ভুল বিনিয়োগের মাশুল দিচ্ছে আইসিবি
আপডেট: ২০২৬-০১-১৪ ২০:২৪:০৮
এক সময়ের লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ব বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) এখন পরিণত হয়েছে লোকসানি কোম্পানিতে। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা পাওয়া এই সংস্থা বিনিয়োগ সক্ষমতা হারিয়ে এখন প্রায় রুগ্ন। ভুল বিনিয়োগের খেসারত দিতে উচ্চ হারে রাখতে হচ্ছে নিরাপত্তা সঞ্চিতি। ফলে বিপুল অংকের লোকসান গুণতে হচ্ছে আইসিবিকে। সেইসাথে দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানত রাখায় তা ফেরত পেতে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। এমতাবস্থায় সরকারের কাছ থেকে একের পর এক ঋণে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে সংস্থাটি।
সমাপ্ত অর্থবছরে রেকর্ড লোকসান
সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আইসিবি রেকর্ড ১ হাজার ২১৪ কোটি টাকা লোকসান করেছে। এতে শেয়ার প্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৪ টাকা। ফলে সর্বশেষ অর্থবছর শেষে শেয়ারহোল্ডারদের কোন লভ্যাংশ দেয়নি সংস্থাটি। আইসিবির ক্ষেত্রে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ না দেওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেও এই প্রতিষ্ঠানের লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৫১ কোটি টাকা।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০-২০২১ অর্থবছরে আইসিবির নিট মুনাফা ছিল ১১৫ কোটি ৩৩ লাখ। পরের অর্থবছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকায়। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে সেটি কমে হয় ৭৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। আর ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের নিট মুনাফা ছিল ৭৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।
দুর্বল ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানে আটকে আছে আমানত
দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রায় হাজার কোটি টাকার আমানত রেখেছে আইসিবি। একের পর এক নোটিশেও ফেরত পাওয়া যায়নি আমানত। বরং আমানত রাখা ৭টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এখন বন্ধের অপেক্ষায়। ফলে এসব আমানত নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরণের অনিশ্চয়তা।
আইসিবির আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১টি ব্যাংক ও ১০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আইসিবির ফিক্সড ডিপোজিট রিসিট (এফডিআর) হিসেবে আমানতের পরিমাণ ৯২৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে পদ্মা ব্যাংকে রয়েছে ১৬২ কোটি ২১ লাখ টাকা। পাশাপাশি ১০টি দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সংস্থাটির মোট আমানতের পরিমাণ ৭৬৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি যে ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের ৭টিতেই আইসিবির আমানত রয়েছে। বন্ধ হতে যাওয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাখা আমানতের পরিমাণ ৪৫২ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও খেলাপি ঋণের ভারে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা এখন অস্তিত্ব সংকটে। ফলে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না এসব প্রতিষ্ঠান।
আইসিবির আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি ব্যাংক পদ্মা ব্যাংকে ১৬২ কোটি ২১ লাখ টাকার আমানত রয়েছে। আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমানত রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে। প্রতিষ্ঠানটিতে আইসিবির আমানতের পরিমাণ ১৯১ কোটি ৬০ লাখ। পাশাপাশি ফারইস্ট ফাইন্যান্সে ৭৪ কোটি ২২ লাখ, এফএএস ফাইন্যান্সে ৫৬ কোটি ৯৪ লাখ ও আভিভা ফাইন্যান্স লিমিটেডে ৫০ কোটি ১২ লাখ টাকার আমানত রয়েছে। এছাড়াও বন্ধের তালিকায় থাকা প্রিমিয়ার লিজিংয়ে ৪৭ কোটি ২৯ লাখ, পিপলস লিজিংয়ে ২৫ কোটি টাকা এবং প্রাইম ফাইন্যান্সে ৭ কোটি ২৩ লাখ টাকার আমানত রয়েছে।
