পাচার হচ্ছে পুঁজিবাজারের রিয়েলটাইম তথ্য; অভিযোগের কেন্দ্রে বিএসইসি ও ডিএসই

সানবিডি২৪ আপডেট: ২০২৬-০৬-০৪ ১০:১৬:১৬


পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো বিনিয়োগকারীদের তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে লেনদেন চলাকালে বিনিয়োগকারীদের তথ্য বাইরে পাচার হওয়ার অভিযোগে উদ্বেগ বাড়ছে। এ অভিযোগের তীর উঠেছে খোদ পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং দেশের প্রধান স্টক এক্সচেঞ্জ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) দিকে।

বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ

বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, লেনদেন চলা অবস্থায়ই বাজারের স্পর্শকাতর তথ্য বাইরে চলে যাচ্ছে। একজন বিনিয়োগকারী কোন কোম্পানির কতটি শেয়ার, কোন দামে এবং কোন বিও হিসাবের মাধ্যমে কিনছেন—এসব তথ্য বিভিন্ন মহলে পৌঁছে যাচ্ছে বলে দাবি তাদের। এতে করে বড় বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। কারণ একটি নির্দিষ্ট কোম্পানিতে অবস্থান নেওয়ার আগেই তাদের কৌশল বাজারে প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে, যা বিনিয়োগ পরিকল্পনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

কয়েকজন বিনিয়োগকারীর জানান, কোনো বড় বিনিয়োগকারী একটি কোম্পানির উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শেয়ার কেনার প্রস্তুতি নিলে অনেক ক্ষেত্রে মূল অর্ডার সম্পন্ন হওয়ার আগেই ওই শেয়ারের দাম ও লেনদেনের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। তাদের দাবি, এতে ধারণা পাওয়া যায় যে বাজারের কিছু অংশগ্রহণকারী আগাম তথ্য পেয়ে আগে থেকেই অবস্থান নিচ্ছেন এবং পরে মূল্য বৃদ্ধি থেকে সুবিধা নিচ্ছেন।

কয়েকজন বড় বিনিয়োগকারী অভিযোগ করেছেন, তারা কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানিতে ধারাবাহিকভাবে শেয়ার সংগ্রহ শুরু করার পর অল্প সময়ের মধ্যেই বাজারের বিভিন্ন মহলে তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ, ক্রয়ের সম্ভাব্য মূল্যসীমা এবং সংশ্লিষ্ট বিও হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তাদের মতে, এ ধরনের তথ্য সংরক্ষিত থাকে ডিএসই ট্রেডিং সিস্টেম এবং বিএসইসির সার্ভেইল্যান্স ইউনিটে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এ ধরনের তথ্য জানার সুযোগ থাকার কথা নয়। তথ্য ফাঁস হলে এ দুই সংস্থা থেকেই হয়ে থাকতে পারে। তথ্য সুরক্ষায় ডিএসই এবং বিএসইসির সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

বাজারে এর প্রভাব কী হতে পারে?

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, লেনদেন চলাকালে বিনিয়োগকারীদের স্পর্শকাতর তথ্য ফাঁস হওয়ার অভিযোগ সত্য হলে এর প্রভাব শুধু ব্যক্তি বিনিয়োগকারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; পুরো বাজার ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে বড় ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ কৌশল আগেভাগে প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বাজারে সক্রিয়তা কমিয়ে দিতে পারেন। এতে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হ্রাস পাবে এবং তারল্য সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি আধুনিক পুঁজিবাজারের অন্যতম ভিত্তি হলো তথ্যের সমতা। যদি কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অন্যদের আগে তথ্য পেয়ে যায়, তাহলে বাজারে অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যায় এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাজারে বিনিয়োগে অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন।

তথ্য ফাঁস হলে কী ক্ষতি হয়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগকারীদের রিয়েলটাইম লেনদেন তথ্য ফাঁস হলে কয়েকটি গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—

ফ্রন্ট রানিংয়ের সুযোগ বৃদ্ধি: কোনো বড় বিনিয়োগকারীর ক্রয় বা বিক্রয়ের তথ্য আগেই জেনে অন্যরা আগে লেনদেন করে মুনাফা করতে পারে।
বাজার কারসাজির ঝুঁকি বাড়ে: সংঘবদ্ধ চক্র তথ্য ব্যবহার করে শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানো বা কমানোর চেষ্টা করতে পারে।
বড় বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে: ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ কৌশল প্রকাশ হওয়ার আশঙ্কায় বাজার থেকে দূরে সরে যেতে পারেন।
বিদেশি বিনিয়োগ কমে যেতে পারে: তথ্য নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাজারকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।
সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন: তথ্যে অসম প্রবেশাধিকারের কারণে ছোট বিনিয়োগকারীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন।
বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হয়: তথ্য সুরক্ষার নিশ্চয়তা না থাকলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ে এবং বাজারের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মূলধন সংগ্রহ ব্যাহত হয়: আস্থাহীনতার কারণে বাজারে নতুন বিনিয়োগ কমে গেলে কোম্পানিগুলোর জন্য পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে।

পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি বাজারের স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা রক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই তথ্য পাচারের অভিযোগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক বাজারে তথ্য সুরক্ষায় হয় কঠোর নজরদারি

পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের উন্নত স্টক এক্সচেঞ্জগুলোতে বিনিয়োগকারীদের ব্যক্তিগত লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য অত্যন্ত গোপনীয় হিসেবে বিবেচিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি), যুক্তরাজ্যের ফাইন্যান্সিয়াল কনডাক্ট অথরিটি (এফসিএ) এবং সিঙ্গাপুর এক্সচেঞ্জ (এসজিএক্স)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করলেও কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের রিয়েলটাইম ক্রয়-বিক্রয় তথ্য সাধারণভাবে প্রকাশ করে না।

বিশেষজ্ঞরা জানান, উন্নত বাজারগুলোতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শেয়ারের মূল্য, লেনদেনের পরিমাণ ও বাজারের সামগ্রিক তথ্য দেখতে পারলেও কোনো নির্দিষ্ট বিনিয়োগকারী কত শেয়ার কিনছেন, কোন দামে কিনছেন বা কোন বিও হিসাবের মাধ্যমে লেনদেন করছেন—এসব তথ্য কঠোরভাবে সুরক্ষিত থাকে। কারণ এ ধরনের তথ্য প্রকাশ পেলে ‘ফ্রন্ট রানিং’, ইনসাইডার সুবিধা গ্রহণ এবং বাজার কারসাজির ঝুঁকি বেড়ে যায়।

তাদের মতে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্টক এক্সচেঞ্জ, ডিপোজিটরি প্রতিষ্ঠান এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার নিয়মিত স্বাধীন অডিট, ডাটা অ্যাক্সেস নিয়ন্ত্রণ এবং তথ্য ব্যবহারের ওপর কঠোর নজরদারি থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে তথ্য পাচারের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে এসব মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

যা বলছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের তথ্য ফাঁসের ঘটনা শুধু ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির কারণ নয়; এটি পুরো পুঁজিবাজারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে। বাজারে আস্থাহীনতা বাড়লে প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কমে যাবে, যা শিল্পায়ন ও মূলধন সংগ্রহের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) বর্তমান সভাপতি এবং ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ লিমিটেডের পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজার এক ধরনের আস্থাহীনতার মধ্যে রয়েছে। এখন আবার তথ্য পাচারের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। যদিও এ অভিযোগ নতুন নয়; এর আগেও তথ্য পাচারের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো এটি পুরোপুরি নির্মূল করতে পারেনি। পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় এ বিষয়ে দ্রুত নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।”

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ, পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)-এর চেয়ারম্যান আবু আহমেদ বলেন, “পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের তথ্যের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাইরে যায়, তাহলে বাজারে আস্থার সংকট আরও বাড়বে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন।”

অভিযোগের বিষয়ে ডিএসইর বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নুজহাত আনোয়ার বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে ডিএসইর আইটি বিভাগ ও সার্ভেইল্যান্স বিভাগের অডিট করা হয়েছে। সার্ভেইল্যান্স বিভাগের অডিট করেছে শ্রীলঙ্কার একটি প্রতিষ্ঠান। তারা ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদের কাছে তাদের প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ডিএসই থেকে তথ্য পাচারের কোনো সম্ভাবনা নেই। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহও প্রকাশ করা হয়নি। বরং তারা ডিএসইর বিভিন্ন কার্যক্রমের প্রশংসা করেছে। এরপরও যদি কোনো বিনিয়োগকারী অভিযোগ করেন, তাহলে আমরা বিষয়টিকে ২০০ শতাংশ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করব।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে বিএসইসির মুখপাত্র মো. আবুল কালামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। তিনি ফোন রিসিভ করে বলেন, “ব্যস্ত আছি, একটু পরে ফোন দিচ্ছি।” তবে এরপর কয়েকবার কল করা হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।

এএ