বোরহানউদ্দিনে ডজনখানেক আওয়ামী লীগ নেতার ধানের শীষে ভোট চাওয়া: ভয় নাকি লোভ?

জেলা প্রতিনিধি আপডেট: ২০২৬-০২-০৬ ১২:২১:৪০


ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিনে আওয়ামীলীগের ডজনখানেক নেতাকে দেখা যাচ্ছে বিএনপির প্রার্থী হাফিজ ইব্রাহিমের পক্ষে তথা ধানের শীষের প্রচারণা করতে। যার ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও এলাকাজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। জনমনে প্রশ্ন জেগেছে যে তারা কি ভয়ে বিএনপির প্রচারণায় নেমেছে নাকি লোভে?

তাদেরই একজন টবগী ইউনিয়নের বিএনপির পরিচিত মুখ সরোয়ার হাওলাদার। তিনি ২০১৭ সালের এক দুপুরে আওয়ামী লীগের মঞ্চে উঠে দলটিতে যোগদান করেন। সেদিন তিনি শুধু যোগদানই করেননি বরং রাজনৈতিক শিষ্টাচারের বাইরে গিয়ে বিএনপির সাবেক এমপি হাফিজ ইব্রাহিমকে উদ্দেশ্য করে খুবই বাজে মন্তব্য করেন। সেই মঞ্চে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে নিয়েও রুচিহীন মন্তব্য করেন তিনি।

এ ঘটনায় পুরো টবগী ইউনিয়ন বিএনপির মধ্যে হতাশার ছাপ পড়ে। যারা তখনও ত্যাগী বিএনপি কর্মী ছিলেন, তাদের নানা সময়ে বিভিন্ন ধরনের কটূক্তি করতেন সরোয়ার হাওলাদার। সেই সরোয়ার হাওলাদারই ২০২৪ সালের পরিবর্তনের পর বিএনপির সঙ্গে ঘেঁষতে শুরু করেন। হঠাৎ করে সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে হাফিজ ইব্রাহিমের উঠান বৈঠকেও উপস্থিত হয়ে ভোট চাওয়া শুরু করেন।

গত সপ্তাহে বোরহানউদ্দিনের টবগী ইউনিয়নের এক উঠান বৈঠকে সরোয়ার হাওলাদার বলেন, আমি নিজের স্বার্থেই আওয়ামী লীগে যোগদান করেছি। আমি আওয়ামী লীগে যোগদান না করলে হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হতে পারতাম না। যোগদানের আগে হাফিজ ইব্রাহিমের সঙ্গে আলাপ করেই করেছি—নেতা আমাকে বলেছেন, তোর যেটা ভালো সেটা কর।

তিনি ওই উঠান বৈঠকে উপস্থিত বিএনপির ত্যাগী নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, আমাকে কিছু দিতে পারলে পারবে হাফিজ ইব্রাহিম। সেজন্য আমি রফেজ হাওলাদার ও খোকন হাওলাদারের মাধ্যমে না গিয়ে এমপির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করছি।

এ সময় তিনি আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজির কারণে দলটির পতন হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের এমন পরিস্থিতি কেউ জানত? আওয়ামী লীগের ওপর স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকে গজব পড়েছে।

সরোয়ার হাওলাদারের এমন বক্তব্যের পর একদিকে যেমন বিএনপির ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, অপরদিকে আওয়ামী লীগের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন—আবার সুযোগ পেলে বোরহানউদ্দিনে আওয়ামী লীগ নেতা মুকুলের বাসায় কিভাবে উপস্থিত হন, সেটাও সবাই দেখবে বলে এমন কিছু ছাত্রলীগ নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

শুধু সরোয়ার হাওলাদার নন, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপিতে ঘেঁষেছেন বোরহানউদ্দিন উপজেলা আওয়ামী লীগের ডজনখানেক নেতাকর্মী। তারা কাগজে-কলমে বিএনপিতে যোগদান না করলেও বিএনপির বিভিন্ন উঠান বৈঠকে উপস্থিত হয়ে সরাসরি ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাইছেন। এতে অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—নতুন করে বিএনপিতে আওয়ামী লীগের নেতাদের যাওয়া কি ভয়, নাকি লোভ থেকে?

অন্যদিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শাহাজাদা মিয়া তালুকদার দেউলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন। সম্প্রতি তাকেও দেখা গেছে বিএনপির ধানের শীষের উঠান বৈঠকে উপস্থিত হয়ে ভোট চাইতে।এ সময় তিনি সূরা বাকারা থেকে একটি আয়াত তিলাওয়াত করে তার বাংলা অনুবাদও করেন।

তার এমন বক্তব্যের পর পুরো উপজেলায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই তাকে উদ্দেশ করে দালাল, দুই মুখো, পল্টিবাজসহ নানা ধরনের মন্তব্য করেন।

এছাড়া বোরহানউদ্দিনের টবগী ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতা জসিম হাওলাদার ছোটবেলা থেকেই ছাত্রলীগ ও পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থনেই টবগী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তাকেও গতকাল বৃহস্পতিবার বিএনপির এক উঠান বৈঠকে দেখা যায়।

বিএনপির আয়োজিত ওই উঠান বৈঠকে উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে আপনারা সবাই কেন্দ্রে উপস্থিত হবেন এবং আলহাজ হাফিজ ইব্রাহিমকে ধানের শীষে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবেন।

বিএনপির বৈঠকে উপস্থিত এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা বাধ্য হয়ে এই বৈঠকে উপস্থিত হয়েছি। জানিনা আগামীতে কোন দল ক্ষমতায় আসবে। কিন্তু বিএনপির সভায় না গেলে সামনে যদি তারা ক্ষমতায় আসে, তাহলে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। সেই বিবেচনায় উপস্থিত হতে হয়েছে।

সর্বশেষ বিএনপির সভায় গিয়ে যুক্ত হয়েছেন কাচিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের অন্যতম সদস্য রব কাজী। কুঞ্জিরহাট বাজারে তার ব্যাপক ব্যবসায়িক কার্যক্রম রয়েছে। তিনিও বিএনপির উঠান বৈঠকে গিয়ে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চেয়েছেন।

ছাত্রদলের নেতা আসিফ চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে লেখেন, যার বিএনপিতে ভোট দেওয়ার কারণে নোয়াখালিতে এক নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিল, সেই আওয়ামী লীগ যদি বিএনপির মিছিল বা মিটিংয়ে যায়—তাহলে সেই আওয়ামী লীগ বিএনপিকে ভোট দেবে, এটা বিশ্বাস হয় না।

অন্যদিকে ছাত্রলীগের নেতা আল-আমিন মির্ধা বলেন, আপনাদের এত জনপ্রিয়তা, এত ভোট থাকলে আওয়ামী লীগের কাছে ভোট চাইতে হয় কেন? কেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের দিয়ে ভোট চাইতে হয়?

এ বিষয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের এক সহ-সভাপতি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে আমাদের আওয়ামী লীগের কোনো নেতা এলাকায় নেই। এরপর থেকে আমাদের অনেক কর্মীর মোটরসাইকেল বিএনপির কর্মীরা নিয়ে নিয়েছে। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য নামমাত্র চলছে। অনেককে বৈঠকে উপস্থিত হতে বাধ্য করা হয়েছে। যারা আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দিয়েছে এবং কর্মীদের মামলা দিয়ে হয়রানি করছে, তাদের কোনোভাবেই আওয়ামী লীগের ভোট পাওয়ার সুযোগ নেই।

বিএইচ