মুজাহিদকে হত্যা বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে যাবে জানা নেই: ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক

প্রকাশ: ২০১৫-১১-২৩ ২১:১২:২৯ আপডেট: ২০১৫-১১-২৩ ২১:১৪:২৫

janaja-london-mojaheedজামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তার প্রধান আইনজীবী ও দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক।

মুজাহিদকে ফাঁসির ঘটনায় দেশের ভবিষ্যত নিয়েও শঙ্কা জানিয়েছেন ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। তিনি বলছেন, “এ হত্যার ঘটনা বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে যাবে তা আমাদের জানা নেই”।

মুজাহিদের ফাঁসির সঙ্গে জড়িত সকলের উদ্দেশে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে এ জামায়াত নেতা বলেছেন, “ইতিহাসের চাকা ঘুরে যায়। সব কিছু পার পেয়ে যাবেন, এটি মনে করবেন না। আমরা এই হত্যার প্রতিবাদ জানাচ্ছি, এর পরিনতি সবাইকে বহন করতে হবে।”

যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে আয়োজিত মুজাহিদের গায়েবানা জানাজার নামাজ শেষে অনুষ্ঠিত এক প্রতিবাদ সভায় এ কথা বলেন ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক।

রবিবার বাদ জোহর পুর্ব লন্ডনের আলতাব আলী পার্কে এ জানাজা ও প্রতিবাদ সভা করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংগঠন ‘সেভ বাংলাদেশ ইউকে’। বাঙালি কমিউনিটির বিভিন্নস্তরের মানুষ উপস্থিতিতে গায়েবানা জানাযায় ইমামতি করেন শায়েখ মওদুদ হাসান।

সেভ বাংলাদেশ ইউকে’র চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে ও সাবেক ছাত্রনেতা বদরে আলম দিদারের পরিচালনায় প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম এ মালেক, জমিয়তে উলামা ইউরোপের সভাপতি মুফতি শাহ সদরুদ্দিন ও জামায়েতের ইউরোপের মূখপাত্র ও সেভ বাংলাদেশ ইউকের কোঅর্ডিনেটর ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লা প্রমূখ।

সভায় ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক বলেন, “সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ছিলেন একজন সৎ ও নির্লোভ মানুষ। আমি ছাত্রজীবন থেকেই তার সাথে ঘনিষ্ট ছিলাম। তিনি মানবতাবিরোধী কোনো অপরাধে জড়িত থাকতে পারেন না।”

মুজাহিদ ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন উল্লেখ করে আবদুর রাজ্জাক বলেন, “একজন আইনজীবি হিসেবে আমি বলতে চাই নিরপেক্ষ বিচার হলে মানবতাবিরোধী অপরাধে কারোরই ফাঁসি হতো না। যে চারজনকে (আবদুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী) হত্যা করা হয়েছে তাদের আইনজীবী হয়ে লড়েছি। বিশ্বাস করুন সঠিক বিচার হলে তারা সকলেই মুক্তি পেতেন।”

মুজাহিদের ফাঁসি পরবর্তী সময়কে ‘কঠিন’ আখ্যা দিয়ে সবাইকে ধৈর্য্য ধরে মুজাহিদ ও তার শোক সন্তপ্ত পরিবারের জন্য দোয়া আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধের বিচার সম্পর্কে বলতে গিয়ে আবদুর রাজ্জাক বলেন, “আমরা আজ অত্যান্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়েছি। আজকে বাংলাদেশের জন্য একটি কালো দিন। বিশ্বের বিচারিক ইতিহাসে একটি কালো দিন।”

তিনি বলেন, “যুদ্ধপরাধীদের বিচার নতুন কিছু নয়। বিশ্বে বহুদেশে হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর ন্যুরেমবাগে হয়েছে। রুয়ান্ডায় হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে একটি জিনিস স্পষ্ট, বিশ্বের সকল সভ্য সমাজ বলছে আমরা বিচার চাই, এর পাশপাশি তারা বলছে এই যে বিচার হচ্ছে এটি বিচারের নামে অবিচার। অ্যামেনিস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ইউকে বার অ্যাসোসিয়েশন, ইন্টারন্যাশনাল বার অ্যাসোসিয়েশন, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা সবাই এক বাক্যে বলেছে এই বিচার বন্ধ করে স্বচ্ছ বিচার করুন।”

