চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাবে মন্থর এশিয়ার কারখানা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশ: ২০১৯-০১-০৩ ১২:১০:৫৬


চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাবে গত বছরের শেষ মাসটিতে এশিয়ায় কারখানা কার্যক্রম দুর্বল হতে দেখা গেছে। পাশাপাশি চীনের মন্থর চাহিদা অধিকাংশ অর্থনীতির উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ পরিস্থিতিতে চলতি বছর এশিয়ায় সুদহার বৃদ্ধির গতিতে বিরতির সম্ভাবনা জোরালো হয়ে উঠেছে। খবর বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।

গতকাল এশিয়ার বেশ কয়েকটি অঞ্চলের ডিসেম্বরের পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (পিএমআই) প্রকাশ করা হয়, যেখানে পুরো অঞ্চলের অধিকাংশ ম্যানুফ্যাকচারিং কার্যক্রমে পতন বা মন্থরগতি দেখা গেছে। এর মধ্যে চীনের কাইজিন/মারকিট পিএমআই হ্রাস পেয়ে ১৯ মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো সংকোচন অঞ্চলে নেমে গেছে।

আর চীনের এ দুর্বলতা অন্যান্য এশীয় অর্থনীতিগুলোর ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ডিসেম্বরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম অর্থনীতি মালয়েশিয়ার উৎপাদন কার্যক্রমে ২০১২ সালের পর সবচেয়ে দুর্বল সম্প্রসারণ দেখা গেছে। এছাড়া তাইওয়ানের ক্ষেত্রে উৎপাদন কার্যক্রম ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরের পর সবচেয়ে বেশি সংকুচিত হতে দেখা গেছে।

সিঙ্গাপুরের সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে, নগর রাষ্ট্রটির ম্যানুফ্যাকচারিং খাত প্রান্তিকীয় ভিত্তিতে সংকুচিত হওয়ায় চতুর্থ প্রান্তিকে জিডিপি পূর্বাভাসের তুলনায় অনেক মন্থরগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এশিয়া বাদে অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে ২০১৮ সালের শেষ মাসে ইউরো অঞ্চলে তুলনামূলক স্থিতিশীল ম্যানুফ্যাকচারিং কার্যক্রম আশা করা হচ্ছে। তবে ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের কারখানা কার্যক্রম সামান্য মন্থর হলেও বেশ দৃঢ়ভাবেই সম্প্রসারণ অঞ্চলে রয়েছে। এ পরিসংখ্যান থেকে ধারণা করা যায়, চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতিটি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এ মুহূর্তে এশিয়ার অধিকাংশ অর্থনীতি মন্থরভাবে সম্প্রসারণ হচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতিও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার নিচেই থাকতে দেখা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে এশীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো গত বছরের মতো চলতি বছরেও মুদ্রানীতি কঠোর করার ধারা অব্যাহত না-ও রাখতে পারে।

এএনজেড ব্যাংকের এশিয়া বিষয়ক কৌশলী আইরিন চেং বলেন, চলতি বছর আমরা সত্যি একটি মন্থর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি দেখতে যাচ্ছি। আর এশিয়ার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে রফতানিনির্ভর দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চেং আরো বলেন, এ পরিস্থিতিতে চলতি বছর অধিকাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের নীতি পরিবর্তন করবে না বলেই আমরা আশা করছি।

গত বছর হাজার হাজার কোটি ডলার সমমূল্যের পণ্যের ওপর পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপ বাণিজ্যপ্রবাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করার পর ডিসেম্বরের শুরুতে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি দুটি ৯০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এ সময়ের মধ্যে দুটি দেশই নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাণিজ্যচর্চা ও মেধাস্বত্ব নিয়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল মতবিরোধের মীমাংসা হবে কিনা, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েই গেছে। যদিও সাম্প্রতিক টুইটবার্তাগুলোয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘বড় ধরনের অগ্রগতির’ কথা জানিয়ে এসেছেন।

এদিকে চীনা অর্থনীতির ওপর শুল্কারোপের প্রভাবের পাশাপাশি ঋণ ঝুঁকি হ্রাসে বেইজিংয়ের পদক্ষেপ দেশটির আবাসন বাজারকে শীতল করেছে। এছাড়া এ পদক্ষেপের কারণে বেসরকারি খাতগুলোয় ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। আবার দূষণ রোধে সরকারের কঠোর পদক্ষেপও চীনের শিল্প কার্যক্রমকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

গত মাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক সম্মেলনে চীনের শীর্ষ নেতারা বলেন, কর কর্তন ও যথেষ্ট তারল্য অব্যাহত রাখার মাধ্যমে চলতি বছর অর্থনীতিকে আরো জোরালো সমর্থন দেবেন তারা। পাশাপাশি তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখারও প্রতিশ্রুতি দেন।

চীনের মুদ্রানীতি নিয়ে জেপি মরগান অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা রবার্ট মাইকেল বলেন, শুল্ক প্রভাব হ্রাসে পিপলস ব্যাংক অব চায়নাকে মুদ্রানীতি আরো শিথিল করতে হতে পারে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে, গত বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর সবচেয়ে দুর্বল প্রবৃদ্ধি। এদিকে ডিসেম্বরের বার্ষিক সম্মেলনে সরকারের উপদেষ্টারা চলতি বছরের জন্য ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার কথা জানিয়েছেন।

এদিকে গত বছরের শেষ দিকে ক্রুড তেলের তীব্র দরপতনে এশিয়ার তেল আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোয় কিছুটা চাঙ্গাভাব এসেছে। এসব অর্থনীতির প্রধান দুর্বলতা বাণিজ্য ঘাটতি।

গতকাল প্রকাশিত এশিয়ার দেশগুলোর পিএমআই পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল থাকলেও ডিসেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার পিএমআই সূচক নভেম্বরের ৫০ দশমিক ৪ পয়েন্ট থেকে বেড়ে ৫১ দশমিক ২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, যা চার মাসের সর্বোচ্চ। এ সময় ফিলিপাইনের পিএমআই দাঁড়িয়েছে ৫৩ দশমিক ২ পয়েন্ট। কিন্তু তেল রাজস্বের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল মালয়েশিয়া দুর্বলতম পিএমআইর দেখা পেয়েছে। গত মাসে দেশটির পিএমআই দাঁড়িয়েছে ৪৬ দশমিক ৮ পয়েন্ট।