ডিজিটাল অর্থনীতি বদলে দিচ্ছে দেশের ব্যাংকিং ও বীমা খাত
::গিয়াস উদ্দিন আপডেট: ২০২৬-০৭-১৪ ১১:৫১:৫০
প্রথম পর্ব
- দেশের ৭৮ শতাংশ ডিজিটাল লেনদেন এখন এমএফএস ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংনির্ভর
- এক বছরে ডিজিটাল লেনদেন বেড়ে ৫৪৬ কোটি, মূল্য ১ কোটি ২ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা
- ২৪ ঘণ্টার ব্যাংকিং এখন হাতের মুঠোয়, বদলে গেছে গ্রাহকসেবার ধরন
- ডিজিটাল বীমায় অনলাইন পলিসি ও দ্রুত ক্লেইম নিষ্পত্তির যুগ
- ডিজিটাল অগ্রগতির সঙ্গে বাড়ছে সাইবার জালিয়াতি ও তথ্য চুরির ঝুঁকি
তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় বিকাশ, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং স্মার্টফোনের দেশব্যাপী প্রসারের ওপর ভর করে বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে একটি ক্যাশলেস ও সম্পূর্ণ ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে। একসময় যা ছিল কেবলই মোবাইল রিচার্জ বা সীমিত পরিসরে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যম, আজ তা দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাতের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে দেশের ব্যাংকিং ও বীমা খাতে প্রযুক্তির এই ছোঁয়া প্রথাগত প্রাচীন ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে। এই রূপান্তর কেবল গ্রাহকসেবাকেই সহজ করেনি, বরং দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। মোবাইল ইন্টারনেটের বিস্তার, স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ইন্টারনেট ব্যাংকিং, কিউআর পেমেন্ট, অনলাইন কেনাকাটা এবং ডিজিটাল সরকারি সেবার সম্প্রসারণ দেশের আর্থিক খাতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। একসময় ব্যাংক শাখায় গিয়ে যে কাজ করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় হতো, এখন তার বেশির ভাগই মোবাইল ফোনে কয়েক মিনিটে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল অর্থনীতির এই রূপান্তর শুধু লেনদেনের ধরন বদলাচ্ছে না; বরং ব্যাংক, বীমা, ফিনটেক ও গ্রাহকসেবার পুরো কাঠামোকে নতুনভাবে সাজিয়ে দিচ্ছে। তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি নতুন কিছু ঝুঁকিও সামনে এসেছে। ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রসারের সঙ্গে বাড়ছে সাইবার জালিয়াতি, তথ্য চুরি, ফিশিং, পরিচয় জালিয়াতি এবং অনলাইন প্রতারণার ঘটনা। ফলে নিরাপদ ডিজিটাল অবকাঠামো, কার্যকর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা এবং গ্রাহক সচেতনতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ঝুঁকি সফলভাবে মোকাবিলা করা গেলে ডিজিটাল অর্থনীতি শুধু ব্যাংক ও বীমা খাতের রূপান্তরই নয়, বরং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তোলার অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠবে।
ব্যাংকিং খাতে পরিবর্তন
ব্যাংকিং খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন: শাখা থেকে হাতের মুঠোয়ডিজিটাল অর্থনীতির কল্যাণে দেশের ব্যাংকিং খাত এখন আর চার দেয়ালের শাখা কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের ফ্রেমে বন্দি নেই। ব্যাংকিং সেবা এখন গ্রাহকের ঘরের দরজায়, এমনকি ২৪ ঘণ্টাই হাতের মুঠোয় এসে পৌঁছেছে।
স্মার্ট ব্যাংকিং ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং: দেশের প্রায় সব বাণিজ্যিক ব্যাংক এখন নিজস্ব অত্যাধুনিক মোবাইল অ্যাপস (যেমন: সেলফিন, সিটিটাচ, ইবিএল স্কাইব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক অল্ট ইত্যাদি) পরিচালনা করছে। এর মাধ্যমে গ্রাহকেরা ঘরে বসেই রিয়েল-টাইম ফান্ড ট্রান্সফার, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, ঋণের আবেদন এবং মুহূর্তের মধ্যে স্থায়ী আমানত খুলতে পারছেন।
