ব্যয়ের হিসাব দেয়নি ৮৫ শতাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

সান বিডি ডেস্ক || প্রকাশ: ২০২০-০২-১০ ১৩:৪৮:০২ || আপডেট: ২০২০-০২-১০ ১৩:৪৮:০২

আইন অনুযায়ী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল পরিচালিত হবে ট্রেজারার ও বোর্ড অব ট্রাস্টিজ (বিওটি) মনোনীত একজন কর্মকর্তার যৌথ স্বাক্ষরে। কিন্তু তা মানছে না দেশের অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বেশকিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েরই তহবিল পরিচালিত হচ্ছে ট্রাস্টি চেয়ারম্যান কিংবা সদস্যদের স্বাক্ষরে। শুধু তাই নয়, একক নিয়ন্ত্রণ পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় তহবিলের লুটপাটেও জড়িয়ে পড়ছেন অনেক ট্রাস্টি সদস্য। নামে-বেনামে নানা সুবিধা ভোগ করছেন ট্রাস্টিরা। শিক্ষার্থীদের বেতন-ফির টাকায় গাড়ি-বাড়ি বিলাস কিংবা উচ্চবেতন গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে ট্রাস্টিদের বিরুদ্ধে।

এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি কেনার নামেও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটছে। আর এসব অনিময় ঢাকতেই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনে (ইউজিসি) ব্যয়ের হিসাব দিচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়মের প্রমাণ মিলছে বিভিন্ন সময় ইউজিসির তদন্তেও। তবে অভিযোগ রয়েছে, এসব তদন্ত প্রতিবেদন চাপা পড়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। এমনকি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে করা তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পরও তেমন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না মন্ত্রণালয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেয়ার সুযোগ নিচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। ট্রাস্টিরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রূপ দিচ্ছেন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে।

আইন অনুযায়ী প্রতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে পূর্ববর্তী বছরের আর্থিক হিসাব ইউজিসিতে জমা দিতে হবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে। এরপর ডিসেম্বরের মধ্যে ওই হিসাবের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন ইউজিসিতে পাঠাতে হবে। কিন্তু আইনের এ নির্দেশনা মানছে না বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। ২০১৮ সালে ৮৫ শতাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই আইনে বর্ণিত নির্দেশনা মেনে আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষিত হিসাব জমা দেয়নি।

ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা ৯১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের। এর মধ্যে ৪৮টি বিশ্ববিদ্যালয় ওই বছর নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেয়। যদিও ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ দেয়া অডিট ফার্মের মাধ্যমে নিরীক্ষা করেনি। এছাড়া আরো ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদন তৈরিতে আইনের নির্দেশনা অনুসরণ করেনি। সব মিলিয়ে আইনে বর্ণিত নির্দেশনা অনুসরণ করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে মাত্র ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয়। সে হিসাবে ওই বছর ৮৫ শতাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই ইউজিসির নির্দেশনা অনুসরণ করে আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষিত হিসাব জমা দেয়নি।

ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী শহীদুল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে আইনের অধীন পরিচালিত, সে আইনেই আয়-ব্যয়ের হিসাব কমিশনে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের জন্যই এ ব্যবস্থা। যদিও অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ই তা অনুসরণ করছে না।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলে শিক্ষার্থীদের ফি-বেতনের টাকায়। সে অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে, তার নিরীক্ষিত হিসাব রাখা জরুরি। তদারককারী সংস্থা হিসেবে পাবলিক-প্রাইভেট সব ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়েই আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতে কাজ করছে ইউজিসি। আশা করছি, প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ম অনুসরণের মাধ্যমে ইউজিসিকে সহযোগিতা করবে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাধারণ তহবিল বিষয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এ বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক আর্থিক বৎসরের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পূর্ববর্তী আর্থিক বৎসরের আয়-ব্যয়ের হিসাব ও সংরক্ষিত তহবিল এবং সাধারণ তহবিলের হিসাব কমিশন ও সরকারের নিকট প্রেরণ করতে হবে।’ আর হিসাবরক্ষণ ও নিরীক্ষা বিষয়ে আইনে বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতি আর্থিক বৎসরের আয় ও ব্যয়ের হিসাব কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত ফরমে প্রস্তুত ও সংরক্ষণ করিবে। উল্লিখিত হিসাব প্রতি আর্থিক বৎসরের বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত বহিঃনিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানসমূহের (সিএ ফার্ম) মধ্য হইতে সরকার মনোনীত একটি ফার্ম দ্বারা নিরীক্ষা করাইতে হইবে এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদন পরবর্তী আর্থিক বৎসরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও কমিশনে প্রেরণ করিতে হইবে।’
কিন্তু আইনের সুস্পষ্ট এ নির্দেশনা মানছে না বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘আয়-ব্যয়ের হিসাব দিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অনাগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা একেবারেই কাম্য নয়। অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই আইনে বর্ণিত প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্ট নীতি অনুসরণ করছে না।’

ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান এ প্রসঙ্গে বলেন, বেশকিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আর্থিকসহ বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি নামে-বেনামে বিভিন্ন খাত দেখিয়ে অ্যালাউন্স নেয়ার অভিযোগ রয়েছে খোদ উচ্চপদস্থদের বিরুদ্ধে।

আমি দায়িত্বে থাকাকালীনও বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। সেগুলোর তদন্ত করে প্রতিবেদনও পাঠানো হয়। তবে সে আলোকে ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি। দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে আইন অমান্য করার এক ধরনের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে, যা গুণগত উচ্চশিক্ষা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।

গত বছর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেয়ার বিষয়ে একটি হালনাগাদ প্রতিবেদন তৈরি করে ইউজিসি। সেখানে দেখা যায়, কার্যক্রম পরিচালনা করছে এমন ৯৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে হিসাব হালনাগাদ রয়েছে মাত্র ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের।

এগুলো হলো ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি), চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (এআইইউবি), ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি, গ্রীন ইউনিভার্সিটি, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, দ্য মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটি, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস, ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি, ঈশা খাঁ ইউনিভার্সিটি, এক্সিম ব্যাংক কৃষি ইউনিভার্সিটি, ফেনী ইউনিভার্সিটি, নটর ডেম ইউনিভার্সিটি, নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রণদা প্রসাদ সাহা ইউনিভার্সিটি, সৈয়দপুরের বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি ও কাদিরাবাদের আর্মি ইউনিভার্সিটি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি। বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অডিট রিপোর্ট প্রক্রিয়াধীন ছিল ১১টির। শিক্ষা মন্ত্রণালয় মনোনীত অডিট ফার্ম দ্বারা আংশিক অডিট করা হয়েছে ৪১টির। প্রতিষ্ঠার পর থেকে কোনো অডিটই হয়নি এমন বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে নয়টি। আর শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছে, কিন্তু এখনো প্রতিবেদন জমা দেয়ার সময় হয়নি আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের।

ইউজিসি কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েক বছর ধরেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অডিট ফার্ম নিয়োগ করে হিসাবের নিরীক্ষিত প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য তাগাদা দেয়া হচ্ছে। এজন্য তাদের সঙ্গে আলাদা করে সভারও আয়োজন করা হয়েছে। এর পরও বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় সেটি অনুসরণ করছে না। তবে এক বছরের মধ্যে অডিট ফার্ম নিয়োগের হার কিছুটা বেড়েছে বলে জানান ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের পরিচালক ড. মো. ফখরুল ইসলাম।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আইনের বর্ণনা অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবেই হিসাব ও এর নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা। যদিও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে এ বিষয়ে এক ধরনের অনীহা পরিলক্ষিত হয়। এজন্য আমরা তাদের কয়েক দফায় নির্দেশনা দিয়েছি। নানাভাবে তাদের চাপ প্রয়োগ করেছি। সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। গত এক বছরে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান অডিট ফার্ম মনোনয়নের জন্য চিঠি দিচ্ছে। অনেকেই নিয়োগ দিয়ে দিয়েছে। ক্রমান্বয়ে বিষয়টি একটি শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসার কাজ চলছে। সূত্র: বণিক বার্তা
সানবিডি/ঢাকা/এসএস