করোনা ভাইরাসে বৈশ্বিক তেলের বাজারে ধস

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || প্রকাশ: ২০২০-০২-০৫ ১০:৪৩:২৬ || আপডেট: ২০২০-০২-০৫ ১১:৪১:০১

চীনে ভয়াবহ অবস্থা ধারণ করা  প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসে বড় ধরনের লোকসানের সম্মুখীন বৈশ্বিক তেল বাজার। জানুয়ারির শুরু থেকে ধস নেমেছে তেলের বাজারে। এক বছরের মধ্যে তেলের দাম এখন সবচেয়ে কম। জানুয়ারিতে দাম স্থিতিশীল থাকলেও কয়েকদিনের ব্যবধানে তা ২০ শতাংশ নিচে নেমে এসেছে। অবস্থা এতটা বেগতিক হয়ে পড়েছে যে, আগামী সপ্তাহগুলোতে উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। বাজারের এমন অবস্থা নিয়ে ১৪টি তেল উৎপাদনকারী দেশের জোট অর্গানাইজেশন অব দ্য পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিস (ওপেক) মঙ্গলবার ভিয়েনায় বৈঠক করেছে। এতে তেলের দাম বাড়াতে উৎপাদন কমিয়ে দেয়ার ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে।

ওপেকের অন্যতম সদস্য ইরান সোমবার প্রকাশ্যেই তেলের দাম বাড়াতে পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল অনুসারে, মঙ্গলবারের বৈঠকে ওপেক ও সহযোগী দেশগুলোর প্রতিনিধিরা চলমান সংকট কাটাতে সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেছেন।

তারা জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে প্রস্তাব দেবেন তারা। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে আগামী সপ্তাহের অনুষ্ঠেয় এক বৈঠকে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মঙ্গলবারের বৈঠকে প্রাথমিকভাবে দিনপ্রতি ৫ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন কমিয়ে দেয়ার ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। তবে পরিস্থিতি আরো বেগতিক হলে, এ পরিমাণ আরো বাড়তে পারে। ওপেক কর্মকর্তারা জানান, করোনা ভাইরাস মহামারী দীর্ঘস্থায়ী হলে দিনপ্রতি ১০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত উৎপাদন স্থগিত করা হতে পারে।

যেভাবে তেলের বাজারে প্রভাব ফেলেছে করোনা ভাইরাস

চীনে করোনা ভাইরাস মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে চন্দ্র নববর্ষ বা লুনার নিউ ইয়ারের আগ দিয়ে। এটা চীনের ছুটির মৌসুম। কিন্তু সেখানে ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় তাতে আক্রান্ত হয়েছে চীনের বাণিজ্য খাতও। বহু কর্মচারী অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সরকারি নির্দেশে ছুটি বাড়িয়েছে বহু প্রতিষ্ঠান। বহু প্রতিষ্ঠান এখনো কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে।

চীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ। প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেলের মতো তেল আমদানি করে থাকে দেশটি। কিন্তু মহামারির পর থেকে বহু প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় চীনের তেলের প্রয়োজন কিছুটা কমেছে। এ ছাড়া, ভাইরাসটির উৎপত্তিস্থল চীন হওয়ায় অসংখ্য এয়ারলাইন্স চীনের সঙ্গে আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। যার দরুন, বিশ্বজুড়ে প্রয়োজন কমেছে বিমানের জ্বালানিরও। চীনের ভেতরেও ভ্রমণ নিয়ে বিধিনিষেধ থাকায়, সেখানেও বিমানের জ্বালানির দরকার হ্রাস পেয়েছে।

চলতি সপ্তাহে ব্লুমবার্গ এক প্রতিবেদনে লিখেছে, গড় হিসেবে চীনের নিয়মিত অপরিশোধিত তেল ব্যবহার ২০ শতাংশ কমেছে। এ পরিমাণ ইতালি ও বৃটেনে ব্যবহৃত তেলের সমান। ফলস্বরূপ, চীন সরকারের মালিকানাধীন তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান সিনোপেক গড়ে প্রতিদিন ৬ লাখ ব্যারেল বা ১২ শতাংশ তেল পরিশোধন করা কমিয়ে দিয়েছে। এক দশকে প্রতিষ্ঠানটির তেল পরিশোধনের এ হার সর্বনি¤œ। প্রসঙ্গত, সিনোপেক হচ্ছে এশিয়ার সর্ববৃহৎ তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান।

শিকাগোভিত্তিক তেলের বাজার বিশ্লেষক ফিল ফ্লিন বলেন, তেলের এত বেশি দরপতনে কেঁপে উঠেছে পুরো জ্বালানি শিল্প। এর আগে এত দ্রুত এ পরিমাণের চাহিদা নষ্টকারী ঘটনা দেখিনি কখনো।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব

তেলের চাহিদায় এরকম তীব্র ধস চীনের বাণিজ্য খাতে টান পড়ার লক্ষণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কমতে থাকা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এতে আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। চীন সরকার সমর্থিত থিংকট্যাংক চায়না একাডেমি অব সোস্যাল সায়েন্সেসের অর্থনীতিবিদ ঝাং মিং মনে করেন, করোনা ভাইরাস মহামারিতে তিন মাসের মধ্যে চীনের আর্থিক প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ কমবে।

বর্তমান বিশ্বে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে দেশটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনের ওপর যেকোনো নেতিবাচক প্রভাব নিশ্চিতভাবেই পুরো বিশ্বের ওপর ছড়িয়ে পড়বে। চলতি সপ্তাহে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সতর্ক করেন, করোনা ভাইরাস মহামারিতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার সাময়িক সময়ের জন্য পিছিয়ে পড়তে পারে। তবে, এত আগেই কিছু নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

সানবিডি/এনজে