মাছ ধরতে সেচযন্ত্র দিয়ে শুকানো হচ্ছে  বিল

সান বিডি ডেস্ক প্রকাশ: ২০১৯-০৩-০৯ ১৪:৪১:৪৬


সুনামগঞ্জ জেলার বিলগুলোতে মৎস্য আহরণের চলতি  মৌসুমে ২০ একরের নিচের জলমহালগুলোয় সেচযন্ত্রের মাধ্যমে পানি শুকিয়ে ফেলা হচ্ছে। বেশি মাছ ধরার লোভে ছোট জলমহালগুলো শুকিয়ে ফেলছেন সংশ্লিষ্ট ইজারাদাররা। এতে একদিকে  যেমন ফাল্গুন মাসেই ফেটে চৌচির হচ্ছে হাওরের ফসলি জমি। অন্যদিকে প্রজনন ব্যাহত হওয়ায় বিলুপ্ত হচ্ছে অনেক সুস্বাদু প্রজাতির মাছ।

মৎস্য অফিস, উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে এ বিষয়ে অভিযোগ করা হলেও জলমহাল শুকানোর বিরুদ্ধে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। স্থানীয় কৃষক ও পরিবেশকর্মীরা বিল শুকিয়ে মাছ ধরার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালানোর দাবি জানালেও রহস্যজনক কারণে তা করা হচ্ছে না। উল্টো বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় কৃষক ও পরিবেশ সংগঠন সোচ্চার হলেও প্রশাসনের যোগসাজশে ইজারাদাররা তাদের সাজানো মামলা দিয়ে হয়রানি করেন। ফলে হাওরে পরিবেশ ও প্রকৃতিবিনাশী ওই কার্যক্রম চলছেই।

জানা গেছে, দোয়ারাবাজার উপজেলার সিঙ্গির দাইর, সদর উপজেলার নলদিঘা বান্দেরকোনা গ্রুপ জলমহাল, দক্ষিণ সুনামগঞ্জে বাইঞ্চাখাউড়ি গজারিয়া জলমহাল এবং একই উপজেলার বগলার ডুবি জলমহালে শ্যালো মেশিন দিয়ে শুকিয়ে মাছ ধরেছেন ইজারাদাররা। এ নিয়ে এলাকাবাসী সংশ্লিষ্ট ইউএনও কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ করেছিল। কিন্তু অভিযোগকারী পরিবেশকর্মী ও কৃষকদের নামে উল্টো হয়রানিমূলক মামলা দিয়েছেন ইজারাদাররা।

জানা গেছে, প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সহায়তায় সম্প্রতি ইজারাদারের লোকজন অভিনব এক কৌশল বের করেছে। তারা কিছু লোক ভাড়া করে তাদের কৃষক সাজিয়ে জমিতে সেচ দেওয়ার নাটকের আয়োজন করে প্রশাসনকে বিভ্রান্ত করছে। কয়েকটি ঘটনায় স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে একই স্থানে একাধিক শ্যালো মেশিন দিয়ে বিল শুকানোর প্রমাণ পেয়ে প্রতিবেদন দিলেও রহস্যজনক কারণে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কৃষকরা বলছে, সুনামগঞ্জের হাওরে বোরো জমিতে আগে কখনো শ্যালো মেশিনে পানি সেচ দিতে হতো না।

গত জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে জলমহাল শুকাতে বাধাও দিয়েছিল আশপাশের জমির কৃষকরা। পরে তাদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দিয়েছেন ইজারাদার। এতে কাউয়াজুরী গ্রামের ১৪ কৃষক এখন আতঙ্কে আছে।

মৎস্য গবেষক প্রফেসর ড. মোস্তফা আলী রেজা বলেন, নির্বিচারে জলমহাল শুকিয়ে মৎস্য আহরণ করায় মাছের সঙ্গে জলজ উদ্ভিদ মাখনা ও সিংরা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কই, সিং মাছের উৎপাদন আগের তুলনায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। মৎস্য আহরণের সময় বিলে সর্বনিম্ন এক সেন্টিমিটার পানি থাকার কথা থাকলেও ইজারাদার তা মানছেন না, যার ফলে মিঠাপানির মাছ এখন হুমকির সম্মুখীন।

ইজারার নীতিমালায় জলমহালের পানি শুকিয়ে মাছ ধরার নিয়ম তো নেই-ই; বরং জলমহাল খনন এবং পারে বৃক্ষ রোপণ করার শর্ত আছে। কিন্তু ওই সব শর্ত কেউ মানে না।

বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জালধরা, চট্টনিয়া বিল, শিমুলতলার খাল, গলাভাঙ্গা-গুল বিল, শ্বাসকার বিল, চাপলার বিল, কেউডির বিল, ইঙ্গার বিল, মুক্তির বিল, ছোট কানিয়া, শৈলচাপড়ার বিল, বন্নির বিল, জয়াধনা, বুয়ালা, নাননা দশপাশার বিল, মেধা-১, মেধা-২, লম্বার দাইড়, মুক্তির দাইড়, কালা গাঙ, কাইলানী, কৈজুড়া বিল, সাপ মাড়ির দাইড়, বাছা পানি বিল, শাপলানীর বিল, বুড়ার বিল, হুচ্ছুর বিল, কাইঞ্জার বিল, আড়িবন বিল, উড়ার বিল ও ফাঁসুয়ার জিনাইরিয়া বিলসহ উপজেলার বেশির ভাগ জলমহালই শ্যালো মেশিন দিয়ে শুকিয়ে মাছ ধরে নিয়ে গেছে ইজারাদারের লোকজন।’

জালধরা জলমহাল শুকিয়ে মাছ ধরার অভিযোগে এরই মধ্যে তিন ইজারাদারের কাছ থেকে ১২ হাজার টাকা জরিমানা আদায়সহ দুটি শ্যালো মেশিন জব্দ করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আবু তালেব।

২০ একরের নিচের জলমহালগুলো ইজারা দিয়ে থাকে উপজেলা প্রশাসন। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলায় ওই রকম ছোট জলমহাল আছে ৬২৫টি। এগুলো বেশির ভাগই তিন বছর মেয়াদে ইজারা দেওয়া হয়ে থাকে।