চার মাস পর শুরু এলএনজি সরবরাহ
নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশ: ২০১৮-০৮-১৯ ২২:৩৬:২৪
নির্ধারিত সময়ের প্রায় চার মাস পর অবশেষে দেশের প্রথম ভাসমান টার্মিনাল (এফএসআরইউ) থেকে সরবরাহ শুরু হলো ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)। শনিবার দুপুর আড়াইটার পর থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে এ গ্যাস বিতরণ শুরু হয়। এর মাধ্যমে ব্যয়বহুল এ জ্বালানি ব্যবহারকারী বিশ্বের অন্য দেশগুলোর কাতারে শামিল হলো বাংলাদেশ, যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৬তম। এদিকে দেশের প্রথম এ টার্মিনাল থেকে দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের কথা থাকলেও মাত্র সাড়ে ৭ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে বলে সঞ্চালন কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে। তবে কবে নাগাদ পূর্ণ সক্ষমতায় তথা ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু হবে সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানা যায়নি।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের সমুদ্রসীমানায় পৌঁছে এলএনজি কমিশনিং কার্গো বা এলএনজিবাহী জাহাজ এক্সিলেন্স। মে মাসের প্রথম দিকে ভাসমান টার্মিনাল থেকে রিগ্যাসিফিকেশন শেষে ওই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সাব-সি পাইপলাইনের ত্রুটির কারণে তা পুনর্নির্ধারণ করা হয় ১৫ মে। ওই সময়ের মধ্যেও সমস্যা সমাধান করতে না পেরে তৃতীয় দফায় ২৬ মে তারিখ নির্ধারণ করা হয়। তাতেও ব্যর্থ হয় নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট। এরপর জুনেও দুবার পিছিয়ে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে এলএনজি চালুর কথা বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। সর্বশেষ গত শুক্রবার সাব-সি পাইপলাইনের ত্রুটি সমাধান করে মহেশখালীর জিরো পয়েন্টের মাধ্যমে গ্যাস দেয়া শুরু হয়। ওই গ্যাস দিয়ে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) ৯১ কিলোমিটার পাইপলাইন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।
পাইপলাইন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে শনিবার দুপুর থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ শুরু করে জিটিসিএল। এ বিষয়ে জিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলি মো. আল মামুন বলেন, আজ (শনিবার) দুপুর আড়াইটা থেকে গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাস দেয়া শুরু হয়েছে। এখন দৈনিক ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট বা সাড়ে ৭ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেয়া হচ্ছে। আগামী মাস থেকে সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে কাজ করছে এলএনজি প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)।
জানা যায়, কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভাসমান এ টার্মিনালের বার্ষিক রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা ৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন। যেখান থেকে দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় সঞ্চালন লাইনে যোগ হওয়ার কথা। কিন্তু এখন সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র সাড় ৭ কোটি ঘনফুট। বাকি সাড়ে ৪২ কোটি ঘনফুট কবে যোগ হবে সেটি নিশ্চিত নয়। অথচ এ সাড়ে সাত কোটি ঘনফুট ব্যবহার করে পুরো ৫০ কোটি ঘনফুটের দামই পরিশোধ করতে হবে গ্রাহককে। কারণ সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী পাঁচ বছরের মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ এলএনজি ব্যবহার না করলেও সরবরাহকারী দেশ কাতারকে ওই টাকা দিতে হবে। যতটুকু ব্যবহার ততটুকুর অর্থ পরিশোধের কোনো সুযোগ নেই ওই চুক্তিতে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এলএনজি প্রকল্পের সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা আরপিজিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক কাজী আনোয়ার আযীম বলেন, এলএনজি সরবরাহে ভাসমান টার্মিনাল প্রস্তুত রয়েছে। সঞ্চালন কোম্পানি চাইলে সক্ষমতার সবটুকু আমরা সরবরাহ করতে পারব।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, এলএনজি জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে সরবরাহের জন্য সমুদ্র উপকূল থেকে আনোয়ারা এবং আনোয়ারা থেকে ফৌজদার হাট পর্যন্ত দুই ভাগে ১২১ কিলোমিটারের দুটি পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করে জ্বালানি বিভাগ। এর মধ্যে মহেশখালী থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত ৩০ সেন্টিমিটার ব্যাসের ৯১ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। তবে আনোয়ারা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত ৪২ সেন্টিমিটার ব্যাসের ৩০ কিলোমিটার লাইনের কাজ এখনো শেষ হয়নি। যদিও এলএনজি প্রকল্পের সঙ্গে মিল রেখে ছয় মাস আগেই এ লাইন স্থাপনের কথা ছিল। ওই পাইপলাইনের কারণে আপাতত চট্টগ্রামের বাইরে এলএনজি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে পাইপলাইন টানতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে জিটিসিএল। একবার ভুল পাইপলাইন স্থাপন করে সেটি তুলে এখন নতুন করে পাইপলাইন স্থাপন করতে গিয়ে নানা জটিলতার মুখোমুখি সংস্থাটি।
জানা গেছে, বর্তমানে প্রতিদিন ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করে পেট্রোবাংলা। কিন্তু চাহিদা রয়েছে ৪১০ কোটি ঘনফুট। দৈনিক ১৪০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। গ্যাসের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও শিল্পে নতুন গ্যাস সংযোগের জন্য চাপের বিপরীতে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন অপ্রতুল। এছাড়া বিদ্যমান মজুদও শেষ হওয়ার পথে। তাই জ্বালানি সংকট সমাধানে ২০১০ সালে এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে দেশের প্রথম এলএনজি টার্মিনাল ব্যবহার বিষয়ে ২০১৬ সালের ৩১ মার্চ চুক্তি করে পেট্রোবাংলা। নির্মাণ, মালিকানা, পরিচালন ও হস্তান্তরের (বিওওটি) ভিত্তিতে চুক্তি করা হয়। কাতার থেকে এলএনজি গ্যাস আমদানি করে এ টার্মিনালের মাধ্যমে রিগ্যাসিফিকেশন শেষে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহ করা হবে। টার্মিনাল ব্যবহার বাবদ এক্সিলারেট এনার্জিকে বছরে ৯০ হাজার মার্কিন ডলার দিতে হবে পেট্রোবাংলাকে। এছাড়া এলএনজি ক্রয় ব্যয় তো রয়েছেই।






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন














