ইউক্রেনের পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন বাংলাদেশীরা

সান বিডি ডেস্ক || প্রকাশ: ২০২০-০২-১০ ১৯:০১:৩৬ || আপডেট: ২০২০-০২-১০ ১৯:০১:৩৬

 

ইতালির মিলানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ইউক্রেনের কাইভ বোরিস্পিল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পার হচ্ছিলেন বাংলাদেশের নাগরিক মো. সোহেল আহমেদ। যদিও ইমিগ্রেশনে জমা দেয়া তার পাসপোর্টটি ছিল ইউক্রেনের (এফই ৯৭৪৩৯৫), যেখানে তার জন্ম তারিখ দেখানো হয়েছিল ২০০৫ সালের ২৩ অক্টোবর। কিন্তু বিপত্তি ঘটে যখন তাকে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা সশরীরে দেখেন।

পাসপোর্টে বয়স ১১ বছর দেখানো হলেও মুখভর্তি দাড়ি-গোঁফওয়ালা সোহেল আহমেদের শারীরিক গড়ন বলছে সে কোনোভাবেই অপ্রাপ্তবয়স্ক নন। ফলে তাত্ক্ষণিক তাকে গ্রেফতার করে কাইভ বোরিস্পিল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পুলিশ। একইভাবে তথ্যে গরমিল থাকায় সোহেল আহমেদের সঙ্গে থাকা আম্বিয়া বেগমকেও গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনিও ইউক্রেনের পাসপোর্ট (এফই ৮৪২২৬৩) নিয়ে মিলানের উদ্দেশে রওনা হচ্ছিলেন।

কেবল সোহেল বা আম্বিয়া নন, ইউরোপে প্রবেশের জন্য তাদের মতো আরো অনেকেই ব্যবহার করছেন ইউক্রেনের পাসপোর্ট। তাদের কেউ স্বেচ্ছায়, আবার কেউ মানব পাচারের শিকার হয়ে নিজ দেশের পাসপোর্ট হারিয়েছেন। ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে বাংলাদেশীদের ইউক্রেনের পাসপোর্ট পাওয়ার কয়েকটি ঘটনা ইউক্রেন কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। এ নিয়ে এরই মধ্যে দেশটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে, ২০১৭ সালের ৩১ মে রাত ৭টা ২০ মিনিটে ইউক্রেনের কাইভ বোরিস্পিল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে ফ্লাইট নং ৩১৫ দিয়ে মিলানে যাচ্ছিলেন আম্বিয়া বেগম ও মো. সোহেল আহমেদ। তারা দুজনই ইউক্রেনের পাসপোর্ট বহন করছিলেন। ইউক্রেনের পাসপোর্টে মো. সোহেল আহমেদের মা হিসেবে আম্বিয়া বেগমকে উল্লেখ করা হয়। তাদের পাসপোর্টের সঙ্গে দেয়া তথ্যের গরমিল দেখে দুজনকেই গ্রেফতার করে বিমানবন্দর পুলিশ। পরবর্তী সময়ে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ পাসপোর্টের সূত্র ধরে তাদের জমা দেয়া জন্ম নিবন্ধন সনদ, বিবাহ নিবন্ধন সনদসহ যাবতীয় নথি সামনে নিয়ে আসে। সব নথিই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সত্যতা যাচাই করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সইও ছিল এতে। বিষয়গুলো নিয়ে রহস্য উদ্ঘাটনে পোল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাছে চিঠি দেয় ইউক্রেনের কাইভ বোরিস্পিল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পুলিশ।

বিষয়টি নিশ্চিত করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, বেশ আগেই আমরা পোল্যান্ডের বাংলাদেশ মিশন থেকে এ-সংক্রান্ত চিঠি পেয়েছি। আর তখনই তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে যাচাইয়ের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। শুধু আম্বিয়া বেগম ও মো. সোহেল আহমেদ নন, ইউক্রেন থেকে আরো বেশ কয়েকটি ঘটনার জের ধরে যাচাইয়ের জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে। বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো। বাংলাদেশে এর সংশ্লিষ্টদের খোঁজা হচ্ছে। পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি বলেন, আম্বিয়া বেগম ও মো. সোহেল আহমেদের ক্ষেত্রে তথ্যের নানা ধরনের গরমিল পাওয়া গেছে। প্রথমত মো. সোহেল আহমেদ তার ইউক্রেনের পাসপোর্টে নিজেকে ১১ বছরের শিশু দেখিয়েছেন। তবে তিনি কোনোভাবেই ১১ বছরের শিশু নন। সিলেটের দক্ষিণ সুরমার কালামবাজার ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তিনি যে জন্ম সনদ সংগ্রহ করেছেন, তাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সত্যতা যাচাইয়ের সই থাকলেও তা ছিল ভুয়া। আর আম্বিয়া বেগমের নথিগুলোর মধ্যে মৃত্যু সনদে তার মৃত স্বামী আবদুল হাসিমের বয়স ৭৫ বছর দেখানো হয়েছে, যিনি ২০১১ সালে মারা গেছেন। এছাড়া আবদুল হাসিমের জন্ম নিবন্ধনের একটিতে ১৯৮২ সালে জন্ম, আরেকটি নথিতে ১৯৮১ সালে জন্ম দেখানো হয়েছে। ফলে পুরো বিষয়টি ভুয়া নথির ওপর ভিত্তি করে তৈরি বলে জানানো হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ইউক্রেনের আইন অনুযায়ী পাসপোর্ট তৈরি করতে গেলে স্বয়ং আবেদনকারী ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সামনে উপস্থিত থাকতে হয়। তবে যদি সে অপ্রাপ্তবয়স্ক হয়, তাহলে আইনানুগ অভিভাবক তার পক্ষে হাজিরা দিয়ে পাসপোর্ট পেতে পারেন। এক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্কের উপস্থিতি প্রয়োজন হয় না। আর এ সুযোগেই বাংলাদেশীদের অনেকে দালালের মাধ্যমে ভুয়া নথি দিয়ে ইউক্রেনের পাসপোর্ট জোগাড় করছেন। এছাড়া ইউক্রেনের পাসপোর্ট পেতে ভুয়া বিয়ে, দত্তক নেয়া থেকে শুরু করে নানা ধরনের পন্থা অবলম্বন করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, ইউক্রেনে বেশির ভাগ মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ইউক্রেনের নাগরিক মো. ফয়জুল খক। ইউক্রেনের পাসপোর্টধারী (এফবি ৬৯০৯৭০) মো. ফয়জুল খক বাংলাদেশের সিলেটে জন্মগ্রহণ করেছেন বলে বাংলাদেশ দূতাবাসকে জানিয়েছে ইউক্রেনের পুলিশ। পাসপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, তার জন্ম ২ এপ্রিল ১৯৭৫ সালে। আম্বিয়া বেগম ও মো. সোহেল আহমেদের পাচারের সঙ্গেও তার সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।

এর আগে ইউক্রেনের নাগরিক ওস্টাপেনকো ওলেকসি (৩৭) বাংলাদেশী তিনটি অনাথ শিশুকে দত্তক নিয়ে ইউক্রেনে পাচার করেছিলেন। ইউক্রেনে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে এ শিশুগুলোর আর কোনো হদিস নেই। পাচারকারীদের পুরো প্রক্রিয়াটি সাজানো হয়েছিল ভুয়া কাগজপত্রের ভিত্তিতে। তাতে সহযোগিতা করেছিলেন মো. ফয়জুল খক।
সানবিডি/ঢাকা/এসএস