রপ্তানি বৃদ্ধিতে ডিসিসিআইতে ‘সমন্বিত বন্দর ও লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন’ শীর্ষক আলোচনা

সানবিডি২৪ প্রতিবেদক প্রকাশ: ২০২৬-০৫-০৯ ১৮:৪১:৩৭


ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বাণিজ্য নির্ভর বাংলাদেশের জন্য সমন্বিত বন্দর এবং লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আজ শনিবার (০৯ মে) ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (বিআইএম)-এর মহাপরিচালক মো. সলিম উল্লাহ বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগদান করেন।

অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী বলেন, আমাদের লজিস্টিক খাতের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতার কারণে রপ্তানি সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। একারণে আমরা প্রতিনিয়ত প্রতিযোগী দেশগুলো থেকে পিছিয়ে পড়ছি। এছাড়াও বন্দরগুলোতে পণ্য খালাসে দীর্ঘসময়, সড়ক ও রেলপথে পণ্য পরিবহনে ধীরগতি এবং আধুনিক কোল্ড-চেইন লজিস্টিকসের সীমাবদ্ধতার কারণে আমাদের সামগ্রিক সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাকে ব্যয়বহুল ও মন্থর করে তুলছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

এসময় তিনি স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনায়নের লক্ষ্যে বন্দরগুলোতে পেপারলেস অটোমেটেড ব্যবস্থা চালুকরণ, পিপিপি-এর মাধ্যমে অবকাঠামো খাতে উন্নয়ন এবং আধুনিক কোল্ড চেইন লজিস্টিকসে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে একটি দক্ষ ও টেকসই লজিস্টিকস ইকোসিস্টেম নিশ্চিতের উপর জোরারোপ করেন।

অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি বিআইএম-এর মহাপরিচালক মো. সলিম উল্লাহ বলেন, সমন্বিত বন্দর ও লজিস্টিকস খাতে দক্ষ ব্যবস্থাপনায় আমরা বেশ পিছিয়ে রয়েছি, যা ব্যবসা পরিচালনায় ব্যয় ক্রমাগত বাড়াচ্ছে| এখাতের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট সকলকে একযোগে কাজ করার উপর তিনি জোরারোপ করেন|

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম. মাসরুর রিয়াজ।

মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, আমাদের জিডিপিতে উৎপাদনমুখী খাতের অবদান প্রায় ২৫%, যেখানে প্রতিবেশি দেশগুলো বেশ পিছিয়ে রয়েছে এবং তবে উৎপাদনমুখী খাতের অবদান আরো বৃদ্ধির জন্য স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আরো জোরারোপ করা আবশ্যক।

তিনি উল্লেখ করেন, গত চার দশকে বাংলাদেশের রপ্তানিতে আমূল ইতিবাচক পরিবর্তন আসলেও আমাদের রপ্তানি মূল গুটিকয়েক পণ্য ও বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ, তাই সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে বহুমুখীকরণের কোন বিকল্প নেই। সেই সাথে তিনি বাণিজ্য বিষয়ক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং নীতিবিষয়ক সংষ্কার ও যুগোপযোগীকরণের উপর জোরারোপ করেন। দেশের বাণিজ্য সহায়ক পরিবেশ না থাকার পিছনে দূর্বল লজিস্টিকস কাঠামো এবং ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ ব্যয় অন্যতম কারণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মাসরুর রিয়াজ জানান, আমাদের বিদ্যমান লজিস্টিকস খরচ ২৫% হ্রাস করা গেলে রপ্তানি ২০শতাংশ বাড়বে এবং পণ্য পরিবহন ১% হ্রাস করা সম্ভব হলে রপ্তানি ৭.৪% বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দেশের লজিস্টিকস খাতের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নে লজিস্টিক নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন, বন্দর পরিচালনায় আন্তর্জাতিক মানের বিদেশি কোম্পানীর পাশাপাশি দেশীয় বেসরকারিখাতের প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্তকরণ, চট্টগ্রাম বন্দর কন্টেইনার খালাসের সময়সীমা কমানো, সংশ্লিষ্ট সরকারী নীতিমালার প্রতিবন্ধকতা নিরসনের একান্ত অপরিহার্য বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, আমাদের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হলো সম্ভাবনাময় অন্যান্য খাতে আমাদের সক্ষমতা নেই। ব্যবসা ও বিনিয়োগের সার্বিক অবস্থা উত্তরণে একটি দক্ষ এবং সমন্বিত লজিস্টিকস ইকোস্টিস্টেম নিশ্চিতের উপর তিনি জোরারোপ করেন।

