্রধান দেশ যেমন-মালয়েশিয়া, বাহরাইন, পাকিস্তান, ওমান, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে-দীর্ঘদিন ধরেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে শরীয়াহ বোর্ড কার্যকরভাবে কাজ করছে। সেখানে এ বোর্ড ব্যাংকগুলোর জন্য অভিন্ন শরীয়াহ মানদণ্ড নির্ধারণ, ফতোয়া প্রদান, প্রোডাক্ট অনুমোদন, শরীয়াহ অডিট নির্দেশনা এবং খাতজুড়ে একীভূত নীতি প্রণয়নে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশেও এ ধরনের একটি বোর্ড গঠনের দাবি দীর্ঘদিনের। ইসলামী ব্যাংকিং খাতে শরীয়াহ পরিপালনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, অডিটের মানোন্নয়ন, এবং জনআস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য এটি সময়োপযোগী ও অপরিহার্য সিদ্ধান্ত।
গঠন ও কার্যপরিধি
নীতিমালা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সাত সদস্যের একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ শরীয়াহ অ্যাডভাইজরি বোর্ড (এসএবি) গঠন করবেন, যার অন্তত পাঁচজন হবেন প্রখ্যাত শরীয়াহ স্কলার। বোর্ডের মেয়াদ হবে তিন বছর; তবে টানা ছয় বছর দায়িত্ব পালন শেষে দুই বছর বিরতি ছাড়া পুনঃনিয়োগ সুযোগ থাকবে না। সদস্যদের যোগ্যতা হিসেবে দাওরায়ে হাদিস, কামিল, ইসলামি অর্থনীতি, ফিকহ, ইসলামি ব্যাংকিং বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রিধারী হতে হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, ফতোয়া বোর্ডে কাজের অভিজ্ঞতা, কিংবা ইসলামি ফাইন্যান্স বিষয়ে গবেষণা ও প্রকাশনার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। বোর্ডের চেয়ারম্যান মনোনীত করবেন গভর্নর। বাংলাদেশ ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের পরিচালক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, তবে তাঁর ভোটাধিকার থাকবে না। বোর্ড বছরে অন্তত তিনবার সভা করবে, প্রয়োজন হলে বিশেষ সভাও আহ্বান করতে পারবে।
দায়িত্ব ও কর্তব্য
কেন্দ্রীয় শরীয়াহ বোর্ডের দায়িত্ব হবে ইসলামী ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্স খাতে শরীয়াহ মানদণ্ড প্রণয়ন, শরীয়াহ কমপ্লায়েন্স যাচাই, নতুন পণ্য বা চুক্তি যাচাই-বাছাই, এবং শরীয়াহ–সংক্রান্ত জটিল বিষয়ের নিষ্পত্তি। এছাড়া ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ ২০২৫–এর অনুচ্ছেদ ১৬ অনুযায়ী ইসলামি ব্যাংকের রেজুলেশনে পরামর্শ প্রদানের ক্ষমতাও থাকবে এ বোর্ডের। প্রতি বছর বোর্ডের কার্যক্রম ও সুপারিশের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি বার্ষিক শরীয়াহ কমপ্লায়েন্স প্রতিবেদন প্রকাশ করবে, যা সাধারণ জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এই বোর্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হবে শরীয়াহ সুপারভাইজরি কমিটি (এসএসসি)–গুলোর তদারকি করা। ব্যাংকভিত্তিক এই কমিটিগুলো শরীয়াহ পরিপালনের দৈনন্দিন বিষয়গুলো দেখবে, আর কেন্দ্রীয় বোর্ড তাদের দিকনির্দেশনা ও নীতিগত সমন্বয় করবে।
শরীয়াহ সুপারভাইজরি কমিটি (এসএসসি): তদারকির নতুন কাঠামো
বাংলাদেশ ব্যাংক এর আগে ২৮ সেপ্টেম্বর ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য শরীয়াহ সুপারভাইজরি কমিটি (এসএসসি) সংক্রান্ত একটি নতুন নীতিমালা জারি করেছে, যা ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। এই নীতিমালায় বলা হয়েছে প্রতিটি ব্যাংকে ৩ বা ৫ সদস্যবিশিষ্ট স্বাধীন ও যোগ্য শরীয়াহ কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক। সদস্য হতে হলে প্রার্থীর দাওরায়ে হাদিস, কামিল, ইসলামিক স্টাডিজ, ইসলামী অর্থনীতি, ফিকহ বা ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ে ডিগ্রি থাকতে হবে এবং কমপক্ষে দুই বছরের শিক্ষকতা, ইফতা বা ব্যাংকিং সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এসএসসি সদস্যদের কাজ হবে ব্যাংকের সকল পণ্য, চুক্তি, নীতি, মুনাফা হিসাব ও যাকাত ব্যবস্থার শরীয়াহ স্ট্যান্ডার্ড নিশ্চিত করা। কোনো ক্ষেত্রে শরীয়াহ নন–কমপ্লায়েন্স পাওয়া গেলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাংক ব্যবস্থাপনাকে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেবেন এবং প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করবেন। প্রতিটি ব্যাংকে একটি শরীয়াহ সচিবালয়ও থাকবে, যা কমিটিকে সহায়তা করবে এবং শরীয়াহ অডিট পরিচালনা করবে।
