ঈদযাত্রা: চট্টগ্রামে ঘরমুখী মানুষের ঢল

জেলা প্রতিনিধি প্রকাশ: ২০২৬-০৩-১৮ ১৬:৫৬:৫৪


দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী ও বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম। জীবিকার তাগিদে দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা প্রায় ৭০ লাখ মানুষের এই শহরটি প্রতি ঈদেই যেন বদলে যায়। কর্মব্যস্ত এই নগরী ঈদ এলেই ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে পড়ে, আর শুরু হয় ঘরমুখী মানুষের ঢল।

সরকারি ছুটি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমে সাময়িক স্থবিরতা নেমে আসায় শহরের ব্যস্ত রাস্তাঘাট, বাজার ও অফিসপাড়া হয়ে ওঠে অস্বাভাবিক শান্ত। তবে এই শান্তির আড়ালেই থাকে এক আবেগঘন দৃশ্য-প্রিয়জনের কাছে ফিরতে মানুষের অবিরাম যাত্রা।

আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে চট্টগ্রামের বাস, ট্রেন ও লঞ্চ রুটে এখন ঘরমুখী মানুষের ঢল। শহরের প্রবেশদ্বারগুলোতে দেখা যাচ্ছে পরিবার-পরিজন নিয়ে যাত্রীদের ব্যস্ততা। চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন, আরপিবাস টার্মিনালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাস কাউন্টার পরিণত হয়েছে জনসমুদ্রে।

বুধবার (১৮ মার্চ) সকাল থেকেই চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে ছিল চোখে পড়ার মতো ভিড়। মানুষের পদচারণা, অপেক্ষা আর বাড়ি ফেরার ব্যাকুলতায় স্টেশন যেন এক জীবন্ত সমুদ্র। একের পর এক ট্রেন ছেড়ে গেলেও ভিড় কমছে না, বরং সময়ের সঙ্গে বাড়ছেই। এই ভিড় মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে।

স্টেশনের প্রতিটি কোণ যাত্রীদের উপস্থিতিতে মুখর। টিকিট কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ সারি, প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষমাণ মানুষের ভিড়, কেউ মেঝেতে বসে, কেউ শিশুদের কোলে নিয়ে অপেক্ষা করছেন। গরম, ভিড় আর দীর্ঘ অপেক্ষা সত্ত্বেও সবার মুখে স্বস্তির হাসি-কারণ সামনে রয়েছে বাড়ি ফেরার আনন্দ।

একই চিত্র বাস টার্মিনালগুলোতেও। অলঙ্কার, এ কে খান ও দামপাড়া এলাকায় বাস কাউন্টারগুলোতে সকাল থেকেই দীর্ঘ লাইন। অনেক যাত্রীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হলেও ঘরে ফেরার আনন্দে সেই কষ্ট তুচ্ছ হয়ে যাচ্ছে।

যাত্রীদের সুবিধার্থে চট্টগ্রাম-চাঁদপুর রুটে চালু করা হয়েছে বিশেষ ঈদ স্পেশাল ট্রেন। প্রবাল ও সৈকতসহ গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনগুলোতে যুক্ত করা হয়েছে অতিরিক্ত বগি। তবুও অনেক ক্ষেত্রে ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী বহন করতে হচ্ছে।

বাস টার্মিনালগুলোতেও নেওয়া হয়েছে বাড়তি প্রস্তুতি। নিরাপত্তা, যাত্রীসেবা ও সহায়তায় অতিরিক্ত কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। টিকিট কালোবাজারি ও ভিড় নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাচ্ছে।

তুষার নামের এক যাত্রী বলেন, “সারা বছর কাজের ব্যস্ততায় পরিবারের সঙ্গে সময় দেওয়া যায় না। ঈদই একমাত্র সুযোগ, তাই কষ্ট হলেও বাড়ি ফিরছি।”

নগরীর পূর্ব মাদারবাড়ী এলাকায় সাব্বির হোসেন পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার জন্য স্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি সিলেট, তিনি বাসের চেয়ে ট্রেনকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, গ্রামে ঈদ করার আনন্দই আলাদা। তাই যানজট ও ভোগান্তি এড়াতে আগেই বাড়ির পথে রওনা দিয়েছি। ঈদ উপলক্ষ্যে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আগেভাগেই গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছি।

আরেক যাত্রী জানান, “দীর্ঘ অপেক্ষা আর ভিড় থাকলেও মা-বাবা অপেক্ষা করছেন-এই ভাবনাই সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয়।”

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। দিন-রাত ট্রেন ও বাস চললেও চাপ কমছে না।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীন সরেজমিনে স্টেশন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তিনি জানান, যাত্রীদের নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। টিকিট কালোবাজারি রোধ, সময়সূচি মেনে ট্রেন চলাচল, পর্যাপ্ত আলো, বিশুদ্ধ পানি ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী-আরএনবির চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের ইন্সপেক্টর আমান উল্লাহ আমান বলেন, যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক ভ্রমণের জন্য আরএনবি সজাগ রয়েছে। টিকিট দেখেই প্রবেশ করানো হচ্ছে। টিকিটবিহীন যাত্রী প্রবেশে কঠোর নজরদারি রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ট্রেনের ছাদে ভ্রমণের বিরুদ্ধে আরএনবি কাজ করছে।

সব কষ্টের মাঝেও মানুষের একটাই প্রত্যাশা-নিরাপদে বাড়ি পৌঁছানো। শহরের কোলাহল ছেড়ে গ্রামের শান্ত পরিবেশে প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার আকাঙ্ক্ষাই এই যাত্রাকে করে তুলেছে বিশেষ।

ঈদকে ঘিরে এই ঘরমুখী মানুষের ঢল শুধু যাতায়াত নয়, এটি ভালোবাসা, সম্পর্ক আর টানাপোড়েনের এক অনন্য মানবিক গল্প-যেখানে কষ্ট আছে, ভোগান্তি আছে, কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে থাকে প্রিয়জনের টান।

এদিকে, পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে নগরবাসী গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে ছুটে যাওয়ায় ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে পড়ছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। এ পরিস্থিতিতে চুরি-ডাকাতিসহ যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধে ১৯ দফা নির্দেশনা জারি করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। পাশাপাশি জরুরি সহায়তার জন্য চালু করা হয়েছে বিশেষ হটলাইন নম্বর।

মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) সন্ধ্যায় সিএমপির জনসংযোগ শাখা থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

সিএমপি জানিয়েছে, ঈদযাত্রার সময় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠ পর্যায়ে পুলিশের টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাসাবাড়ি ফাঁকা রেখে যাওয়ার আগে বাসিন্দাদের সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

নির্দেশনায় বলা হয়, বাসা ত্যাগের আগে দরজায় উন্নত মানের অতিরিক্ত তালা ব্যবহার, মূল্যবান জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে রাখা এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে যাওয়ার মতো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

পুলিশ বলছে, নাগরিকদের সহযোগিতা ও সচেতনতা থাকলে ঈদ ছুটিতে নগরের সার্বিক নিরাপত্তা আরও জোরদার করা সম্ভব হবে।

সিএমপির ১৯ নির্দেশনা:
১. বাসাবাড়ি বা প্রতিষ্ঠান ত্যাগের আগে দরজায় উন্নত মানের অতিরিক্ত তালা ব্যবহার করা। ২. ঘরে নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার বা মূল্যবান সামগ্রী রেখে না যাওয়া। ৩. সিসিটিভি ক্যামেরা ও অ্যালার্ম সিস্টেম সচল আছে কি না তা পরীক্ষা করা। ৪. প্রয়োজনে অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করা। ৫. নতুন নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দিলে তাদের এনআইডি ও ছবি সংরক্ষণ করা। ৬. বাসা ত্যাগের আগে সংশ্লিষ্ট বিট অফিসার অথবা থানাকে অবহিত করা। ৭. ব্যাংক-বিমাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা কর্মীদের ডিউটি জোরদার ও তদারকি করা। ৮. প্রতিষ্ঠানের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে একসঙ্গে ছুটি না দিয়ে একটি অংশকে দায়িত্ব পালনে রাখা। ৯. আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভল্ট এলাকায় সিসিটিভি কাভারেজ নিশ্চিত করতে একজন ‘ফোকাল পয়েন্ট’ কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া। ১০. রাতে বাসা বা প্রতিষ্ঠানের চারপাশে পর্যাপ্ত আলোকিত রাখা। ১১. গুরুত্বপূর্ণ দলিল বা মূল্যবান সামগ্রী প্রয়োজনে ব্যাংক লকারে রাখা। ১২. ভাড়াটিয়াদের পক্ষ থেকে ঈদের ছুটিতে বাসায় না থাকার বিষয়টি মালিককে আগেই জানানো। ১৩. গ্যারেজে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ১৪. জানালার পাশে গাছের ডালপালা থাকলে তা কেটে ফেলা, যাতে অপরাধীরা তা ব্যবহার করতে না পারে। ১৫. কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা বা শঙ্কার সৃষ্টি হলে তাৎক্ষণিক পুলিশকে জানানো। ১৬. ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে বেপরোয়া গতিতে রাইডিং থেকে বিরত থাকা। ১৭. ভ্রমণকালে অপরিচিত ব্যক্তির দেওয়া খাবার বা পানীয় গ্রহণ না করা। ১৮. অজ্ঞান পার্টি ও মলম পার্টির তৎপরতা সম্পর্কে সতর্ক থাকা। ১৯. সন্দেহভাজন কোনো ব্যক্তি বা কর্মকা- দেখলে পুলিশকে অবহিত করা।

বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর পাশাপাশি সিএমপির হটলাইন নম্বর ০১৩২০-০৫৭৯৯৮ ও ০১৩২০-০৫৭৯৯৯-এ যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

বিএইচ