অনুষ্ঠানের নির্ধারিত আলোচনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অতিরিক্তি সচিব (প্রাক্তন সদস্য, প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট)-এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফেসিলিটেশন কোম্পানী (আইআইএফসি)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান, শাহরিয়ার স্টিল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস কে মাসাদুল আলম মাসুদ, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)-এর সিনিয়র প্রজেক্ট অফিসার হুমায়ুন কবির এবং বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ-এর সিনিয়র ট্রান্সপোর্ট স্পেশালিস্ট নুসরাত নাহিদ বাবী প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অতিরিক্তি সচিব মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে সম্প্রসারণের তেমন সুযোগ নেই, তাই আমাদেরকে রেলপথ একমাত্র ভরসা এবং বন্দরের সাথে রেলপথের সংযোগ স্থাপন করতে হবে, যেন স্বল্প সময় ও ব্যয়ে পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে| দেশের সমুদ্রবন্দর গুলোর অন্তত ১টি পরিচালনার জন্য বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব করেন, যার মাধ্যমে একাজে বর্তমানে নিয়োজিত সরকারি সংস্থাগুলো প্রতিযোগিতার মুখোমুখি পড়বে। ফলে সেবার মান বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদ্যমান শুল্কহার কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক বলেন, আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় বাস্তবভিত্তিক না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষকরে যোগাযোগ অবকাঠামো হতে ইতিবাচক ফল পেতে হলে তাকে অবশ্যই সমন্বিত হতে হবে এর ব্যত্যয় হলে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়তে হবে। এছাড়াও সরকারি সংস্থাগুলোর কাঠামোগত সংস্কারের কোন বিকল্প নেই বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

শাহরিয়ার স্টিল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস কে মাসাদুল আলম মাসুদ জানান, পানগাঁও বন্দরের স্ক্যানার মেশিন না থাকার কারণে উদ্যোক্তারা বন্দরটি ব্যবহার আগ্রহ দেখাচ্ছেন না এবং আভ্যন্তরীণ নদীপথের অবকাঠমোর স্বল্পতার কারণে শিল্পখাতের পণ্য পরিবহনে খরচ বাড়ছে, যদিও খরচ হ্রাস পাওয়ার কথা ছিল।

বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ট্রান্সপোর্ট স্পেশালিস্ট নুসরাত নাহিদ বাবী বলেন, দেশের কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া এখনও সহজীকরণ এবং আধুনিকায়ন করা হয়নি, বিশেষকরে স্থলবন্দরগুলোর কার্যক্রম ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা যায়নি। ফলে পণ্য খালাসের দীর্ঘসূত্রিতা আমাদের ব্যবসা পরিচালন ব্যয় ক্রমশ বৃদ্ধি করছে|

এডিবি’র সিনিয়র প্রজেক্ট অফিসার হুমায়ুন কবির জানান, ধীরাশ্রম আইসিডি কনটেইনার ডিপো এবং একটি মাল্টিমোডাল লজিস্টিক হাব প্রকল্প বাস্তবায়নে এডিবি কাজ করে যাচ্ছে। সেই সাথে লজিস্টিক সেবার সকল স্তরের ডিজিটাল ব্যবস্থা ব্যবহার নিশ্চিতের উপর তিনি জোরারোপ করেন।

মুক্ত আলোচনায় ডিসিসিআই পরিচালক ইঞ্জি. এম এ ওয়াহাব, প্রাক্তন পরিচালক এ কে ডি খায়ের মোহাম্মদ খান, ইএসজি প্রজেক্ট লজিস্টিকস (বিডি) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবরারুল আলম এবং এএনবি লজিস্টিকসের প্রতিনিধি মোক্তার উদ্দিন মতি প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন।

ডিসিসিআই সহ-সভাপতি মো. সালিম সোলায়মান, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দ সহ সরকারি-বেসরকারিখাতের প্রতিনিধিবৃন্দ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

বিএইচ