ই-কেওয়াইসি ও ইনস্ট্যান্ট অ্যাকাউন্ট: জাতীয় পরিচয়পত্র এবং বায়োমেট্রিক ফেসিয়াল রিকগনিশন ব্যবহার করে মাত্র কয়েক মিনিটে কাগজবিহীন ব্যাংক হিসাব খোলার সুবিধা ব্যাংকিং খাতের চেহারা বদলে দিয়েছে।
বাংলা কিউআর ও ক্যাশলেস সোসাইটি: বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্বিক নির্দেশনায় দেশজুড়ে সর্বজনীন ‘বাংলা কিউআর’ দেশের পেমেন্ট ব্যবস্থায় নতুন বৈপ্লবিক মাত্রা যোগ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়া নির্দেশনায় সব মার্চেন্ট পয়েন্টে এটি বাধ্যতামূলক করার ফলে ক্ষুদ্র মুদি দোকান, রিকশাচালক থেকে শুরু করে বড় শপিংমল—সবখানে কার্ড কিংবা মোবাইল অ্যাপ স্ক্যান করে খুচরা টাকাও ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিশোধ করা যাচ্ছে।
এজেন্ট ব্যাংকিং ও প্রান্তিক সেবা: ব্যাংকের মূল শাখা নেই এমন প্রত্যন্ত অঞ্চলেও প্রযুক্তির সহায়তায় বায়োমেট্রিক পদ্ধতি ব্যবহার করে কোটি কোটি গ্রামীণ মানুষের দোরগোড়ায় ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেছে।
বীমা খাতে পরিবর্তন
ব্যাংকের তুলনায় ধীরগতিতে হলেও বীমা খাতেও ডিজিটাল রূপান্তর শুরু হয়েছে। বর্তমানে অনেক জীবন ও সাধারণ বীমা কোম্পানি অনলাইনে পলিসি বিক্রি, প্রিমিয়াম গ্রহণ, পলিসি নবায়ন এবং গ্রাহক অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চালু করেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ক্লেইম ব্যবস্থাপনা চালুর মাধ্যমে দাবি নিষ্পত্তির সময় কমানোর চেষ্টা করছে।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) বীমা খাতে ডিজিটালাইজেশনকে উৎসাহ দিচ্ছে। ভবিষ্যতে ই-ইনস্যুরেন্স প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল পলিসি এবং কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার চালু হলে গ্রাহকসেবা আরও সহজ হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। বীমা খাতে এই পর্যন্ত অনেকগুলো পরিবর্তন হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো-
বীমা (ইনস্যুরেন্স) খাতে প্রযুক্তির ছোঁয়া: কাগজের ফাইল থেকে ডিজিটালাইজেশন প্রথাগতভাবে বাংলাদেশের বীমা খাত কিছুটা ধীরগতির, আমলাতান্ত্রিক এবং কাগজের নথিনির্ভর হিসেবে পরিচিত হলেও, ডিজিটাল অর্থনীতি এই খাতেও বড় ধরণের কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে এসেছে।
ই-ইনস্যুরেন্স ও অনলাইন পলিসি: এখন গ্রাহককে বীমা পলিসি খোলার জন্য কোনো এজেন্টের মুখোমুখি হওয়া বা তাদের পেছনে ঘোরার প্রয়োজন হচ্ছে না। বিভিন্ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির মোবাইল অ্যাপ ও থার্ড-পার্টি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ঘরে বসেই বিভিন্ন প্রিমিয়ামের হার তুলনা করে মুহূর্তেই লাইফ বা নন-লাইফ পলিসি কেনা যাচ্ছে।
সহজ প্রিমিয়াম পরিশোধ ও এমএফএস ইন্টিগ্রেশন: বিকাশ, রকেট বা নগদের মতো এমএফএস সেবার মাধ্যমে গ্রাহকেরা প্রতি মাসে বা নির্দিষ্ট সময় পরপর কোনো ঝামেলা ছাড়াই ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়াম ঘরে বসে জমা দিতে পারছেন। এতে গ্রাহকের সময় বাঁচছে এবং প্রিমিয়ামের টাকা আত্মসাতের ঝুঁকি শূন্যে নেমে এসেছে।
ইনসারটেক ও দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি: প্রযুক্তিভিত্তিক বীমা বা ‘ইনসারটেক’ ধারণার ফলে দেশে শস্য বীমা, স্বাস্থ্য বীমা কিংবা ভ্রমণ বীমার মতো ক্ষুদ্র পলিসিগুলো দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বিগ ডাটা ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রাহকের বীমার দাবি যাচাই ও নিস্পত্তি এখন আগের চেয়ে অনেক কম সময়ে এবং নিখুঁতভাবে করা সম্ভব হচ্ছে।