গভর্ন্যান্স ও গোপনীয়তা রক্ষা
কেন্দ্রীয় বোর্ড ও ব্যাংকভিত্তিক কমিটির সদস্যদের গোপনীয়তা রক্ষায় কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সদস্যদের এনডিএ (নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট) সই করতে হবে। একইসঙ্গে, কোনো সদস্য ব্যাংকের পরিচালক, ঋণখেলাপি বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকানার সঙ্গে যুক্ত থাকলে তিনি বোর্ডের সদস্য হতে পারবেন না। এতে বোর্ডের নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও নৈতিক মর্যাদা রক্ষিত হবে, যা ইসলামী অর্থনীতির মূল ভিত্তি।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত ও বাংলাদেশের অবস্থান
মালয়েশিয়ার ব্যাংক নেগারা’র শরীয়াহ অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল দীর্ঘদিন ধরে একটি কার্যকর মডেল হিসেবে বিবেচিত। তাদের নীতিগত দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ওমান প্রভৃতি দেশেও কেন্দ্রীয় শরীয়াহ বোর্ড সফলভাবে কাজ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও জানিয়েছে, তারা ইসলামিক ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস বোর্ড (আইএফএসবি) ও অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড অডিটিং অর্গানাইজেশন ফর ইসলামিক ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস (আওফি)–এর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে এই কাঠামো তৈরি করেছে। এর ফলে, বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং খাত বৈশ্বিক শরীয়াহ মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় ইসলামী ব্যাংকগুলোর গ্রহণযোগ্যতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
নতুন এ কাঠামো ইসলামী ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিগত দশকে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মধ্যে অনিয়ম, লেনদেনে শরীয়াহ বিচ্যুতি ও শাসন সংকটের অভিযোগ উঠেছিল যা খাতটির বিশ্বাসযোগ্যতাকে আঘাত করেছিল। কেন্দ্রীয় শরীয়াহ বোর্ড সেই বিশ্বাস পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি করবে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে বোর্ডের কার্যকরী ক্ষমতা, সদস্যদের স্বাধীনতা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত দৃঢ়তার ওপর। এছাড়া শরীয়াহ স্কলার ও ব্যাংক ব্যবস্থাপনার মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, পেশাদার সমন্বয় ও সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি। না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন কঠিন হবে।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের শরীয়াহ অ্যাডভাইজরি বোর্ড গঠন শুধু একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয় এটি ইসলামী ব্যাংকিং খাতে নৈতিক পুনর্জাগরণের সূচনা যা খাতটির স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনআস্থা বাড়াবে; একইসঙ্গে শরীয়াহ অনুশাসনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে। ইসলামী ব্যাংকিং এখন আর নিছক ধর্মভিত্তিক সেবা নয়; এটি বাংলাদেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি এবং নৈতিক অর্থনীতির এক অপরিহার্য স্তম্ভ। কেন্দ্রীয় শরীয়াহ বোর্ডের এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে ইসলামী ব্যাংকিং খাতকে আরও টেকসই, বিশ্বাসযোগ্য ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
লেখক: শরীয়াহ গভর্নেন্স বিশেষজ্ঞ ও আর্থিক যোগাযোগ প্রফেশনাল। ইমেইল-hasan.khairul@gmail.com






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন














