গণভোট-গুম প্রতিরোধসহ ১৬ অধ্যাদেশ বাতিলের পথে
সানবিডি২৪ প্রতিবেদক প্রকাশ: ২০২৬-০৪-০২ ২১:২৬:১৩
গণভোট, গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদে উত্থাপিত হচ্ছে না। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, আগামী ১২ এপ্রিলের পর এই অধ্যাদেশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাচ্ছে। তবে জাতীয় সংসদ গঠিত বিশেষ কমিটি এই অধ্যাদেশগুলো এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করে পরবর্তীতে অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে শক্তিশালী নতুন বিল আনার সুপারিশ করেছে।
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সপ্তম দিনে বিশেষ কমিটির এই রিপোর্ট উত্থাপন করেন কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন।
সংবিধানের বাধ্যবাধকতা ও বর্তমান অবস্থা
সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অধ্যাদেশ জারির পর পরবর্তী সংসদ অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের ৩০ দিনের মধ্যে তা পাস না হলে অধ্যাদেশটি বাতিল হয়ে যায়। ১২ মার্চ সংসদ শুরু হওয়ায় আগামী ১২ এপ্রিল সেই সময়সীমা শেষ হচ্ছে। বিশেষ কমিটি জানিয়েছে, এই ১৬টি অধ্যাদেশ অধিকতর সংশোধন ও শক্তিশালী করা প্রয়োজন বলে সেগুলো এখন তোলা হচ্ছে না। ফলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো পুনরায় নতুন করে বিল না আনা পর্যন্ত এগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
বাতিলের তালিকায় থাকা অধ্যাদেশ
বাতিল হতে যাওয়া ১৬টি অধ্যাদেশের মধ্যে রয়েছে— গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ-২০২৫, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, কাস্টমস (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ-২০২৫, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬, বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, মাইক্রো ফাইনান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ-২০২৬ এবং তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬।
জামায়াতের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ও স্থানীয় সরকার প্রসঙ্গ
বিশেষ কমিটির রিপোর্টে দেখা যায়, জামায়াতে ইসলামীর তিন সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ও গাজী নজরুল ইসলাম মোট ১২টি অধ্যাদেশের ওপর ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) দিয়েছেন। বিশেষ করে জেলা পরিষদ (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৪, উপজেলা (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৪, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৪, স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৪-গুলোর তীব্র বিরোধিতা করেছেন তারা।
তাদের মতে, সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ এবং সুপ্রিম কোর্টের ‘কুদরত-ই-ইলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ’ মামলার রায় অনুযায়ী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগ অসাংবিধানিক ও বেআইনি। ফলে এই অধ্যাদেশগুলো আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
কমিটির অন্যান্য সুপারিশ
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ উত্থাপিত আকারেই পাস করার সুপারিশ করেছে কমিটি। এর মধ্যে সংশোধিত আকারে ১৫টি অধ্যাদেশ সংসদে বিল উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে সেগুলো হলো— নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) ২০২৫, ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ ২০২৫, সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ ২০২৫, বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশ-২০২৫, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫, ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যাবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫, মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ দমন অধ্যাদেশ ২০২৬, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণও কৃষি ভুমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৬, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারি অবসর সুবিধা (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারি কল্যাণ ট্রাস্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬।
এছাড়া ৪টি অধ্যাদেশ রহিতকরণ ও হেফাজতের জন্য এখনই বিল আকারে উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলো হলো— জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ-২০২৪, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ-২০২৫, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ-২০২৫ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এসব অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে গঠিত জাতীয় সংসদ এসব অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে রিপোর্ট পেশ করার জন্য গত ১২ মার্চ বরিশাল -৩ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে, যেখানে বিরোধী দলের ৩ জন সংসদ সদস্য ছিলেন।
গঠিত ১৩ সদস্যের এই বিশেষ কমিটি পরপর তিনটি বৈঠকে ১৩৩টি অধ্যাদেশ পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই করে এই চূড়ান্ত রিপোর্ট তৈরি করেছে।
এএ






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন














