চলতি অর্থবছরেই দারিদ্র্যের হার নামবে ২০ শতাংশের নিচে

সান বিডি ডেস্ক প্রকাশ: ২০১৮-০৯-০৫ ০৯:৫৫:৩০


বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের যখন অভ্যুদয় হয়, তখন ৮৫ শতাংশ মানুষ ছিল দরিদ্র। স্বাধীনতার ২৯ বছর পরে ২০০০ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রতি ১০ জনে প্রায় পাঁচজন ছিল গরিব। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সর্বশেষ যে জরিপ করেছে তাতে দারিদ্র্যের হার দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ।

সরকারের দারিদ্র্য বিমোচন-সংক্রান্ত ফোকাল পয়েন্ট পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) ২০১৭-১৮ অর্থবছর শেষে দেশে দারিদ্র্যের হার ২১ শতাংশ প্রক্ষেপণ করেছে। এর অর্থ হচ্ছে, বর্তমানে প্রতি ১০ জনে দু’জন মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন। চলতি অর্থবছর শেষে তা আরও কমে ১৯ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়াবে বলে প্রাক্কলন করেছে জিইডি।

জিইডি বলেছে, এক দশক আগে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে ২০২১ সালের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য অর্জনের পরিকল্পনা করে। যে কারণে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে। সরকার আশা করছে, ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে ১০ জনে একজন দরিদ্র থাকবে। আর অতি-দারিদ্র্য বলতে যা বোঝায় তা থাকবে না। বিবিএসের হিসাবে, ২০০০ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ। ওই সময় অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ৩৪ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০০৫ সালে দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়ায় ৪০ শতাংশে। আর অতি দারিদ্র্যের হার নেমে আসে ২৫ দশমিক ১ শতাংশে। এরপর ২০১০ সালের জরিপে দারিদ্র্যের হার নেমে আসে ৩১ দশমিক ৫ শতাংশে আর অতি দারিদ্র্যের হার দাঁড়ায় ১৭ দশমিক ৬ শতাংশে। বিবিএস সর্বশেষ যে জরিপ করেছে তাতে দেখা গেছে, ২০১৬ সালের জুন শেষে দারিদ্র্যের হার দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে। আর অতি-দারিদ্র্যের হার নেমে এসেছে ১২ দশমিক ৯ শতাংশে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কাজের সুযোগ বৃদ্ধি, কৃষির রূপান্তর, যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং বিদ্যুতায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কারণে দারিদ্র্য বিমোচন হচ্ছে। কিছু কিছু এলাকার জন্য বিশেষ কর্মসূচিও দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়তা করেছে।

জিইডি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে। বর্তমানে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে। ২০২০ সালে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা শেষ হবে। জিইডি প্রাক্কলন করেছে, সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শেষে দেশে দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসবে।

এ বিষয়ে জিইডি সদস্য শামসুল আলম বলেন, দারিদ্র্যের মাঝেই বাংলাদেশের জন্ম। স্বাধীনতার পর দেশের অগ্রগতির পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। নানান চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছিল না। ১৯৯০-এর পর গণতান্ত্রিক ধারা ফিরে আসে। তখন থেকে বাজার উন্মুক্ত হয়। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হতে থাকে। কিন্তু অগ্রগতি বিশেষ হয়নি। বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে উন্নয়নের রূপকল্প হাতে নেয়। ২০২১ সালের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য অর্জনের লক্ষ্যে এগোচ্ছে সরকার। যার ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উল্লম্ম্ফন হয়েছে।

এদিকে আয় বৈষম্য যাতে না বাড়ে সেজন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে সড়ক জনপথ গড়ে তোলা হয়েছে। কৃষির আধুনিকায়ন হয়েছে। উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বিদ্যুতায়ন বেড়েছে। এসব কারণে দারিদ্র্য কমেছে। এসডিজি বাস্তবায়নে অনেক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। যা আগামীতে দারিদ্র্য কমার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে।

বিবিএসের খানা আয়-ব্যয় জরিপের প্রকল্প পরিচালক দিপঙ্কর রায় বলেন, দারিদ্র্য কমে আসার অন্যতম কারণ দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। মানুষের কাজের সুযোগ হয়েছে। এখন গ্রামাঞ্চলেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হচ্ছে। কৃষির রূপান্তর হয়েছে। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়া বিদেশে কর্মসংস্থান এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।

তিনি বলেন, সরকার কিছু সামাজিক উদ্যোগ নিয়েছে যার ফলে দারিদ্র্য কমছে। এর মধ্যে মেয়েদের বাল্যবিয়ে বন্ধে আইন প্রণয়ন একটি অন্যতম উদ্যোগ। বাল্যবিয়ে বন্ধ হওয়ার কারণে মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে, লেখাপড়া শিখছে। এসব মেয়ে পরে উপার্জনশীল কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হচ্ছে। আর এক্ষেত্রে স্কুলে মেয়েদের লেখাপড়ায় উপবৃত্তি বিশাল ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া শস্য বহুমুখীকরণ, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্পের বিকাশ দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। হাওর, চর, মঙ্গা এলাকায় অনেক উন্নতি হয়েছে। এসব এলাকায় ধান, পাট, শাকসবজি, ফলমূল ও মাছ-মাংসের উৎপাদন বেড়েছে। সরকার এসব ক্ষেত্রে বীজ প্রাপ্তি সহজ করেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করায় এসব এলাকায় উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত সহজ হয়েছে। এ ছাড়া দেশে চাহিদা বেড়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন শ্রম খাতের নূ্যনতম মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও বেড়েছে।