জ্বালানিতে অদক্ষতা ও অদূরদর্শিতায় বিপাকে বাংলাদেশ

এশিয়ার কোন দেশে কী পরিমাণ মজুত আছে তেল?

সানবিডি২৪ আপডেট: ২০২৬-০৩-০৯ ০৭:৪৩:৩৭


বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে পরিকল্পনার ঘাটতি ও প্রতিষ্ঠানগত অদক্ষতার কারণে বর্তমানে একটি অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং এর অধীন তিন তেল বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান—পদ্মা অয়েল কোম্পানি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড এবং যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড—সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তেলের মজুত সক্ষমতা বাড়াতে ব্যর্থ হওয়ায় দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্তত ৬০ দিনের জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা গড়ে তোলা হবে। কিন্তু প্রায় ছয় বছর পার হলেও সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন হয়নি। বর্তমানে দেশের মোট মজুত সক্ষমতা মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ দিনের, যার মধ্যে ডিজেল রয়েছে মাত্র ১০ থেকে ১১ দিনের মতো। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মজুত কোনোভাবেই জরুরি পরিস্থিতির জন্য যথেষ্ট নয়; বরং এটি কেবল দৈনন্দিন পরিচালনাগত প্রয়োজন মেটানোর মতো।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেছেন, বাংলাদেশের মতো দেশে কমপক্ষে ৯০ দিনের জ্বালানি রিজার্ভ থাকা উচিত। তাঁর মতে, এত বড় জ্বালানি নির্ভর অর্থনীতিতে ৩০ দিনের মজুতকে কোনোভাবেই জরুরি প্রস্তুতি বলা যায় না।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তেজনার পর। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলার পর আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়তে শুরু করলে মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে বাংলাদেশের তেলের মজুত নেমে আসে প্রায় ৯ দিনে। ফলে সরকারকে সারা দেশে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হয়। এতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে সরবরাহ সংকট দেখা দেয় এবং তেল খাতে অস্থিরতা তৈরি হয়।

এদিকে অভিযোগ রয়েছে, তেল বিতরণ কোম্পানিগুলো জ্বালানি অবকাঠামোয় বিনিয়োগের পরিবর্তে ব্যাংকে টাকা রেখে সুদ থেকে লাভ করার দিকে বেশি আগ্রহী। জানা গেছে, এই তিন কোম্পানির কাছে ৭ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশের অর্থ ব্যাংকে জমা রয়েছে। গত অর্থবছরে প্রতিটি কোম্পানি ৫০০ কোটির বেশি মুনাফা করেছে, যার বড় অংশ এসেছে ব্যাংকের সুদ থেকে।

অন্যদিকে কর্মচারীদের বিপুল বোনাসও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত অর্থবছরে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড-এর প্রতিটি কর্মচারী প্রায় ১৮ লাখ টাকা, যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড-এর কর্মচারীরা প্রায় ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং পদ্মা অয়েল কোম্পানি-এর কর্মচারীরা প্রায় ৬ লাখ টাকা বোনাস পেয়েছেন।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেক আগে থেকেই উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম তামিম বলেছেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় বিপিসির আরও সতর্ক হয়ে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া উচিত ছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে বছরে ৭০ লাখ টনের বেশি জ্বালানি তেল ব্যবহৃত হয়, যার মধ্যে ৪০ লাখ টনের বেশি ডিজেল। আগামী পাঁচ বছরে এই চাহিদা ১ কোটি টন ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু সেই তুলনায় মজুত সক্ষমতা খুব সামান্যই বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে দ্রুত মজুত অবকাঠামো সম্প্রসারণ, ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা এবং বিনিয়োগের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ আবারও বড় সংকটে পড়তে পারে।

কোন দেশে কী পরিমাণ মজুদ আছে?

২০২০ সালে সর্বনিম্ন ৬০ দিনের তেলের ধারণ ক্ষমতা বা মজুত রাখার সক্ষমতা তৈরি করার সিদ্ধান্ত হলেও এখন আছে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ দিনের মতো। সেই ৩৫ দিনের মধ্যে ডিজেল আছে ১০-১১ দিনের মতো। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এখন তেলের মজুত আছে ৭৪ দিন, পাকিস্তান ও শ্রীলংকায় ৩০ দিন এবং নেপালে আছে ১০ দিনের। অন্যদিকে এশিয়ার দেশ ভিয়েতনামে তেলের মজুত আছে ৪৫ দিন, থাইল্যান্ডে ৬১ দিন এবং জাপানে ২৫০ দিনের।

কোন ডিপোতে কী পরিমাণ মজুদ আছে?

দেশে ছোট-বড় ২৭টি ডিপো আছে। এই ডিপোতে মজুতের জন্য ট্যাংক আছে ৪৬৩টি। এর মধ্যে চট্টগ্রামের প্রধান স্থাপনায় সবচেয়ে বেশি ডিজেল মজুত আছে ২১ দিনের। গত বৃহস্পতিবারের হিসাব অনুযায়ী বিপিসির ডিপো গোদনাইলে ডিজেলের মজুত ৪ দিন, ফতুল্লায় ২০, দৌলতপুরে ৩০, বাঘাবাড়ী ১৮, বরিশাল ২৫, ঝালকাঠি ৯, চাঁদপুর ৭, পার্বতীপুর ৬, রংপুর ৫, সিলেটে ২, আশুগঞ্জ ১ এবং সাচনা বাজারে আছে ১ দিনের ডিজেল। তবে একেবারে ডিজেল নেই নাটোর, হরিয়ানা, চিলমারী বাজ, ব্রাক্ষণবাড়িয়া, কেএডি, ঢাকা, এসআইএ, চট্টগ্রাম, ওসমানী সিলেট এবং কক্সবাজারে। দেশে প্রতিবছর ৭০ লাখ টনের বেশি জ্বালানি তেল ব্যবহার হয়। এর মধ্যে ডিজেল ব্যবহার হয় ৪০ লাখ টনের বেশি।

প্রতিবেদনটি করা হয়েছে দৈনিক যুগান্তরের সহযোগিতায়। প্রতিবেদনটি লিখেছেন শাহেদ সিদ্দিকী।