“কাগুজে সংষ্কার” দিয়ে ব্যবসা পরিচালনার সূচকে উন্নয়ন সম্ভব নয়; বিডা’র চেয়ারম্যান

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশ: ২০১৯-০১-০৪ ১৩:০৩:০৬


কাগুজে সংস্কার দিয়ে ব্যবসা পরিচালনার সূচকে উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে মনে করেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)’র নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী এম আমিনুল ইসলাম। ব্যবসার সূচকে উন্নয়ন করতে হলে এর জন্য প্রয়োজন বাস্তবমূখী সিদ্ধান্ত এবং তার বাস্তবায়ন।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) এবং বিজনেস ইনিশিয়েটিভ ফর লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড) যৌথভাবে আয়োজিত ‘ব্যবসা পরিচালনার সূচকে উন্নয়ন’ বিষয়ে সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত সেমিনারে সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সভাপতি ওসামা তাসী।

কাজী এম আমিনুল ইসলাম বলেন, “কাগুজে সংষ্কার” দিয়ে ব্যবসা পরিচালনার সূচকে উন্নয়ন সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন। তিনি ব্যবসা পরিচালনার সূচকের সাথে সরাসরিভাবে সম্পৃক্ত সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি টাষ্কফোর্স প্রণয়নের প্রস্তাব করেন।

তিনি ব্যবসায়িক কর্মকা- পরিচালনার সুযোগ সুবিধা সারা দেশে ছড়িয়ের দেওয়ার উপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি আরোও বলেন, দূর্নীতির কারণে আমাদের দেশে ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং দূর্নীতির বিষয়ে “জিরো টলারেন্স” মনোভাবের বাস্তবায়ন না হলে, ব্যবসা পরিচালনার সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আশা করা সম্ভব নয়। বিডা’র চেয়ারম্যান সরকারের নিকট ব্যবসা পরিচালনা বিষয়ক নীতিমালার সংষ্কারের প্রস্তাব আরোও বেশি হারে উপস্থাপনের জন্য দেশের বেসরকারীখাতের প্রতি আহবান জানান।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ মফিজুল ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে “ব্যবসা পরিচালনার সূচক”-এ ভারত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করেছে এবং ভারতের অভিজ্ঞতা আমাদের দেশের ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার সাথে সমন্বয় রেখে নিবীড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং সামনের দিনগুলোতে এ ধরার অব্যাহত থাকবে।

স্বাগত বক্তব্যে বিল্ড-এর চেয়ারম্যান মাহবুবুল আলম বলেন, বাংলাদেশে একটি ব্যবসা-বাণিজ্য সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে বিল্ড প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে এবং ইতোমধ্যে এ লক্ষ্যে বিল্ডের পক্ষ হতে নীতিমালা সংষ্কার বিষয়ে ১৯৭টি সুপরিশ উপস্থাপন করা হয়েছে, যার মধ্যে ২০১৮ সালে ৬৩টি সুপারিশ সরকার গ্রহণ করে সেগুলো সংষ্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, ব্যবসা পরিচালনার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নয়নে সকলের সমন্বিত উদ্যোগ একান্ত আবশ্যক।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি ওসামা তাসীর বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যবসা পরিচালনার সূচকে উল্লেখ্যযোগ্য অগ্রগতি লাভ করতে পারেনি উল্টো ১ ধাপিয়ে পিছিয়ে ১৭৬তম স্থানে রয়েছে। তিনি এ অবস্থার উত্তোরণের লক্ষ্যে সরকার প্রণীত সকল নীতিমালাসমূহের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, আর্থিক কাঠামোর সংষ্কার, কর হার কমানো এবং কর বিষয়ক নীতিমালার সংষ্কার, অবকাঠামো খাতের দ্রুত উন্নয়ন, মেগা প্রকল্প সমূহের কর্মকা- নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা প্রভৃতি বিষয় একান্ত অপরিহার্য বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। ডিসিসিআই’র সভাপতি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, দেশে ব্যবসা বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নয়নে বিডা গৃহীত “ওয়ান স্টপ সার্ভিস” প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, তাই অতি দ্রুত এ সার্ভিস চালু করার জন্য বিডার প্রতি তিনি আহবান জানান।

অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সিনিয়র প্রাইভেট সেক্টর স্পেশালিষ্ট শিহাব আনসারী আজহার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, ব্যবসা পরিচালনার সূচক অনুযায়ী ২০১৪ সালে ভারতের অবস্থান ছিল ১৪২, তবে প্রয়োজনীয় নীতিমালা সংষ্কারের মাধ্যমে ২০১৮ সালে ভারত ৭৭তম স্থানে ওঠে এসেছে এবং এ জন্য ভারতীয় সরকার আলোচ্য সময়ে প্রায় ৭,৭৫৮টি নীতিমালার সংষ্কার করেছে। তিনি এ জন্য সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একাগ্রতা, সরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের সক্ষমতা বাড়ানো, দক্ষ মানব সম্পদ তৈরি, সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডাদের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো ও অনলাইন সেবা চালু, জনগনের মাঝে সচেতনতা বাড়ানো প্রভৃতি বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক বলে উল্লেখ করেন।

নির্ধারিত আলোচনায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব তপন কান্তি ঘোষ ও মোঃ ওবায়দুল আজম এবং ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি ওয়াকার আহমেদ চৌধুরী অংশগ্রহণ করেন। তপন কান্তি ঘোষ জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৮টি দেশ সহ নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড এবং তুরষ্কে বাংলাদেশী পণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান সমূহের জন্য ইপিবি’র অধীনে ১লা জানুয়ারি, ২০১৯ হতে “স্টেটমেন্ট অব ওরিজিন” নামে একটি কার্যক্রম চালু করা হয়েছে এবং এ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানসমূহ ইপিবিতে রেজিস্ট্রেশন করলে মোট ৩১টি দেশে অতি সহজেই পণ্য রপ্তানি করতে পারবে। তিনি আরোও জানান, বর্তমানে কোন প্রতিষ্ঠানের আমদানি-রপ্তানির সনদ পেতে হলে প্রায় ১৩ থেকে ১৪টি প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট প্রদান করতে হয় এবং ব্যবসা পরিচালনার সহজতর করার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট ৭টিতে নামিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, পাশাপাশি রেজিস্ট্রেশন ফি কমানোর জন্যও মন্ত্রণালয় কাজ করছে। মোঃ ওবায়দুল আজম আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, অতিদ্রুত কোম্পানী আইন জাতীয় সংসদে পাশের মাধ্যমে আইনে পরিণত হবে, যার মাধ্যমে দেশের ব্যবসায়ী সমাজ ব্যবসায়িক কর্মকা- পরিচালনায় হয়রানি হতে মুক্তি পাবে এবং ব্যয় হ্রাস পাবে। তিনি দেশে ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নের জন্য বেসরকারীখাতের সকল প্রতিনিধিবৃন্দকে একযোগ কাজ করার আহবান জানান। ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি ওয়াকার আহমেদ চৌধুরী বেসরকারীখাতে ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধি এবং খেলাপী ঋণ কমানোর বিষয়ে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহবান জানান।