দেশি পশুতে মিটবে কোরবানির চাহিদা: প্রাণীসম্পদ প্রতিমন্ত্রী

আপডেট: ২০১৭-০৮-১৮ ০০:২৭:৪৭


ERF-PKSF-Minister-1মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বলেছেন, চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত পশু মজুদ আছে। আসছে কোরবানির ঈদে তাই পশুর কোনো সংকট হবে না। বাজারে উত্তরাঞ্চলের বন্যারও কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পিকেএসএফ ভবনে ‘দারিদ্র্য বিমোচন ও টেকসই উন্নয়নে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি একথা বলেন। অর্থনৈতিক প্রতিবেদকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) ও পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে ইআরএফ ও পিকেএসএফের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি হয়।ইআরএফের সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান ও পিকেএসএফের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জসীম উদ্দিন এ চুক্তিতে সই করেন। এই সমঝোতা অনুসারে গ্রামীণ অর্থনীতি বিষয়ক রিপোর্টিং এর জন্যে প্রতি বছর ৩টি বিভাগে (টেলিভিশন, পত্রিকা এবং অনলাইন) ৩ জন করে মোট ৯ জনকে সম্মাননা দেওয়া হবে। একটি জুরি বোর্ডের মাধ্যমে প্রতিবেদন বাছাই করে বিজয়ীদের নির্ধারণ করা হবে। এছাড়া উভয় প্রতিষ্ঠান যৌথ উদ্যোগে নিয়মিত গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি, প্রাণীসম্পদ, মৎস্যসম্পদ, শস্য, কুটির শিল্প ইত্যাদি বিষয়ে সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করবে।

এই সমঝোতার আওতায় প্রতিবছর ইআরএফের ২ জন সদস্যকে ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসে অর্থনীতিতে ডিপ্লোমা অথবা স্নাতকোত্তর পড়াশোনার ব্যয়ভার বহন করবে পিকেএসএফ।

অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বলেন, গত বছর ঈদে ১ কোটি ৪ লাখ পশু কোরবানি করা হয়েছিল। এবছর এখন পর্যন্ত ১ কোটি ১৫ লাখ ৫৭ হাজার পশু প্রস্তুত আছে। প্রতিবছর বেশ কিছু নতুন কোরবানি বাড়ে। সেই হিসাবে এবার ১ কোটি ১৫ লাখ পশুর চাহিদা রয়েছে। চাহিদার চেয়ে বেশি পশু রয়েছে আমাদের। তাই এবারের কোরবানিতে পশু ঘাটতি পড়ার কোনো আশঙ্কা নেই।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেসব এলাকায় বন্যা হয়েছে; সেখানে ব্যাপকহারে পশু মারা গেছে- এমন খবর আমাদের কাছে নেই। তবে কিছু জায়গায় বেশকিছু গরু, ছাগল এবং ভেড়া মারা গেছে। তাতে ঘাটতি পড়ার আশঙ্কা অনেক কম। তবে বন্যাপীড়িত এলাকায় পশু খাদ্যের বেশ সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। আমরা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের মাধ্যমে খাবার সরবরাহের চেষ্টা করছি।
“এখন পর্যন্ত খামারিদের খাদ্য সহায়তা দিচ্ছি। তারা যদি খুব বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে, খামার পরিচালনায় সক্ষমতা হারায়; সেক্ষেত্রে সরকার ভেবে দেখবে।”