তিনি বলেন, “দুনিয়ার ইতিহাসে এমন বিচার কোথাও দেখিনি। সারা দুনিয়ার মানুষ বলছে এটি বিচারে নামে অবিচার হচ্ছে। তারপরেও জিদ করে বিচার হচ্ছে। এটি যে বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে যাবে তা আমাদের জানা নেই।”

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের সঙ্গে সম্পৃক্তদের উদ্দেশ্য করে জামায়াত নেতা আবদুর রাজ্জাক বলেন, “ইতিহাসের চাকা ঘুরে। সব কিছু পার পাবেন, এটি মনে করবেন না। আমরা এই হত্যার প্রতিবাদ জানাচ্ছি, এর পরিনতি সমস্ত জাতিকে বহন করতে হবে।”

ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের অভিযোগ, মুজাহিদ সাহেব ও সালাউদ্দিন সাহেব রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমার আবেদন নয় বরং তারা রাষ্ট্রপতির কাছে বিচারের অনিয়ম তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। আজ মিডিয়ার মাধ্যমে মিথ্যাচার করা হচ্ছে।

সভাপতির বক্তব্যে ব্যারিস্টার নজরুল ইসলাম বলেন, “রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়েছেন বলে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মুজাহিদের সঙ্গে তামাশা করা হয়েছে। সাবেক মন্ত্রী মুজাহিদের বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ আনা হয়েছে, তা রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে পারেনি। তাকে ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন।”

ব্যারিস্টার নজরুল ইসলাম বলেন, “এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনের অকুতোভয় কর্মীদের একবিন্দু পরিমাণ বিচলিত করতে পারবে না স্বৈরাচারী সরকার। শহীদ মুজাহিদের রক্ত বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনকে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিবে ইনশাল্লাহ। শহীদের স্বপ্নের সমাজ বিনির্মাণের মাধ্যমে হত্যাকান্ডের এই নির্মম ষড়যন্ত্রের সমোচিত জবাব দেয়া হবে। পরিকল্পিত এই হত্যাকান্ডের জন্য জালেম সরকারকে জনতার আদালতে একদিন জবাবদিহি করতে হবে।”

সেভ বাংলাদেশ ইউকের সমন্বয় ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লা বলেন, “সমাজকল্যাণমন্ত্রী হিসেবে আলী আহসান মোঃ মুজাহিদ যে দক্ষতা ও সততার পরিচয় দিয়েছেন তা বাংলাদেশের জনগণ কখনো ভুলবে না। তিনি ইসলামী আন্দোলনের একজন অকুতোভয় সৈনিক ছিলেন। বর্তমান স্বৈরাচারী জালেম সরকার এ রকম একজন সৎ, খোদাভীরু ও যোগ্য জাতীয় নেতাকে ফাঁসিতে ঝুঁলিয়ে হত্যা করায় জাতি গভীরভাবে শোকাহত ও ক্ষুব্ধ।”

যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম এ মালেক বলেন, “বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সমগ্র বিশ্বের আপত্তির পর মিথ্যা অভিযোগে ও প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে রং হেডেড শেখ হাসিনা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে ফাঁসি দিয়েছে । অন্যায় অবিচারের কাছে মাথা নত না করে আর রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা না করে তারা তার শক্ত ঈমানের পরিচয় দিয়েছেন।”

তিনি বলেন, “শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে শেখ হাসিনা যে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছেন এজন্য একদিন তাকে বিচারের মূখোমুখি করা হবে।”

জমিয়তে উলামা ইউরোপের সভাপতি মুফতি শাহ সদরুদ্দিন বলেন, “আলী আহসান মুজাহিদকে ফাঁসি দেয়া বিচারিক হত্যাকাণ্ড। তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে আবেদন করেননি। আন্তর্জাতিক মহলে ট্রাইবুনালের বিতর্কিত রায়কে বৈধতা দিতে সরকার তার প্রাণভিক্ষা আবেদনের নাটক করেছে। দেখাতে চেয়েছে যে তিনি অপরাধ স্বীকার করেছেন, সুতরাং রায় সঠিক হয়েছে। কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের লড়াকু সৈনিকেরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারে না।”

সানবিডি/ঢাকা/রাআ