আসন্ন বাজেটে সিএসইর ৯ প্রস্তাবনা

পুঁজিবাজার ডেস্ক আপডেট: ২০১৯-০৪-০২ ১৩:৩৫:০৪


চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড আসন্ন জাতীয় বাজেট ২০১৯-২০ এ অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে ৯টি প্রস্তাবনা প্রদান করেছে।

সিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সিএসইর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে,  বিগত বছর গুলোতে দেশের পুঁজিবাজারে ব্যাপক কাঠামোগত এবং আইনী সংস্কার সাধিত হয়েছে। দেশের বিকাশমান অর্থনৈতিক অগ্রযাথায় পুঁজিবাজারের অংশগ্রহণ এবং ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ। চলমান অর্থনৈতিক উন্নয়নে পুঁজিবাজারের ভূমিকা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন সঠিক কৌশল নির্ধারণ । বর্তমানে দেশে লক্ষাধিক কোম্পানি নিবন্ধিত রয়েছে। তার মধ্যে মধ্যম এবং বৃহদায়তনের কমপক্ষে কয়েক হাজার কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার সুযোগ আছে। অথচ শুধুমাত্র কয়েকশ কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আছে যা একান্তই নগন্য । বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর করার যে রূপকল্প সরকারের রয়েছে তাতে ব্যাপক ভাবে বেসরকারী পুঁজি সঞ্চালনের প্রয়োজন। আর এ লক্ষ্য পূরণের জন্য পুঁজিবাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। শুধুমাত্র ব্যাংক নির্ভর বেসরকারী বিনিয়োগগ এবং পুঁজি সঞ্চালন একদিকে যেমন ব্যাংক ব্যবস্থার দূর্বলতা তৈরি করে অন্যদিকে পুঁজিবাজারের বিকাশেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এ প্রেক্ষিতে পুঁজিবাজারে টেকসই উন্নয়ন এবং গুণগত সম্প্রসারণের জন্য ব্যাপক কৌশল প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড আসন্ন জাতীয় বাজেট ২০১৯-২০ এ অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে নিম্নেক্ত প্রস্তাবনা পেশ করছেঃ

১. কর্পোরেট করহার পুনর্বিন্যাসঃ

প্রস্তাবঃ তালিকাভুক্ত কোম্পানীসমূহের বিদ্যমান কর হার ২৫% থেকে কমিয়ে ২০% করা।

প্রস্তাবের স্বপক্ষে যুক্তিঃ তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যকার কর হার বৃদ্ধির মাধ্যমে ভাল কোম্পানি সমূহ পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হবে। যা পুঁজিবাজারকে সমৃদ্ধ করবে এবং স্বচ্ছ কর্পোরেট রিপোর্টিং এর মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ও বৃদ্ধি পাবে।

২. নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানি সমূহের কর অব্যহতিঃ

প্রস্তাবঃ নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানি সমূহের আয় তিন বছর করমুক্ত রাখা।

প্রস্তাবের স্বপক্ষে যুক্তিঃ কোম্পানি সমূহ অনেক বিধি বিধান প্রতিপালন করে তালিকাভুক্ত হয়। কর মুক্তির কারণে অতালিকাভুক্ত কোম্পানিসমূহ তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহিত হবে। এতে পুঁজিবাজারে গুণগত মানসম্পন্ন শেয়ারের যােগান বাড়বে যা বাজারে লেনদেন বৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা আনয়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।

৩. SME কোম্পানি সমুহের জন্য নতুন কর হারঃ

প্রস্তাবঃ পুঁজিবাজারে তালিকা ভুক্তি উৎসাহিত করার লক্ষ্যে SME কোম্পানি সমূহের জন্য

নিমোক্ত রেয়াতি হারে কর হার নির্ধারণ করাঃ

প্রথম তিন বছর – ০%। পরবর্তী বছর সমূহ – ১০%

প্রস্তাবের স্বপক্ষে যুক্তিঃ সাধারণত স্বল্প মূলধনী কোম্পানিসমূহ প্রাইভেট লিমিটেড হিসেবে নিবন্ধিত হয়। এ সকল প্রতিষ্ঠানের কর্পোরেট কাঠামাে দূর্বল হওয়ার কারণে সরকারের তেমন কোন রাজস্ব আদায় হয়না। পুঁজিবাজারের SME বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী তালিকাভুক্ত হলে অধিক সংখ্যক কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড থেকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হবে এবং একটি মানসম্মত কর্পোরেট কাঠামো এবং রির্পোটিং এ অভ্যস্ত হবে যা থেকে সরকারের প্রত্যক্ষ করের পাশাপাশি পরোক্ষ কর ও বৃদ্ধি পাবে। একই সাথে স্টক একচেঞ্জ গুলো কর্তৃক নতুন প্রর্বতিত SME বোর্ড বাস্তবায়ন করা সহজতর হবে।

