দেশের এক কোটি ৯০ লাখ শিশু জলবায়ু ঝুঁকিতে

সান বিডি ডেস্ক প্রকাশ: ২০১৯-০৪-০৬ ১২:৩৭:৩৪


বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভয়াবহ বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি ৯০ লাখ শিশু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আনুপাতিক হিসাবে দেশের প্রায় প্রতি তিনটি শিশুর মধ্যে একটি এই ঝুঁকির মধ্যে আছে। এই ঝুঁকি শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি তাদের বাস্তুচ্যুতি, চরম দারিদ্র্য, পুষ্টিহীনতা, শহরগুলোতে করুণ অভিবাসন, বলপূর্বক শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে ও যৌন বাণিজ্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

জাতিসংঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফ ‘ঝাঁকবাঁধা ঘূর্ণিঝড় : বাংলাদেশের শিশুদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঢেকে দিচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এই ঝুঁকির তথ্য তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে এই ঝুঁকি দূর করতে প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশ উঠে এসেছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের ভূমির সমতল বিন্যাস, ঘনবসতি ও দুর্বল অবকাঠামো শিশুদের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিকে একেবারেই বাড়িয়ে তুলছে। এই হুমকি বেশি অনুভূত হয় দেশের উত্তরাঞ্চলীয় বন্যা ও খরাপ্রবণ নিচু এলাকায় এবং বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় এলাকায়।

ঝুঁকির মধ্যে থাকা শিশুদের মধ্যে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ শিশু বসবাস করে প্রলয়ংকরী নদীমাতৃক ব্যবস্থার মধ্যে, যা বাংলাদেশজুড়েই বয়ে চলেছে। আর নিয়মিতভাবেই এই নদীগুলোর দুই কূল উপচে পড়ে বন্যার সৃষ্টি হয়।

প্রতিবেদনটির লেখক ইনগ্রাম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বিপদটা হচ্ছে, প্রতিবছরই তা ঘটছে এবং বন্যার কারণে তা চরম আকার ধারণ করে। বাংলাদেশে সর্বশেষ বড় বন্যায় প্লাবিত হয় ২০১৭ সালে। ধারাবাহিকভাবে সংঘটিত এ বন্যায় ৮০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।’  লেখকের মতে, ব্রহ্মপুত্র নদের বড় বড় বন্যায় কমপক্ষে ৪৮০টি কমিউনিটি স্বাস্থ্য ক্লিনিক প্লাবিত হয় এবং প্রায় ৫০ হাজার নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অথচ সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগোষ্ঠীগুলোর প্রধান এবং একমাত্র পানীয় জলের উৎস এই নলকূপগুলো। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে নানা ধরনের প্রভাব ফেলে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বন্যার ঝুঁকির বাইরে দেশের উপকূলীয় এলাকায় আরো ৪৫ লাখ শিশু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, যাদের শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলা করতে হয়।

এই শিশুদের বাইরে বাংলাদেশে ঝুঁকির মুখে থাকা শিশুদের তালিকায় যোগ হয়েছে রোহিঙ্গা শিশু। ইউনিসেফের মতে, ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে রোহিঙ্গা ঢলের কারণে তাদের প্রায় পাঁচ লাখ শিশু এখন বাঁশ ও প্লাস্টিক নির্মিত ছাউনির মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে বেড়ে উঠছে।

প্রতিবেদন মতে, বন্যায় এক কোটি ২০ লাখ, উপকূলীয় এলাকায় ৪৫ লাখ, রোহিঙ্গা শিবিরে পাঁচ লাখ শিশু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর বাইরে দেশের ভেতরে আরো ৩০ লাখ কৃষি পরিবারের খরার কারণে  নানা দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে বড় হচ্ছে।

ইউনিসেফের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ভূগর্ভস্থ পানিতে লাগামহীনভাবে লবণাক্ততা বাড়তে থাকায় দেশের অনাগত শিশুদেরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। কারণ পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়া গর্ভবতী নারীর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। এর ফলে গর্ভবতী নারীরা প্রিক্লেমশিয়া ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি মোকাবেলা করে। উপকূলীয় এলাকায় এ পরিস্থিতি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব বিপর্যয়ের অন্যতম বড় পরিণতি হলো, বিপর্যস্ত পরিবারগুলোকে বাস্তুচ্যুত করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোর দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু শহরগুলোতে আরো করুণ পরিস্থিতি অপেক্ষা করে শিশুদের জন্য। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকার কারণে নিয়মিতভাবে তারা অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।

যে সব শিশু শহরে আসে তারা এক ভয়ংকর অবস্থার মধ্যে পতিত হয়। ইনগ্রাম এই পরিস্থিতিকে ‘বর্বর পরিবেশ’ উল্লেখ করে বলেন, শহরে এসে শিশুরা নানা ধরনের শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়। কন্যাশিশুগুলো বাল্যবিয়ের শিকার হয়। কারণ দরিদ্র পরিবারগুলোর পক্ষে বেশি দিন মেয়ে শিশুগুলোকে দেখে রাখা সম্ভব হয় না। এ ছাড়া আরো অনেক কন্যাশিশুকে দেশের ক্রমবর্ধমান যৌন বাণিজ্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

এর মধ্যেই উপকূলীয় এলাকায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে জনসচেতনতাও গড়ে উঠছে। ইনগ্রাম বলেন, ‘আমরা অবাক হয়ে দেখি, এই পৃথিবীতে তারা কিভাবে টিকে থাকে এবং এখনো সমাজকে একত্রিতভাবে টেনে নেওয়ার প্রবণতা বিদ্যমান।’

সুপারিশ : ইউনিসেফের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য হুমকি থেকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ দূর করতে বাংলাদেশ সরকার অনেক কিছু করেছে। এর মধ্যে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ অন্যতম। কিন্তু এর পরও সরকারের আরো কিছু করার আছে।

ইউনিসেফের মতে, এই পরিস্থিতিতে সরকারকে জলাবায়ুঝুঁকির মধ্যে থাকা এই শিশুদের সুনির্দিষ্ট প্রয়োজনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এর মধ্যে খাদ্য স্বল্পতা, বন্যার কারণে শহরগুলোতে অভ্যন্তরীণ অভিবাসন এবং খরা প্রবণতার কারণে বসবাস অযোগ্য এলাকার দিকে নজর দিতে হবে। এ প্রসঙ্গে ইনগ্রাম বলেন, বন্যাপ্রবণ এলাকায় স্কুল ও স্বাস্থ্যসুবিধাকে আরো টেকসই করে গড়ে তোলা, ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের শিশুশ্রম ও যৌন নির্যাতন থেকে রক্ষায় অধিক শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রচলন করতে হবে।

বাংলাদেশ সরকারের বন, পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নুরুল কাদির বার্তা সংস্থা থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনকে বলেন, ‘এই প্রতিবেদনে যেসব বিষয় উঠে এসেছে, সেগুলোর ব্যাপারে সরকার এরই মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আমরা এখন শিশুদের জলবায়ু সচেতন করতে এবং কিভাবে এর মোকাবেলা করা যায় তা জানাতে দেশের স্কুলগুলোতে যাচ্ছি।’ সূত্র : ইউনিসেফ ওয়েবসাইট ও রয়টার্স।