পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী আসন বাড়ানো যাবে না

ডেস্ক প্রকাশ: ২০১৮-০৮-১৩ ১০:০৬:২৮


অবকাঠামো ও অন্যান্য আয়োজন না বাড়লেও প্রতি বছরই শিক্ষার্থী ভর্তির সময় আসন সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এতে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপে শিক্ষার মান বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তবে এখন থেকে অপরিকল্পিতভাবে আসন বৃদ্ধির সে সুযোগ আর থাকছে না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থী আসন না বাড়ানোর বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে (ইউজিসি) সম্প্রতি চিঠি পাঠিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরই ধারাবাহিকতায় শিক্ষার্থী আসন না বাড়াতে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে চিঠি দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউজিসি।

গত ৩১ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ইউজিসিতে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ‘প্রধানমন্ত্রী গত ১০ জুলাই একনেক সভায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা আর না বাড়ানোর জন্য অনুশাসন দিয়েছেন। অতএব প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’

শিক্ষার্থী সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি যত্রতত্র বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়ার বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে ওই চিঠিতে। এতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জনসংখ্যা, বিস্তৃতি ও প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিতে হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সব বিশ্ববিদ্যালয়কে চিঠি দেয়া হবে বলে জানান ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের শাহ আলম। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে চিঠি প্রণয়নের কাজ চলছে। সব বিশ্ববিদ্যালয়কে চিঠির মাধ্যমে এ নির্দেশনার কথা জানিয়ে দেয়া হবে।

দেশে বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ৩৭টি। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর মোট আসন সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক শ্রেণীর ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থী আসন ছিল ৭ হাজার ১০৮টি। তবে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে ২০টি আসন বাড়িয়ে ভর্তি বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

আসন না বাড়াতে সরকারের নির্দেশনার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘এখনো আমাদের কাছে এ ধরনের কোনো চিঠি আসেনি। চিঠি হাতে না পেয়ে এ বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।

আসন সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও। গত বছর বিশ্ববিদ্যালয়টিতে আসন সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৬৩৬টি। এ বছর আসন সংখ্যা বাড়বে ৭০টি। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক শাখার উপ-রেজিস্ট্রার এএইচএম আসলাম হোসেন জানান, ‘এ বছর ব্যবসা ও বাণিজ্য আইন নামে একটি নতুন বিভাগ চালু হবে। এতে আসন সংখ্যা ৫০টি। এছাড়া ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স এবং ম্যাটেরিয়াল সায়েন্সে ১০টি করে ২০টি আসন বাড়ানো হবে।’

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কোন পরিপ্রেক্ষিতে আসন বাড়াতে নিষেধ করেছেন, তা আমি জানি না। আর এ সম্পর্কে আমার কাছে কোনো নির্দেশনা আসেনি। আমরা আসন বাড়ানোর বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কিছুই জানাইনি। যদি প্রধানমন্ত্রী নিষেধ করেন, তবে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে আমরা আসন অপরিবর্তিত রাখব।’

গত বছর খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) তিনটি অনুষদভুক্ত ১৮টি বিভাগ ও তিনটি ইনস্টিটিউটে স্নাতক পর্যায়ে শিক্ষার্থী আসন ছিল ১ হাজার ৫টি। চলতি বছর আসন সংখ্যা বাড়িয়ে ১ হাজার ৬৫টি করা হয়েছে। একইভাবে অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও নতুন বিভাগ খোলা ও পুরনো বিভাগে আসন সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে শিক্ষার্থী সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আসন সংখ্যা না বাড়ানোর নির্দেশনা দেয়া হলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য অনুমোদিত অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী বিভাগ খোলা ও আসন সৃষ্টিতে কোনো বাধা থাকবে না বলে জানিয়েছেন ইউজিসির ইনফরমেশন, ম্যানেজমেন্ট, কমিউনিকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং ডিভিশনের পরিচালক খন্দকার হামিদুর রহমান। তিনি বলেন, যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে এর আগে অর্গানোগ্রাম অনুমোদন দেয়া হয়েছে, সে অনুযায়ী তারা বিভাগ খুলতে পারবে ও শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে পারবে। তবে অর্গানোগ্রামের বাইরে শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ানো যাবে না।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, অনেক সময় অপরিকল্পিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন ও শিক্ষার্থী আসন বাড়ানো হয়। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে এলে তিনি এ নিয়ে অনুশাসন দিয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সে আলোকে নির্দেশনা এসেছে। চিঠির মাধ্যমে সব বিশ্ববিদ্যালয়কে নির্দেশনাটি জানিয়ে দেয়া হবে। আশা করছি, সবাই বিষয়টি অনুসরণ করবেন।

এদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও প্রতি বছরই উচ্চমাধ্যমিক পাস করা শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ছে। গত বছর আটটি সাধারণ বোর্ড, মাদ্রাসা এবং কারিগরি বোর্ডের অধীনে মোট ১১ লাখ ৬৩ হাজার ২৭০ জন শিক্ষার্থী উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে পাস করে ৮ লাখ ১ হাজার ৭১১ জন। আর চলতি বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১২ লাখ ৮৮ হাজার ৭৫৭ জন। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৮ লাখ ৫৮ হাজার ৮০১ জন। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৫৭ হাজার ৯০ জন।

আসন সংখ্যা না বাড়াতে সরকারের এমন নির্দেশনা উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টিকে বাধাগ্রস্ত করবে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, প্রাথমিক থেকে শুরু করে সর্বস্তরের শিক্ষায় শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ বেড়েছে। আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পরিবারের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার একমাত্র ভরসা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। আসন সংখ্যা না বাড়ালে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সংকুচিত হবে।

তবে তিনি এও বলেন, পর্যাপ্ত অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়িয়েও লাভ নেই। কেননা শিক্ষার্থী অনুপাতে পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষক ও অবকাঠামো না হলে গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ডাবল শিফট বা সেকশন চালু করা যেতে পারে।