কৃষি, শিল্প ও সেবায় ১ কোটি ৬৮ লাখ নারী কর্মরত

নিজস্ব প্রতিবেদক আপডেট: ২০১৮-০৯-০৮ ১৯:৩৫:০৮


বাংলাদেশের অর্থনীতির মূলধারার কর্মক্ষেত্রগুলোতে নারীর অবদান বেড়েই চলেছে। সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী ১ কোটি ৬৮ লাখ নারী কৃষি, শিল্প ও সেবা অর্থনীতির বৃহত্তর এই তিন খাতে কাজ করছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রকাশিত  এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। সমীক্ষা বলছে, দেশের সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ বেড়েছে। বর্তমানে জিডিপিতে নারীর অবদান ২০ শতাংশের কিছুটা বেশি। কিন্তু বাস্তবে প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারীর অবদান স্বীকার করলে এই হার দাঁড়ায় ৪০ শতাংশের উর্ধ্বে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে জানা যায়, অর্থনীতির অন্যতম রপ্তানীমুখী পোষাক খাতে ৫০ লাখ ১৫ হাজার নারী-পুরুষ কাজ করেছেন। তাদের মধ্যে নারী ২২ লাখ ১৭ হাজার।

এছাড়া, কৃষি, হাঁস-মুরগি, মৎস্য খামার, হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তা, আটটি সংশ্লিষ্ট খাতে আউট সোর্সিংসহ যাবতীয় কাজে সম্পৃক্ত নারীরা নীরবে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। বাকিদের মধ্যে কেউ উদ্যোক্তা, কেউ চিকিৎসক, কেউ প্রশাসনে, প্রকৌশলী, কেউ শিক্ষক, কেউ বৈমানিক, কেউ পুলিশ, কেউ সৈনিক হিসেবে বিভিন্ন স্তরে কর্মরত আছেন।

পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে কৃষিতে নিয়োজিত ৯০ লাখ ১১ হাজার নারী। এছাড়া শিল্প ও সেবা খাতে কাজ করেন যথাক্রমে ৪০ লাখ ৯০ হাজার এবং ৩৭ লাখ নারী। দেশের কলকারখানায় পুরুষের চেয়ে এক লাখ বেশি নারী শ্রমিক কাজ করেন।

হিসেব করে দেখা গেছে, বর্তমানে কারখানায় ২১ লাখ ১ হাজার ৮৩০ জন নারী শ্রমিক রয়েছেন আর পুরুষ শ্রমিকের সংখ্যা ১৯ লাখ ৯৫ হাজার ৫৫৭ জন। গত এক যুগে বাংলাদেশে কৃষির নারীকরণ হয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার মতোই দেশের কৃষি খাতের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এখন নারীরা। বিবিএসের তথ্য হলো গত ১০ বছরে কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে ১০৮ শতাংশ। আর পুরুষের অংশগ্রহণ কমেছে দুই শতাংশ।

খাদ্যনীতি বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ২০১৫ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৯০ শতাংশ বাড়িতে মুরগি পালন নিয়ন্ত্রণ করেন নারী। ছাগল ও গরু পালনে নারীদের নিয়ন্ত্রণ ৫৫ শতাংশ।

রপ্তানিমুখী শিল্পে নারী শ্রমিকের চাহিদা ও অংশগ্রহণ সর্বাধিক। তৈরি পোশাক শিল্প, হিমায়িত চিংড়ি, চামড়া, হস্ত শিল্পজাত দ্রব্য, চা ও তামাক শিল্পসহ অন্যান্য পণ্য। মোট রপ্তানি আয়ের ৭৫ ভাগ অর্জনকারী শিল্পের মূল চালিকাশক্তিই হচ্ছে নারী। পোশাকশিল্পের সঙ্গে জড়িত ৪ মিলিয়ন বা ৪০ লাখ কর্মীর মধ্যে ৮০ ভাগই নারী।

সিপিডির প্রতিবেদনে বলা হয়, গৃহস্থালিতে নারীর যে কাজ জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয় না সেই শ্রমের প্রাক্কলিত বার্ষিক মূল্য (২০১৩-১৪ অর্থবছর) জিডিপির ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ। অবশ্য গৃহস্থালি কাজে দেশের নারীরা বছরে ১৬ হাজার ৬৪১ কোটি ঘণ্টা সময় ব্যয় করছেন, যার আর্থিক মূল্যমান দুই লাখ ৪৯ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। জিডিপিতে এই আর্থিক মূল্য যোগ হলে নারীর হিস্যা বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশ। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও পিছিয়ে নেই বাংলাদেশের নারীরা।

ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক সংস্থার হিসেব বলছে, ২০১০ সালের জুনে এ দেশে ক্ষুদ্রঋণের গ্রাহকের সংখ্যা ছিল দুই কোটি ৫২ লাখ ৮০ হাজার। এর ৯০ শতাংশই নারী গ্রাহক।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, দেশের মোট ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের ৩৫ শতাংশই নারী উদ্যোক্তা। ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৮৬০ মিলিয়ন ডলার ৫৭ হাজার ৭২২ জন নারীকে ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। এতে তারা গড়ে তুলেছেন বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ৯৭ থেকে ৯৯ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাই ব্যাংক থেকে জামানতবিহীন ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করেন। এটি একটি বিরাট সাফল্য।

নারী শ্রমশক্তির ৬৮ শতাংশই কৃষি উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত বিভিন্ন কাজের সঙ্গে জড়িত। দেশের কৃষি আর গৃহে নারীরা দৈনন্দিন যে কাজ করে তার অবদান অসামান্য হলে এর স্বীকৃতি নেই।

জিডিপিতেও এই অবদান উল্লেখ করা হয়না। নারীদের এই দুই খাতের অবদানকে স্বীকার করে নিলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে, অর্থনীতিতে নারীর অবদান আরও উচ্চস্থানে যাবে। সেই হিসেবে জিডিপিতে নারীর আর্থিক অবদান ২০% হলেও বাস্তবে এই পরিমাণ আরও বেড়ে যাবে।