শক্ত ভিত্তিতে নতুন উচ্চতায় সিটি ব্যাংক

::জাকির হোসাইন আপডেট: ২০২৬-০৪-২২ ১১:১৯:৫২


দেশের ব্যাংকিং খাতে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ধারাবাহিক অগ্রগতির ধারা বজায় রেখেছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিটি ব্যাংক। মুনাফা বৃদ্ধি, খেলাপি ঋণ হ্রাস, সম্পদ মূল্য ও লভ্যাংশ—সব প্রধান সূচকেই ব্যাংকটি শক্তিশালী অবস্থান অর্জন করেছে। সর্বশেষ বছরেও রেকর্ড মুনাফার মাইলফলকে পৌঁছেছে সিটি ব্যাংক। এই ধারাবাহিক অর্জনে আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাও অর্জন করেছে ব্যাংকটি।

ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে মুনাফা ও আয়

ব্যাংকটির বিগত ৭ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৯ সালে সিটি ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ছিল ৮৬০ কোটি ৮০ লাখ টাকা, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭২৭ কোটি ২০ লাখ টাকায়। একই সময়ে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ২৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৩২৪ কোটি ২০ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ ছয় বছরে নিট মুনাফা প্রায় পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আর আগের বছরে অর্থাৎ ২০২৪ সালের তুলনায় মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৩১ শতাংশ।

শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) ২০১৯ সালে ছিল ২ টাকা ৬০ পয়সা, যা ২০২৫ সালে বেড়ে হয়েছে ৮ টাকা ৭০ পয়সা। এটি ব্যাংকের লাভজনকতা বৃদ্ধির স্পষ্ট প্রতিফলন।

শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্যে শক্তিশালী অগ্রগতি

শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভি) ২০১৯ সালে ছিল ২৪ টাকা ১০ পয়সা। ধারাবাহিক উন্নতির ফলে ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৪০ টাকা ৬০ পয়সায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ ছয় বছরে শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য প্রায় ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

একক হিসাবেও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি

এককভাবেও ব্যাংকটির আর্থিক অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। ২০১৯ সালে এককভাবে সিটি ব্যাংকের নিট মুনাফা ছিল ২৪৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। এ সময়ে পরিচালন মুনাফা ছিল ৮২৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

সর্বশেষ ২০২৫ সালে রেকর্ড মুনাফার মাইলফলক অর্জন করেছে ব্যাংকটি। ২০২৫ সালে সিটি ব্যাংকের নিট মুনাফা হয়েছে ১ হাজার ৩০৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

পাশাপাশি এককভাবে ২০২৫ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৯৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
একই সময়ে ২০১৯ সালে যেখানে শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) ছিল ২ টাকা ৪০ পয়সা, ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৮ টাকা ৬০ পয়সা। আর শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য (এনএভি) ২০১৯ সালে ২৫ টাকা থেকে ২০২৫ সালে ৪০ টাকা ১০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চ্যালেঞ্জ, সিটি ব্যাংকের বড় সাফল্য

খেলাপি ঋণের ভারে ব্যাংক খাত যখন ডুবছে তখন খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনায় বড় সফলতা দেখিয়েছে সিটি ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা—যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।

২০১৯ সালে মোট ঋণের মধ্যে সিটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ১ হাজার ৪২৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যা সে সময়ের মোট ঋণের ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৫ সালে খেলাপি ঋণ কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৬৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ২ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমান ব্যাংকিং খাতের বাস্তবতায় এটি একটি বড় অর্জন হিসেবে মনে করছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

লভ্যাংশে ধারাবাহিক উন্নতি

ব্যাংকটি ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগকারীদের ভালো লভ্যাংশ দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালে মোট লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়েছে ৩০ শতাংশ—যার মধ্যে ১৫ শতাংশ নগদ এবং ১৫ শতাংশ বোনাস শেয়ার। ২০২৪ সালেও সাড়ে ১২ শতাংশ হারে নগদ ও বোনাস লভ্যাংশ প্রদান করেছে ব্যাংকটি। এছাড়া ২০২৩ সালেও ১৫ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ লাভ্যাংশ দিয়েছে।