৪.০ লভ্যাংশের উপর আয়কর

৪.১ করমুক্ত লভ্যাংশের সীমাঃ

প্রস্তাবঃ করমুক্ত লভ্যাংশের সীমা ২৫,০০০ টাকা থেকে ১,০০,০০০ টাকা করা।

প্রস্তাব এর স্বপক্ষে যুক্তিঃ পুঁজি বাজারকে গতিশীল এবং আকর্ষনীয় করার লক্ষ্যে এ প্রস্তাব গুরুত্তপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে পারে।

৪.২ কোম্পানী করদাতা কর্তৃক অপর তালিকাভুক্ত কোম্পানী থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ আয়ের উপর কর মওকুফঃ

প্রস্তাবঃ লিমিটেড কোম্পানী কর্তৃক কোন তালিকাভুক্ত কোম্পানী থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ কর মুক্ত

রাখা।

প্রস্তাব এর স্বপক্ষে যুক্তিঃ লভ্যাংশের উপর কর আরোপ মূলত একটি দ্বৈত কর। কারন কোম্পানি কর পরবর্তী মুনাফা থেকেই লভ্যাংশ প্রদান করে থাকে। উক্ত প্রস্তাব একটি শক্তিশালী পুঁজি বাজার গঠনে সহায়তা করবে।

৫. তালিকাভুক্ত। অতালিকাভুক্ত বন্ডের সুদ আয়ের উপর কর অব্যহতিঃ

প্রস্তাবঃ জিরো কুপন বন্ড সহ সকল প্রকার তালিকাভুক্ত এবং অতালিকাভুক্ত বন্ডের সুদের উপর করদাতা নির্বিশেষে কর অব্যহতি প্রদান।

প্রস্তাব এর স্বপক্ষে যুক্তিঃ বর্তমানে শুধুমাত্র জিরো কুপন বন্ড থেকে প্রাপ্ত আয় ব্যাংক, ইনস্যুরেন্স এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যাতিরেকে করমুক্ত। দেশের অর্থনীতির আকার এবং ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতার প্রেক্ষিতে একটি শক্তিশালী বন্ড মার্কেট তৈরি করা অতি জরুরী। এই পদক্ষেপ পুঁজিবাজারের পাশাপাশি আর্থিক খাতেও শৃঙ্খলা আনয়ন করতে পারে। সে কারণে নতুন ভাবে একটি বন্ড মার্কেট তৈরি করার লক্ষ্যে সকল প্রকার বন্ড থেকে প্রাপ্ত আয় কে কর মুক্ত করা প্রয়োজন এবংজিরো কুপন বন্ড থেকে প্রাপ্ত আয়ের করমুক্ত সুবিধা ব্যাংক, ইনস্যুরেন্স ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সহ সকল করদাতাকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

৬. বন্ড লেনদেনের উপর কর প্রত্যাহারঃ

প্রস্তাবঃ পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সকল বন্ড লেনদেনের উপর কর প্রত্যাহার করা।

প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তিঃ বর্তমানে সিকিউরিটিজ লেনদেনের উপর ০.০৫% হারে উৎসে আয়কর আরোপ করা হয়। ২০১৩ সালের অর্থ আইন অনুযায়ী ৫৩ বিবিবি ধারা থেকে বণ্ড শব্দটি ডিলিট করা হয়। কিন্তু অন্যান্য আইনে সিকিউরিটিজ এর সংজ্ঞায় বন্ড অর্ন্তভুক্ত থাকায় বন্ড লেনদেনেও উক্ত কর প্রযোজ্য হবে কিনা এই ব্যাপারে অস্পষ্টতা থেকে যায়। একটি শক্তিশালী এবং পৃথক বন্ড মার্কেট গঠনের লক্ষ্যে স্পষ্টভাবে উক্ত ধারা থেকে বন্ড লেনদেনকে অব্যহতি রাখা প্রয়োজন।

৭, অন্টারনেট ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) এ তালিকাভুক্ত কোম্পানিসমুহের কর সুবিধাঃ

প্রস্তাবঃ অল্টারনেট ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) -এ তালিকাভুক্ত কোম্পানিসমূহকে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ন্যায় সুবিধা প্রদান করা।

প্রস্তাব এর স্বপক্ষে যুক্তিঃ বর্তমানে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন অল্টারনেট ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি)- এর মাধ্যমে কোম্পানি সমূহের তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা করছে। এ.টি.বি চালু হলে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিসমূহ (যারা মূল মার্কেটে তালিকাভুক্ত নয় বা আইপিওর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করে নাই) উক্ত বোর্ডে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। এই সুবিধা দিলে অল্টারনেট ট্রেডিং বোর্ড জনপ্রিয়তা পাবে এবং ধীরে ধীরে কর্পোরেট রির্পোটিং এবং গর্ভনেন্স বাড়তে থাকবে।

৮. চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকে কর অব্যহতির সুবিধাঃ

প্রস্তাবঃ কৌশলগত বিনিয়োগকারীর নিকট শেয়ার বিক্রয়ের জন্য চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকে (সিএসই) কর অব্যহতির সুবিধা দেয়া।

প্রস্তাবের স্বপক্ষে যুক্তিঃ বর্তমানে সিএসই ক্রমহ্রাসমান হারে আয়কর প্রদান করে। যা এই অর্থবছরে শেষ হবে। এক্সচেঞ্জ ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন আইন ২০১৩ এর বিধান অনুযায়ী মার্কেট ইস্যুকৃত শেয়ারের শতকরা পঁচিশ ভাগ কৌশলগত বিনিয়োগকারীর নিকট বিক্রয় করতে হবে। সিএসই এখনো আইন অনুযায়ী কৌশলগত বিনিয়োকারী নির্ধারণ করতে পারেনাই। প্রস্তাবিত কর সুবিধা দ্রুত ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন আইন অনুযায়ী কৌশলগত বিনিয়ােগকারী পেতে সহায়ক হবে এবং একই সাথে তুলনামূলক ঠোট এক্সচেঞ্জ হিসেবে দেশের পুঁজিবাজারে যথাযথ ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে।

৯. টক এক্সচেঞ্জ সদস্যদের উপর উৎসে কর কর্তনের কর হাস

প্রস্তাবঃ ষ্টক এক্সচেঞ্জের সদস্যদের নিকট থেকে উৎসে আয়কর কর্তনের হার বিদ্যমান ০.০৫% থেকে পূর্ববর্তী ০.০১৫% এ পুনঃ নির্ধারন করা।

প্রস্তাবের স্বপক্ষে যুক্তিঃ স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্যগণ/ ট্রেকহােল্ডারগণ ব্রোকারেজ ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে লেনদেন সম্পাদনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিও একাউন্ট ও মার্জিন একাউন্ট পরিচালনা করে থাকেন, যা ব্রোকারেজ ব্যবসা পরিচালনার জন্য আবশ্যকীয়। কিন্তু, স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্যদের নিকট থেকে আয়কর অধ্যাদেশের ৫৩ বিবিবি ধারা অনুসারে উৎসে কর্তিত করকে ধারা ৮২ সি অনুসারে চূড়ান্ত করদায় হিসেবে গণ্য করার বিধান থাকলে ও তা কার্যকর করা কঠিন। অপরদিকে

ব্রোকারেজ হাউজগুলো লোকসান অন্যান্য আয়ের সাথে সমন্বয় (Set off) কিংবা পরবর্তী করবর্ষ সমূহে Carry forward করতে দেওয়া হয় না। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ব্রোকারেজ হাউজগুলোর কার্যকর করহার (Effective Tax Rate) প্রচলিত কর্পোরেট কর হারের চেয়েও অধিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপরন্তু, লােকসানের সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে উচ্চহারে আয়কর পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা আয়করের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্যদের লেনদেনের উপর উৎসে করের হার ২০০৮-০৯ সালে বিদ্যমান হার অর্থাৎ ০.০১৫%-এ নির্ধারণ করা সমিচীন ও যুক্তিযুক্ত।

সান বিডি/এসকেএস