প্রাক-বাজেট মতবিনিময় সভা

আমলাতান্ত্রিক গতানুগতিকতা ভেঙে জনকল্যাণমুখী বাজেটের তাগিদ জামায়াতের

সানবিডি২৪ প্রতিবেদক প্রকাশ: ২০২৬-০৫-২৪ ১৬:১০:৫৯


আগামী বাজেটের আকার বড় হওয়াটাই শেষ কথা নয়, বরং সেখানে অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা, জনকল্যাণ নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও অর্থপাচার রোধ করাই প্রধান চ্যালেঞ্জ। গতানুগতিক আমলাতান্ত্রিক ধারা ও ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ বন্ধ করে বাজেটকে সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

রোববার (২৪ মে) রাজধানীর পুরানা পল্টনের ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক সাংবাদিকদের সাথে জাতীয় বাজেট ভাবনা’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় দেশের বিশিষ্ট রাজনীতিক, সংসদ সদস্য ও সাবেক আমলারা এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে এই প্রাক-বাজেট মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিক্স-এর ডিন এবং অ্যাকাউন্টিং ও ফিনান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. একেএম ওরেসুল করিম।

আকার বাড়লেও মানুষের ভাগ্য বদলায়নি

মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে বাজেট অনেক সময় শোষণ ও অর্থপাচারের মাধ্যম হয়েছে, কিন্তু মানুষের ভাগ্য বদলাতে পারেনি। ১৯৭২ সালের প্রথম বাজেটের (৭৮৬ কোটি টাকা) চেয়ে আগামী বাজেট প্রায় হাজার গুণ বেড়ে ৯ লক্ষ ৩০ হাজার কোটি টাকা হচ্ছে, অথচ সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ১১ দলীয় জোটের নেতা ও প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত আগামী বাজেটে সংসদে একটি দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবে।

এনবিআর-সহ কর আদায়ের জায়গায় সীমাহীন দুর্নীতি হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রভাবে ধনীদের কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে চরম বিলাসী মানসিকতা দেখানো হচ্ছে।

মিয়া গোলাম পরওয়ার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের নাজুক চিত্র তুলে ধরে বলেন, জিডিপির ২% এর কম বরাদ্দ দিয়ে বাংলাদেশ শিক্ষা খাতে বিশ্বের সর্বনিম্ন বরাদ্দ দেওয়া 10টি দেশের একটি; এটি বাড়িয়ে দ্রুত ৬% করা দরকার। এছাড়া স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের ১৫% এবং কৃষিতে অন্তত ১০% করার দাবি জানান তিনি।

২০ কোটি মানুষের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও দুর্নীতির সুযোগ

সভায় সভাপতির ভাষণে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) ড. এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ সরকারের ফ্যামিলি কার্ডের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, নির্বাচনে ভোটারদের প্রভাবিত করতে জনসংখ্যা রিপোর্টের চেয়েও বেশি অর্থাৎ প্রায় ২০ কোটি মানুষের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও বিপুল ভর্তুকির যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা মূলত দুর্নীতি ও অর্থপাচারের বড় সুযোগ। এই বিপুল অপচয় বন্ধ করে জামায়াত মাত্র ৪০ হাজার কোটি টাকায় হতদরিদ্রদের জন্য একটি বিকল্প ও বাস্তবসম্মত সামাজিক সুরক্ষা কার্ডের প্রস্তাব করছে। জুলাই বিপ্লবের তরুণদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ ও এলডিসি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের দ্বিচারিতা পরিহার করার আহ্বান জানান তিনি।

বাস্তবতাহীন বাজেট ও কর মওকুফের ফাঁকি

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সদ্য-অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিব ও বাজেট বিশেষজ্ঞ ড. খ. ম. কবিরুল ইসলাম বলেন, আমলাতান্ত্রিক গতানুগতিকতা ভেঙে বাজেটকে বাস্তবমুখী করতে শক্তিশালী ‘পলিটিক্যাল কমিটমেন্ট’ প্রয়োজন। ব্যাংকিং খাতের এক-তৃতীয়াংশ টাকা পাচার হওয়ার সংকটের মধ্যে ৯ লক্ষ ৩ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটটি একেবারেই বাস্তবতাহীন।

তিনি আরও জানান, রাজস্বের প্রায় অর্ধেক অংশই ‘ট্যাক্স এক্সপেন্ডিচার’ বা কর মওকুফের নামে প্রিভিলিজ বা সুবিধাভোগীদের ছেড়ে দেওয়া হয়, যা বাজেটের আয়ের ক্ষেত্রে একটি বড় ফাঁকি। শিক্ষা খাতে অর্থ খরচের সক্ষমতা বাড়ানো এবং মেধা টানতে প্রাথমিক শিক্ষকদের ৯ম গ্রেডে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব করেন তিনি।

শিক্ষা খাতে দুর্নীতি ও নারীদের গৃহকর্মের আর্থিক মূল্যায়ন

এসময় জামায়াতের মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি এবং বর্তমান সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাংসদ নুরুন্নিসা সিদ্দিকা বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা জনগণের ওপর বাড়তি বোঝা চাপাবে। তিনি শিক্ষা খাতে রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা দুর্নীতি, কাজের ধীরগতি এবং অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পেনশন পেতে চরম হয়রানির তীব্র সমালোচনা করেন। এছাড়া, নারীদের গৃহকর্মের আর্থিক মূল্যায়ন এবং বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সৌরশক্তি (সোলার সিস্টেম) ব্যবহারে বাজেটে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।

কালো টাকা ও যুব শক্তির উন্নয়ন

সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য, জামায়াতের মহিলা আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাবিকুন্নাহার তাঁর বক্তব্যে বলেন, বাজেটের আকার বড় হওয়ার চেয়ে স্বচ্ছতা, জনকল্যাণ এবং ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। দেশের ৫০% তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে এবং দুর্নীতি দমনে মনিটরিং জোরদার করতে সাংবাদিক ও বিরোধী দলকে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে ইআরএফ অডিটোরিয়ামে উপস্থিত অর্থনৈতিক সাংবাদিকরা বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, রাজস্ব নীতি এবং করদাতাদের হয়রানি বন্ধের বিষয়ে তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।

বিএইচ