গত ৫ বছরে ডিজিটাল লেনদেনের অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান ও বাজার পর্যালোচনা অনুযায়ী, দেশে ডিজিটাল লেনদেনের গ্রাফ প্রতিনিয়ত রকেটের গতিতে ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। মানুষের বড় অঙ্কের লেনদেনগুলো এখন কাগজের নোটের পরিবর্তে ক্রমশ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত হচ্ছে।
গত পাঁচ বছরে ডিজিটাল লেনদেনের প্রবৃদ্ধি:
গত পাঁচ বছরে দেশে ডিজিটাল লেনদেন ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় অনলাইন লেনদেনের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। এরপর থেকে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, কার্ড পেমেন্ট, ই-কমার্স এবং কিউআরভিত্তিক লেনদেনের পরিমাণ প্রতি বছরই ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘পেমেন্ট সিস্টেমস রিপোর্ট ২০২৫’ অনুযায়ী, এক বছরে ডিজিটাল লেনদেনের সংখ্যা ৪৮২ কোটি ৭০ লাখ থেকে বেড়ে ৫৪৬ কোটি ৩০ লাখে পৌঁছেছে। একই সময়ে লেনদেনের পরিমাণ ৯০ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ কোটি ২ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
গত পাঁচ বছরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে,গত ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট ডিজিটাল লেনদেনের সংখ্যা প্রায় ২৫০ কোটি। সে হিসেবে এর মোট আর্থিক মূল্য প্রায় ৬০.৫০ লাখ কোটি টাকা। আর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫.২ শতাংশ।
২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট ডিজিটাল লেনদেনের সংখ্যা প্রায় ৩১০ কোটি। সে হিসেবে এর মোট আর্থিক মূল্য প্রায় ৭২.২০ লাখ কোটি টাকা। আর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৯.৩ শতাংশ।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট ডিজিটাল লেনদেনের সংখ্যা প্রায় ৩৯০ কোটি। সে হিসেবে এর মোট আর্থিক মূল্য প্রায় ৮৫.১০ লাখ কোটি টাকা। আর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৭.৮ শতাংশ।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ডিজিটাল লেনদেনের ৪৮২.৭০ কোটি। সে হিসেবে এর মোট আর্থিক ৯০.৩৮ লাখ কোটি। আর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২.৫%
২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট ডিজিটাল লেনদেনের ৫৪৬.৩০ কোটি। সে হিসেবে এর মোট আর্থিক ১ কোটি ২ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা। আর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ শতাংশ।
অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষণ
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দেশের বার্ষিক ডিজিটাল লেনদেনের আর্থিক মূল্য ১ কোটি কোটি টাকার মাইলফলক অতিক্রম করেছে। বর্তমানে দেশের মোট ডিজিটাল ট্রানজেকশনের সিংহভাগ প্রায় ৭৮ শতাংশ নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে মোবাইল আর্থিক সেবা এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। এটি নির্দেশ করে সাধারণ মানুষ ডিজিটাল লেনদেনকে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অংশ বানিয়ে নিয়েছে।
সরাসরি গ্রাহকের লাভ: জীবনযাত্রায় স্বস্তিডিজিটাল রূপান্তরের ফলে দেশের সাধারণ এবং প্রান্তিক গ্রাহকদের জীবনে সরাসরি কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো সময় ও যাতায়াত খরচের সাশ্রয়। এক সময় ব্যাংকে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো, এখন আর সেটি করতে হয়না। যেকোনো বিল বা টাকা পাঠানোর জন্য যাতায়াত খরচ ও কর্মঘণ্টা দুটোই বাঁচছে।