এ বিষয়ে আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, “যেগুলো দুর্বল ব্যাংকে আছে, এগুলো আসলে একটু বেশি সুদের জন্য রাখা হয়েছিল। যারা রেখেছে তারা বলে যে এগুলো তো ভালো কোম্পানি ছিল। এখন তো ওরা কলাপস করছে। এতদিন তো এগুলো রিসিভেবলস হিসাবে দেখানো হতো। ইদানিং তো দেখি ওই তালিকার মধ্যে নয়টা বন্ধ হতে যাওয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলে সরকার শেয়ার দিতেও পারে বা আমানত ফেরত দিতে পারে।
আমানত ফেরতের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে অনেকবার বৈঠক করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “কখনো কখনো কেউ কেউ সামান্য দিয়েছে, আবার কেউ কেউ দেয়নি। অধিকাংশই কিছুই দেয়নি। গত দুই বছরে আবার কেউ সামান্য সামান্য দিয়ে রেগুলারাইজ করেছে। আসলে এগুলো আগে নিয়ে নেওয়া উচিত ছিল। আর এসব প্রতিষ্ঠানে আমানত রাখাও ঠিক হয়নি।”
এসব আমানত রাখার ক্ষেত্রে কোন অনিয়ম হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “তাদের একটা আর্গুমেন্ট আছে যে, এসব আমানত তো তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে এবং আমাদের লাভের জন্য রেখেছিলাম। এক্ষেত্রে কোন অনিয়ম হয়েছে বলে দেখি নাই। এটা আমার পক্ষে দেখা সম্ভব না, এগুলো আমার কাজ না। অনিয়ম হয়ে থাকলে যারা এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয় তারা দেখতে পারে।”
সচল রাখতে হাজার কোটি টাকার ঋণ সরকারের
এদিকে প্রতিষ্ঠানটির এমন অবস্থায় সরকারের কাছ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা চেয়েছিল। তবে গত বছরের নভেম্বরে সরকার এক হাজার কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে। ঋণে কিছু শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। পৃথক একটি হিসাব পরিচালনা করে এই অর্থ সংরক্ষণ করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি সুদযুক্ত এ ঋণ আগামী ১০ বছরে (১ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ) পরিশোধ করতে হবে। এতে সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ শতাংশ এবং ষাণ্মাসিক কিস্তিতে তা পরিশোধ করতে হবে। এছাড়া বরাদ্দকৃত অর্থ অনুমোদিত ব্যয় খাত ব্যতীত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যয় করা যাবে না মর্মে শর্ত দেওয়া হয়েছে। এই ঋণের জামিনদার হলো বাংলাদেশ সরকার। অর্থাৎ, কোনো কারণে আইসিবি ঋণের অর্থ ফেরত দিতে না পারলে সরকারকে তা পরিশোধ করতে হবে। এর আগেও ২০২৪ সালের নভেম্বরে বিশেষ তহবিল থেকে তিন হাজার কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়েছিল, যার জামিনদার ছিল সরকার। আইসিবি চলমান সংকট কাটাতে ১০ হাজার কোটি টাকা না পেলেও প্রাপ্ত ১ হাজার কোটিতে তারল্য সংকট কিছুটা হলেও কমবে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ।
তবে আইসিবিকে সঠিক পথে আনতে ভুল বিনিয়োগের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নীতি নির্ধারণ করা ও তা মনিটরিং করার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পুঁজিবাজার সংস্কার টাস্কফোর্সের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আল আমিন বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে সঠিকভাবে এসেস করে এবং সেখানে ইনভেস্টমেন্টের একটা পলিসি করে দেওয়া যে কোন ধরনের শেয়ারে বিনিয়োগ করা যাবে। বেশি দামে শেয়ার কেনার জন্য সেই পর্ষদকে জবাবদিহির আওতায় আনা যে কি কারণে এটা কিনতে হয়েছিল বা এর পেছনে কোন চক্রের হাত আছে কিনা। এই বিষয়গুলো একটা ভিন্ন মনিটরিং সেল পর্যবেক্ষণ করতে পারে। সেইসাথে যদি ভালো রিসার্চ টিম থাকে যারা এনালাইসিস করে প্রস্পেক্ট দেখে বিনিয়োগ করবে। এসবের সমন্বয়ে যদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন বাজারে আইসিবির যে ভূমিকা সেটা রাখতে পারবে। নাহলে এরকম সরকার যতই প্রণোদনা দিক বা যতই বিশেষ সহায়তা দিক তা মার্কেটের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।”
এএ






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