সন্তুষ্ট ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ

ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মাসরুর আরেফিন ব্যাংকটির ধারাবাহিক অর্জনে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তবে তিনি উল্লেখ করেন যে, সাধারণ বছরের চাইতে বেশি প্রভিশন ব্যয় করার কারণে সর্বশেষ বছরে নিট মুনাফা ১,৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারেনি।

তিনি বলেন, ভালো ব্যাপার হচ্ছে, সিটি ব্যাংকে সব কোর ব্যাংকিং সেগমেন্ট থেকেই শক্তিশালী আয় আসছে। রিটেইল ব্যাংকিং ও কার্ড ব্যবসা ইতোমধ্যেই কর্পোরেট ব্যাংকিং আয়কে ছাড়িয়ে গেছে। তাদের আয় গত বছরের তুলনায় বেড়েছে ৩৩%। ঋণের গুণগত মানের দিক থেকে আমাদের স্মল বিজনেস লোন, ন্যানো লোন, রিটেইল লোন এবং ক্রেডিট কার্ড পোর্টফোলিওর পারফরম্যান্স অত্যন্ত চমৎকার। এলসি ব্যবসায় আমাদের নেতৃত্ব এবং আমানতের খরচ ৫.৫% পর্যায়ে ধরে রাখার সক্ষমতা, এ দুই আমাদের বড় শক্তি। তবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক প্রভাবের কারণে কর্পোরেট ও মাঝারি ব্যবসার ঋণ পোর্টফোলিও নিয়ে আমাদের কিছু উদ্বেগ রয়েছে।

তিনি বলেন, ৮,০০০ জন কর্মীর একটি বড় ব্যাংকের ক্ষেত্রে কস্ট-টু-ইনকাম অনুপাত ৪৫%-এর নিচে ধরে রাখতে পারাটা আমার দৃষ্টিতে আমাদের অন্যতম বড় সাফল্য।

আস্থা আছে আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের

মুনাফা বৃদ্ধি, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, সম্পদমূল্য বৃদ্ধি এবং আকর্ষণীয় লভ্যাংশ—সব মিলিয়ে সিটি ব্যাংক এখন শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে। ব্যাংক খাতের চ্যালেঞ্জিং পরিবেশেও ধারাবাহিক এই অগ্রগতি প্রতিষ্ঠানটির টেকসই প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সিটি ব্যাংকের একজন আমানতকারী আলতাফ হোসেন। তিনি বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে সিটি ব্যাংকে আমার সঞ্চয় ও ফিক্সড ডিপোজিট রাখি। শুনেছি বিভিন্ন ব্যাংকে আমানত রেখে মানুষ ফেরত পাচ্ছে না। তবে সিটি ব্যাংকে এ ধরণের সমস্যায় পড়তে হয়নি। আমি মনে করি, আমার আমানত এখানে নিরাপদ ।

পুঁজিবাজারে একজন বিনিয়োগকারী মনিরুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক বছরে নিট মুনাফায় ধারাবাহিকভাবে সফলতা দেখিয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য ভালো সংকেত। তাছাড়া এই ব্যাংকের ম্যানেজমেন্টও ভালো, আর বড় কোন অনিয়মও চোখে পড়েনি। সেই দিক থেকে একজন বিনিয়োগকারী হিসেবে ব্যাংকটির শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করি।

মূলধন ও শেয়ারধারণ পরিস্থিতি

১৯৮৭ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এ ক্যাটাগরির ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ২ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে পরিশোধিত মূলধন ১ হাজার ৫২১ কোটি ২২ লাখ টাকা।

২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সিটি ব্যাংকের স্পন্সর ও পরিচালকগণের হাতে রয়েছে মোট শেয়ারের ৩০ শতাংশ। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অধীনে রয়েছে ১৭ শতাংশ শেয়ার। মালিকানায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশ প্রায় ৫ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ৪৭ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। পুঁজিবাজারের সর্বশেষ লেনদেনে সিটি ব্যাংকের শেয়ারদর ছিল ৩১ টাকা। গত ২ বছরের মধ্যে ব্যাংকটির সর্বনিম্ন শেয়ারদর ১৮ টাকা আর সর্বোচ্চ শেয়ারদর ৩৩ টাকা ৩০ পয়সা।

এএ