অন্যদিকে নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতাও বেড়েছে। পকেটে করে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা বহন করার ট্র্যাডিশনাল ঝুঁকি ও চুরি-ছিনতাইয়ের ভয় কমেছে। প্রতিটি লেনদেনের একটি সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল ট্রেইল বা প্রমাণ থাকায় আর্থিক জালেরিয়াতের সুযোগ কমে এসেছে। একই সাথে ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে থাকা দেশের বিশাল প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে গ্রামীণ নারী, কৃষক ও ক্ষুদ্র কুটির শিল্প উদ্যোক্তারা খুব সহজেই আনুষ্ঠানিক আর্থিক কাঠামোর মধ্যে আসতে পেরেছেন, যা তাদের সঞ্চয়ের প্রবণতা বাড়িয়েছে।
বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ: যা মোকাবিলা করা জরুরি
ডিজিটাল অর্থনীতির সম্ভাবনা যত বাড়ছে, ততই সামনে আসছে নতুন চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী ডেটা নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ ডিজিটাল অবকাঠামো, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও গ্রাহক সচেতনতা ছাড়া টেকসই ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। চ্যালেঞ্জের মধ্যে অন্যতম হলো-
সাইবার নিরাপত্তা ও জালিয়াতি: ডিজিটাল লেনদেন বাড়ার সাথে সাথে ফিশিং, ওটিপি জালিয়াতি, ক্লোনিং এবং হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষ সাইবার অপরাধীদের ফাঁদে পড়ে টাকা হারাচ্ছেন।
ডিজিটাল লিটারেসি বা দক্ষতার অভাব: দেশের একটি বড় অংশের মানুষের, বিশেষ করে গ্রামীণ ও বয়োজ্যেষ্ঠ জনগোষ্ঠীর এখনও স্মার্টফোন ব্যবহারে কিংবা ডিজিটাল অ্যাপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত কারিগরি জ্ঞান নেই।
উচ্চ ফি ও কর কাঠামো:ক্যাশ আউট চার্জ কিংবা মার্চেন্ট পেমেন্টের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খরচ এবং ইন্টারনেটের ওপর করের বোঝা সাধারণ মানুষকে পুরোপুরি ক্যাশলেস হতে অনেক সময় নিরুৎসাহিত করে।
অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা: দেশের সব অঞ্চলে সমান গতির নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সংযোগের অভাব ডিজিটাল ব্যাংকিং ও বীমা সেবার প্রসারে বড় অন্তরায়।
সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য
ফিনটেক বিশেষজ্ঞ ও ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী বলেন, ডিজিটাল অর্থনীতি বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও বীমা খাতের ব্যবসায়িক মডেলই বদলে দিচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর সেবার ফলে গ্রাহক এখন যেকোনো সময়, যেকোনো স্থান থেকে ব্যাংকিং ও বীমাসেবা গ্রহণ করতে পারছেন। এতে সেবার গতি ও স্বচ্ছতা যেমন বেড়েছে, তেমনি আর্থিক অন্তর্ভুক্তিরও নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এই অগ্রগতিকে টেকসই করতে নিরাপদ ডিজিটাল অবকাঠামো, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা এবং উদ্ভাবনবান্ধব নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ডিজিটাল অর্থনীতি দেশের আর্থিক খাতকে আরও দক্ষ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, দেশের প্রায় ১২ হাজার ব্যাংক শাখা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন কার্যালয়ে নগদ অর্থ পরিবহন, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় বিপুল জনবল ও অবকাঠামো ব্যবহার করতে হয়, যার বার্ষিক ব্যয় প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। এই ব্যয় কমানোর পাশাপাশি জনগণের জন্য দ্রুত, নিরাপদ ও সহজ আর্থিক সেবা নিশ্চিত করতে নগদনির্ভর লেনদেন থেকে ধীরে ধীরে ক্যাশলেস বা ডিজিটাল লেনদেনে যেতে হবে। