পুঁজিবাজারে অনিয়মের তথ্য প্রদানকারীর সুরক্ষা নিশ্চিতে বিধিমালা, থাকছে আর্থিক প্রণোদনা
আপডেট: ২০২৬-০৩-০১ ২২:০২:১৮
পুঁজিবাজারে সংঘটিত অনিয়ম ও কারসাজির ব্যাপারে তথ্য প্রদানকারী ব্যক্তির সুরক্ষা নিশ্চিতে বিধিমালা প্রণয়ন করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ‘পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ ও তথ্য প্রকাশকারীর (whistleblower) সুরক্ষা প্রদান বিধিমালা, ২০২৬’শিরোনামে এই বিধিমালার খসড়া গত ১৭ ফেব্রুয়ারী কমিশন সভায় অনুমোদন করা হয়েছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এই বিধিমালার উপরে মতামত, আপত্তি ও পরামর্শ আহ্বান করেছে বিএসইসি।
সংস্থাটি জানিয়েছে, কমিশন কর্তৃক নিবন্ধন সনদ প্রাপ্ত কোনো বাজার মধ্যস্থতাকারী বা কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি বা নিবন্ধিত কোনো ফান্ড সংশ্লিষ্ট দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি দ্বারা অনিয়ম, বিধি লঙ্ঘন বা অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটতে পারে। এসব অনিয়মের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোন ব্যক্তি তথ্য প্রদান করতে পারবেন। এজন্য তথ্য প্রকাশকারী ব্যক্তির সুরক্ষা নিশ্চিতে এই বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
যা আছে বিধিমালায়:
বিধিমালায় তথ্য প্রকাশের পদ্ধতি, তথ্য প্রকাশকারীর অধিকার, তথ্য প্রকাশের পদ্ধতি, তথ্য প্রকাশকারীর সুরক্ষা এবং তথ্য প্রকাশের জন্য আর্থিক প্রণোদনা বা সম্মাননার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিধিমালার শুরুতে ২ নং ধারায় অপরাধের ধরণ বর্ণনা করা হয়েছে। এতে সিকিউরিটিজ আইন ও বিধি-বিধান লঙ্ঘন,প্রতারণামূলক কার্যক্রম,সুবিধাভোগী ব্যবসা (ইনসাইডার ট্রেডিং),বাজার কারসাজি (মার্কেট ম্যানিপুলেশন), অসদুপায়ে বা অন্য কোনো উপায়ে কোনো সিকিউরিটি ক্রয় বা বিক্রয়কে কোনো ব্যক্তির সুবিধার দিকে প্রলুদ্ধ বা প্রভাবিত করা। এছাড়াও অর্থ আত্মসাৎ, অর্থের অপব্যবহার ও অর্থ পাচারসহ কমিশন কর্তৃক সময় সময় নির্ধারিত অন্য যে কোনো বিষয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
৩ নম্বর বিধিতে উল্লিখিত অপরাধের বিষয়ে তথ্য প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো তথ্য প্রকাশকারী দায়িত্বরত বা চাকুরিরত বা চুক্তিবদ্ধ অবস্থায় উল্লিখিত অপরাধের বিষয়ে অবহিত থাকলে তিনি এই বিধিমালায় বর্ণিত পন্থায় উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের নিকট তথ্য প্রকাশের অধিকারী হবেন।
বিধিমালার ৪ নম্বর ধারায় তথ্য প্রকাশের পদ্ধতি উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লিখিত পদ্ধতি অনুযায়ী, তথ্য প্রকাশকারী ফরম-১ এ অনিয়মের বিষয়ে যেকোন তথ্য কর্তৃপক্ষের নিকট, লিখিতভাবে, সরাসরি হাতে হাতে, ডাকযোগে বা যেকোন ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে প্রেরণ করতে পারবে। এক্ষেত্রে প্রথ্যেকটি তথ্য প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয় এমন সহায়ক দলিল বা উপকরণ দ্বারা সমর্থিত হতে হবে।
৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী তথ্য প্রকাশকারীর সুরক্ষা প্রদান করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি তথ্য প্রকাশ করলে উক্ত ব্যক্তির সম্মতি ব্যতীত এবং আইনি প্রয়োজন না হলে তাঁর পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না। সেইসাথে তথ্য প্রকাশকারী কোনো চাকুরীজীবী হলে তথ্য প্রকাশ করার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না যাতে তাঁর মানসিক, আর্থিক বা সামাজিক সুনামের জন্য ক্ষতিকর হয়।
এই বিধিমালার ৪ ধারার অধীনে প্রকাশিত তথ্য কোনো মামলায় সাক্ষ্য হিসাবে ব্যবহার করা যাবে না। তথ্য-প্রকাশকারীকে প্রকাশিত তথ্য সংক্রান্ত কোনো মামলায় সাক্ষী করা যাবে না এবং মামলার কার্যক্রমে এমন কোনো কিছু প্রকাশ করা যাবে না যাতে উক্ত ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ পায়। মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ সংশ্লিষ্ট কোনো বই, দলিল বা কাগজপত্রে যদি এমন কিছু থাকে, যাতে তথ্য প্রকাশকারীর পরিচয় লিপিবদ্ধ থাকে, তাহলে আদালতে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে উক্ত বই, দলিল বা কাগজপত্রের যে অংশে পরিচয় লিপিবদ্ধকৃত আছে সেই অংশ গোপন রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৬ নম্বর বিধি অনুযায়ী বর্ণিত কার্যক্রম পরিচালনায় জন্য কমিশনের অতিরিক্ত পরিচালক পদমর্যাদার নিচে নয় এমন একজন কর্মকর্তাকে ডেজিগনেটেড অফিসার হিসেবে মনোনীত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁর দায়িত্ব যথাযথভাবে সম্পাদনের জন্য একটি দপ্তর প্রতিষ্ঠা করার কথা বলা হয়েছে। দপ্তরের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মকর্তা পদায়ন করতে হবে। এছাড়াও কর্তৃপক্ষ ডেজিগনেটেড অফিসারের দপ্তরের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা বিষয়ক প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রধানের ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।
৭ নম্বর বিধি অনুযায়ী বিধিমালায় উল্লিখিত দপ্তরে ফরম-২ অনুযায়ী একটি রেজিস্টারে তথ্য প্রকাশকারীর ব্যক্তিগত তথ্যসহ আনুসঙ্গিক তথ্য গোপনীয়ভাবে সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। এই তথ্য যাতে প্রকাশ না পায় সেজন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তথ্যের গোপনীয়তা ক্ষুন্ণ হলে প্রকাশিত তথ্য সম্পর্কে জানেন এমন প্রত্যেক কর্মকর্তা দায়ী হবেন।
ফরম-৩ এ কমিশন মনোনীত কর্মকর্তা প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির তথ্য লিপিবদ্ধ করে গোপনীয়ভাবে সংরক্ষণ করবে। পরবর্তীতে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই বাছাই করে প্রাথমিক প্রতিবেদন ফরম-৪ অনুযায়ী তৈরি করবে। সর্বশেষ ফরম-৫ অনুযায়ী একটি মূল্যায়ণ প্রতিবেদন তৈরি করে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের নিকট উপস্থাপন করবে।
বিধিমালার ধারা ৮ এ প্রাথমিক পর্যালোচনার ক্ষেত্রে অনুসরণীয় পদ্ধতি ও ধারা ৯ তে অনুসন্ধান বা তদন্ত কার্যক্রম ও অনুসরণীয় পদ্ধতি উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও ১৫ নম্বর বিধিতে তথ্য প্রকাশের জন্য আর্থিক প্রণোদনা বা সম্মাননার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে অর্থ বা জরিমানা আদায় হলে সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রকাশকারীকে আদায়কৃত জরিমানা বা অর্থদন্ডের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ প্রদান করতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে আর্থিক প্রণোদনার পরিমাণ কোনক্রমেই ১০ কোটি টাকার বেশি হবে না।
এ বিষয়ে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম সানবিডিকে বলেন, অনেক সময় বাজার সংশ্লিষ্ট ও বাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জালিয়াতি বা বিধি লঙ্ঘনের বিষয়গুলো ফাইনান্সিয়াল স্টেটমেন্ট, রিটার্ন বা রিপোর্টে অনেক সময় উঠে আসে না। আর এসব বিষয়ে তথ্য না থাকলে অনুসন্ধান করেও এটা বের করে আনা কঠিন হয়ে যায়। যারা ভিতরে থাকে মানে ইনসাইডার তারা তো বিষয়গুলো জানে। এজন্য বিভিন্ন দেশেই ইনসাইডার যারা তারা সিরিয়াস কোন লঙ্ঘন হলে বা অর্থ আত্মরসাৎ হলে বা কোন অনিয়ম করলে সেগুলো নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের নিকট তথ্য প্রকাশ করে দিতে পারে। সেখানে তথ্য প্রকাশকারীকে সুরক্ষার একটা বিধান রয়েছে। তেমনই পুঁজিবাজার বিষয়ে যারা তথ্য প্রকাশ করবে তাদেরকে সুরক্ষার জন্যই এই বিধিমালাটা আমরা করেছি।
তিনি জানান, এটা হলে জবাবদিহিতার একটা জায়গা তৈরি হবে। এর মাধ্যমে সিকিউরিটিজ আইন ভঙ্গ বা কোন অর্থ আত্মসাৎ বা বিনিয়োগকারীর স্বার্থ হানির বিষয়গুলো বা অভিযোগ ইনসাইডারদের কাছ থেকে আমরা পাবো বলেই আশা করি এবং এতে আমরা অনুসন্ধান করে অনিয়মগুলো বন্ধ করতে পারবো।
তিনি আরও বলেন, অনেকে ভাবতে পারে যে আমি তথ্য দিয়ে লাভ কি? এজন্য আমরা তথ্য প্রদানকারীদের জন্য আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অনিয়ম ও বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে এই বিধিমালা নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য সহায়ক হতে পারে। পুঁজিবাজার সংস্কার টাস্কফোর্সের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আল- আমিন সানবিডিকে জানান, কেউ যদি কোনো সঙ্ঘবদ্ধ চক্রের ব্যাপারে কোন তথ্য দিতে পারে তাহলে সেটা নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের জন্য সহায়ক হবে এবং এতে যারা সঙ্ঘবদ্ধভাবে কাজ করে তারা কারসাজির ব্যাপারে সতর্ক হবে। অন্যান্য দেশে নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালী থাকে, অনেক ধরনের মেকানিজমে আছে। আল্টিমেটলি বাংলাদেশে যেহেতু আসলে একটা দীর্ঘসূত্রিতা বা সময় লাগে সেক্ষেত্রে কারা কি করছে এ ধরনের তথ্য দিলে কর্তৃপক্ষ তার পরিচয় গোপন রেখে পদক্ষেপ নিতে পারবে।
তিনি আরও বলেন, এর মাধ্যমে বাজার সংশ্লিষ্টদের কেউ কোন কারসাজি করার পরিকল্পনা করলেও সেটা তাৎক্ষণিকভাবে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জানাতে পারবেন। যদি কোন মূল্য সংবেদনশীল তথ্য না থাকে তখন কর্তৃপক্ষ ট্রেডটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
বিএইচ






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