এবারের কোরবানিতে ভারতীয় গরু আসবে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এবারের ভারতীয় গরু আসার সম্ভাবনা নেই। যদি আইনগত বিষয় ঠিক থাকে তবে আসার সম্ভাবনা নেই। কারণ এবার আমাদের কোরবানির জন্য পর্যাপ্ত পশু রয়েছে। বাইরে থেকে পশু আসাকে আমরা উৎসাহিত করছি না। এতে সাময়িক দর কমলেও পরে খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এর আগে তিনি মাছ চাষ, কাকড়া, কুঁচিয়া, গবাদি পশু চাষের উন্নয়ন নিয়ে বক্তব্য রাখেন। এসময় তিনি বাহামা জাতের গরু চাষ করতে খামারিদের উৎসাহিত করেন। কারণ, একটি বাহামা ষাড়ের ওজন না-কি ১ হাজার কেজির বেশি হয়ে থাকে। তাতে ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে মাংসের চাহিদা মিটবে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, সারা বছর মাংসের জন্য যে পশুর প্রয়োজন হয়; শুধু এক কোরবানিতেই লাগে সেই পরিমাণ। উত্তরাঞ্চলে অনেক সময় দুধ না-কি অবিক্রিত থেকে যায়। তাতে খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুধ নিয়ে তিনি সামাজিক সচেতনতার কথা বলেন। প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন, অর্থনৈতিক পরিকল্পনার রূপরেখা যদি ৪২ বছর আগে নেওয়া হত; তবে এখন অনেক এগিয়ে থাকত। অবশ্য বর্তমান সরকার নতুন করে সেই রূপরেখা প্রণয়ন করেছে। যার বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।

অনুষ্ঠানে পিকেএসএফ চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জামান আহমদ বলেন, বাংলাদেশে কৃষির গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ এখনও ৪৭ শতাংশ মানুষ কৃষির সাথে সরাসরি জড়িত। তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যা অনেক বেশি। তাই কৃষিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। আর এটাকে টেকসই করতে হলে শিল্পায়ন করতে হবে।

তিনি দাবি করেন, আমাদের দেশে ক্ষুদ্রঋণের ধারণা ভুল। কারণ এটা দিয়ে দারিদ্র্য মুক্ত করা যায় না। ধরেন, ১ জন মানুষের চাষের জন্য ১০ হাজার টাকা ক্ষুদ্র ঋণ পায়; অথচ তার দরকার ৪০ হাজার টাকা। সে কোথা থেকে এই অর্থ পাবে। বাকি টাকা জোগাড় করতে না পারায় ওই ১০ হাজার টাকাই খেয়ে ফেলে। তার যা প্রয়োজন তাকে তাই দেওয়াই ক্ষুদ্রঋণ। কিন্তু সেটা হয় না। তিনি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের জন্য দলিত, হাওরবাসী, উপকূলবাসী, চা বাগান কর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ পিছিয়ে পড়া জাতিগোষ্ঠীকে এগিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন।

সেমিনারে বিশেষ অথিতির বক্তব্যে অতিরিক্ত সচিব (মৎস্য) ড. মো. নজরুল আনোয়ার বলেন, এখন ইলিশের উৎপাদন ও আকার দ্বিগুণ হয়েছে। মাছের অন্যান্য খাতের উৎপাদন কমলেও কাকড়া ও কুঁচিয়া চাষে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। তবে আগের তুলনায় গরু চাষ কমেছে।

“এটা খতিয়ে দেখতে সরকার স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা করেছে। সেইভাবে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সরকার গত ৫ বছরে ৫০ লাখ কৃষককে প্রশিক্ষণও দিয়েছে।” এসময় ইআরএফের সভাপতি সাইফ ইসলাম দিলাল বলেন, আমরা এমন এক সময়ে উপস্থিত হয়েছি; যখন দেশের অধিকাংশ জেলা বন্যাকবলিত। যদি এই গ্রামবাংলার মানুষের কর্মের কথাগুলো, সমাজে তাদের ক্ষুদ্র অবদানগুলো দেশের জনগণের কাছে তুলে ধরা সম্ভব হয়, তবে একটি সুন্দর চিত্র ফুটে উঠতো। সরকারও এ থেকে উপকৃত হতো। আর পিকেএসএফ এদের নিয়ে কি কাজ করে তাও জানতে পারত দেশের মানুষ।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিকেএসএফের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জসীম উদ্দিন। তিনি তার উপস্থাপিত প্রবন্ধে মাছ, মাংস, দুধসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর বক্তব্য রাখেন। । চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ডিম, মাংস ও দুধের জন্য নীতিমালা তৈরি, লাইফস্টক খাতের নীতিমালা, ভারতীয় পশু আমদনি, অপর্যাপ্ত বাজার অবকাঠামো, লাইফস্টক পণ্যের মূল্যায়ন, মাঠপর্যায়ে এজেন্সিগুলোর অপর্যাপ্ততাকে উল্লেখ করেন।

এসময় পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল করিম, ইআরএফের সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান, বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।