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে শুধু প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়নই নয়, মানুষের মানসিকতা ও লেনদেনের অভ্যাসেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা জরুরি।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের সভাপতি ও পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বিএম ইউসুফ আলী বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বীমা খাতের জন্য এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের দাবি। অনলাইনে প্রিমিয়াম পরিশোধের সুবিধা চালু হলে গ্রাহকের সময় ও ব্যয় কমবে, প্রিমিয়াম পরিশোধে নিয়মিততা বাড়বে এবং বীমা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও দক্ষ হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব।
তবে ডিজিটাল বীমা সেবার বিস্তারের জন্য নিরাপদ পেমেন্ট অবকাঠামো, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা, গ্রাহকের তথ্যের সুরক্ষা এবং উপযোগী নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বীমা কোম্পানিগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করলে ডিজিটাল বীমা সেবা দেশের বীমা খাতের প্রবৃদ্ধি ও বীমা অন্তর্ভুক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।
সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)-এর সভাপতি মাশরুর আরেফিন বলেন, ডিজিটাল ব্যাংকিং এখন আর বিকল্প কোনো সেবা নয়, এটি আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। গ্রাহকরা দ্রুত, নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রত্যাশা করেন। তাই ব্যাংকগুলোকে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন, উন্নত সাইবার নিরাপত্তা এবং গ্রাহককেন্দ্রিক ডিজিটাল সেবায় আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল পেমেন্টের বিস্তার, আন্তঃসংযোগযোগ্য (Interoperable) অবকাঠামো এবং গ্রাহকের আস্থা নিশ্চিত করা গেলে দেশের ক্যাশলেস অর্থনীতির লক্ষ্য বাস্তবায়ন আরও সহজ হবে।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর চেয়ারম্যান মির নাদিয়া নিভিন বলেন, বীমা খাতকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও গ্রাহকবান্ধব করতে ডিজিটাল রূপান্তরের কোনো বিকল্প নেই। অনলাইনে প্রিমিয়াম পরিশোধ, ডিজিটাল পলিসি, ই-কেয়াইসি এবং অনলাইন ক্লেইম নিষ্পত্তির মাধ্যমে গ্রাহকের সময় ও ব্যয় কমবে,পাশাপাশি সেবার মান ও জবাবদিহি বাড়বে। আইডিআরএর লক্ষ্য এমন একটি ডিজিটাল বীমা ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা, যেখানে দেশের যেকোনো প্রান্তের মানুষ নিরাপদে ও সহজে বীমাসেবা গ্রহণ করতে পারবেন। তবে ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা, গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষা এবং নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, ক্যাশলেস সমাজ গঠন এখন শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের এজেন্ডা নয়, এটি একটি জাতীয় এজেন্ডা। নগদ লেনদেন কমিয়ে ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়াতে ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে ‘বাংলা কিউআর’ হবে দেশের ডিজিটাল পেমেন্টের জাতীয় মান এবং ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলার অন্যতম ভিত্তি।
এএ






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













