উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ২৫ সমস্যা চিহ্নিত

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশ: ২০১৮-০৯-০৭ ০৯:৩২:৫১


বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অনেক প্রকল্প সময়মতো ও মানসম্মতভাবে বাস্তবায়ন হয় না- এ অভিযোগ অনেক পুরনো। কেন হয় না, সে বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশন বিভিন্ন সময় কিছু কারণও উল্লেখ করেছে। এবার সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তদারকির দায়িত্বে থাকা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এডিপি বাস্তবায়নে ২৫টি সমস্যা চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে প্রকল্প প্রণয়নে নানা ধরনের দুর্বলতা ও সংশ্নিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের অভাব। আইএমইডির এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় প্রকল্প বাস্তবায়নের ২৫টি সমস্যা তুলে ধরে তা সমাধানের সুপারিশ করেছে আইএমইডি। সভায় প্রধানমন্ত্রী আইএমইডি চিহ্নিত সমস্যা ও সুপারিশ বাস্তবভিত্তিক ও সময়োপযোগী বলে উল্লেখ করেন। সুপারিশগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি আইএমইডি সচিব মফিজুল ইসলাম সব সিনিয়র সচিব ও সচিবদের কাছে সমস্যাগুলো উল্লেখ করে তা সমাধানের সুপারিশ পাঠিয়েছেন।

আইএমইডি সচিব মফিজুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্প সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের জন্য বাস্তবভিত্তিক কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এসব সুপারিশ প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন করেছেন। এ জন্য সব মন্ত্রণালয়কে তা অনুসরণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

আইএমইডি বলেছে, প্রকল্প প্রণয়নের সময় ঠিকভাবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং জরিপ করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্টদের বিশ্নেষণ ছাড়াই প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্প শেষ হওয়ার ফলে কী প্রভাব পড়বে তা সুনির্দিষ্টভাবে দলিলে থাকে না। প্রকল্পের আওতায় যেসব যানবাহন, সরঞ্জাম এবং আসবাবপত্র থাকে সেগুলোর ব্যবস্থাপনার কোনো পরিকল্পনা প্রকল্পে থাকে না।

আইএমইডির বিচারে ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে সংশ্নিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে ব্যাপক সমন্বয়হীনতা রয়েছে। দক্ষ জনবলের অভাবও একটি বড় কারণ। যে কারণে প্রকল্পের ব্যয়, সময় ব্যবস্থাপনা ও মান নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। ডিপোজিটরি ওয়ার্ক করার জন্য অন্য সংস্থার ওপর নির্ভর করায় সময় ও ব্যয় বাড়ে। অন্য সমস্যার মধ্যে রয়েছে- পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক না থাকা এবং প্রকল্প এলাকায় প্রকল্প সংক্রান্ত তথ্য দৃশ্যমান না থাকা, এতে প্রকল্প কী মানে বাস্তবায়ন হচ্ছে বা অগ্রগতি কতটা তা বোঝা যায় না। আরেকটি সমস্যা, প্রকল্পের এক্সটার্নাল অডিট নিয়মিত না হওয়া।

রাস্তার ড্রেন না থাকা, ঢাল ঠিকভাবে না বানানোও একটি সমস্যা। এসব কারণে রাস্তায় পানি জমে যায়। এতে সড়ক সংস্কারে ব্যয় বাড়ে, দুর্ঘটনা ঘটে। আইএমইডির চিহ্নিত অন্য সমস্যা হলো- বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থাপন এবং রাস্তা নির্মাণ বা প্রশস্তকরণে সমন্বয়হীনতা, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর প্রতিবেদন দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা না মানা, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগে দেরি করা, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ইনক্লাইন্ড ছাদ নির্মাণ না করা, প্রকল্পের আওতায় পরিকল্পিতভাবে গাছ না লাগানো, প্রকল্প নেওয়ার সময় মাটি, পানি, বায়ু ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ না করা, প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তের অভাব এবং প্রকল্প প্রণয়নে সংশ্নিষ্টদের ধারণাগত দুর্বলতা।

এসব সমস্যা সমাধানে আইএমইডি সমন্বয় বাড়ানো, দক্ষ জনবল নিয়োগ, একটি প্রকল্পের জন্য একজন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগসহ সংশ্নিষ্ট বিষয়ে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণের সুপারিশ করেছে।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, সরকারি নিয়ম-কানুনেই বলা আছে, কোন কাজ কীভাবে করতে হবে। নিয়ম অনুসরণ করা হলে প্রকল্প বাস্তবায়ন যেমন সময়মতো হবে, তেমনি মানসম্পন্ন বাস্তবায়নও নিশ্চিত করা যাবে।

আইএমইডির এক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্প প্রণয়ন-সংক্রান্ত সমস্যা ছাড়াও বাইরের কিছু বিষয় রয়েছে, যা বাস্তবায়নে সমস্যা তৈরি করে। এর মধ্যে দাতাদের অর্থ ছাড় এবং দরপত্র অনুমোদন ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় সম্মতি আদায়ে দেরি হওয়া একটি অন্যতম কারণ।

এ ছাড়া সঠিকভাবে দরপত্র প্রণয়নে অদক্ষতাও একটি সমস্যা। বড় সমস্যা, নিয়োগপ্রাপ্ত ঠিকাদাররা নির্ধারিত সময়ে কাজ করতে চান না। এর পেছনে ব্যয় বাড়ানোর অপকৌশল থাকে। ভূমি অধিগ্রহণ ও অধিগ্রহণ-পরবর্তী মামলাও একটি অন্যতম সমস্যা। তিনি বলেন, এসব সমস্যা সমাধানে এমনভাবে প্রকল্প প্রণয়ন করতে হবে, যাতে প্রকল্প দলিলেই সময়মতো ও মানসম্মতভাবে কাজ শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকে।