নভেল করোনাভাইরাস

আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে

সান বিডি ডেস্ক || প্রকাশ: ২০২০-০২-১৩ ১৩:১৯:৪৬ || আপডেট: ২০২০-০২-১৩ ১৩:২৯:১৭

চীন থেকে গত ১০ ফেব্রুয়ারি শিপমেন্ট হওয়ার কথা ছিল চট্টগ্রামভিত্তিক ইনডিপেনডেন্ট অ্যাপারেলসের তিনটি চালান। আগামী মাসের ১৫-২০ তারিখের মধ্যে কারখানায় পৌঁছার কথা এসব কাঁচামাল। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে কারখানা বন্ধ থাকায় এখনো শিপমেন্ট হয়নি চালান তিনটি। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট রফতানিকারক জানিয়ে দিয়েছে, তারা ২০ ফেব্রুয়ারির আগে কারখানাই খুলবে না এবং ১৫ মার্চের আগে শিপমেন্ট সম্ভব নয়। সে হিসেবে ১৫ এপ্রিলের আগে কারখানায় আমদানি কাঁচামাল বুঝে পাচ্ছে না ইনডিপেনডেন্ট অ্যাপারেলস। ফলে পিছিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির পণ্য রফতানিও।

শুধু ইনডিপেনডেন্ট অ্যাপারেলস নয়, একই সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে রফতানি খাতের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত। কারণ বাংলাদেশ থেকে রফতানিজাত বিভিন্ন পণ্যের কাঁচামালের প্রায় ৭০ শতাংশই আসে চীন থেকে। নভেল করোনাভাইরাসের কারণে কারখানা বন্ধ থাকায় সময়মতো কাঁচামাল শিপমেন্ট হচ্ছে না দেশটি থেকে, যার প্রভাব এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে।

ইনডিপেনডেন্ট অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশের (আইবিএফবি) চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি এসএম আবু তৈয়ব বলেন, শিগগিরই কাঁচামাল সংকটে পড়তে যাচ্ছে দেশের কারখানাগুলো। আমাদের কারখানায় আগামী ১২ মার্চ পর্যন্ত চলার মতো কাঁচামাল আছে। এরপর কর্মীদের কাজ থাকবে না। এ চিত্র ৮০ ভাগ কারখানার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। করোনাভাইরাসের প্রভাবে একটা বড় সংকট তৈরি হতে যাচ্ছে।

চান্দ্র নববর্ষ উপলক্ষে গত ২৪ থেকে ৩০ জানুয়ারি ছুটি ঘোষণা করেছিল চীনের স্টেট কাউন্সিল। কিন্তু নভেল করোনাভাইরাসের কারণে দুই দফায় ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছুটি বাড়িয়েছে বেশির ভাগ প্রদেশ। আমদানি প্রক্রিয়ায় যুক্ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, ৯ ফেব্রুয়ারি ছুটির বর্ধিত সময় শেষ হলেও সব কারখানা চালু হয়নি দেশটিতে। এখন রাজ্য ও পণ্যের ক্যাটাগরি ভিত্তিতে কারখানা খোলার অনুমতি দেয়া হচ্ছে। ফলে চীন থেকে পণ্য আমদানি প্রক্রিয়ায় নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এখন পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে চীন থেকে যেসব পণ্য আসছে, তার রফতানি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল নববর্ষের ছুটির আগে। বর্তমানে পণ্য জাহাজীকরণ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকেই এর নেতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হবে বেশি। এতে আমদানি, উৎপাদন এবং সর্বশেষ রফতানি প্রক্রিয়ায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। বড় আঘাত আসবে পণ্য রফতানিতে।

এশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ আব্দুস সালাম বলেন, ‘চীন সরকার ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রদেশভিত্তিক ও পণ্যের ক্যাটাগরি অনুযায়ী কিছু কারখানা খোলার নির্দেশ দিয়েছে, আবার কিছু কারখানাকে খোলার অনুমতি দেয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকেই চট্টগ্রাম বন্দরে এর প্রভাব ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান হবে। এখনই যেসব জাহাজে পণ্য আসছে, তাতে কিন্তু কনটেইনার অনেক কম। অর্থাৎ এরই মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খল ভাঙতে শুরু করেছে।

ভবিষ্যৎ অর্ডারের জন্য স্যাম্পল অ্যাপ্রুভাল, স্যাম্পল ডেভেলপমেন্টের মতো অনেক বিষয় আছে, যেগুলোর ক্ষতি আসলে এখনই বোঝা যাচ্ছে না। চীনে সমস্যা যদি আরো দীর্ঘায়িত হয়, তবে মার্চের শিপমেন্ট বিলম্বিত হবে অথবা বাতিল হবে। এপ্রিলের মাঝখানে অনেকগুলো ফ্যাক্টরিতে কাঁচামাল সংকট দেখা দিতে পারে। তখন ওয়ার্কারদের দেয়ার মতো কাজ থাকবে না।’

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি ও রফতানি হওয়া পণ্যের শুল্কায়ন কার্যক্রম সম্পন্ন করে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। তাদের দেয়া তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি হওয়া ৪ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা মূল্যের ৯ কোটি ৮২ লাখ টন পণ্যের শুল্কায়ন করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

আর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ২০১৯ সালে চীনের সঙ্গে আমদানি-রফতানি মিলিয়ে মোট ১ লাখ কোটি টাকা মূল্যের পণ্যের শুল্কায়ন হয়েছে। এর মধ্যে আমদানি হয়েছে ৯৯ হাজার ৬৬ কোটি টাকা মূল্যের পণ্য। সে হিসেবে সারা বিশ্ব থেকে বছরে যে আমদানি হয়, তার প্রায় এক-চতুর্থাংশই আসছে চীন থেকে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, করোনাভাইরাসের কারণে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক স্থবিরতা দীর্ঘ হলে দেশের পুরো রফতানি খাত সংকটে পড়বে। কারণ ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে যে রফতানি হচ্ছে, তার প্রায় ৭০ শতাংশ কাঁচামাল চীন থেকে আসে।

প্যাসিফিক গ্রুপের পরিচালক ও চট্টগ্রাম চেম্বারের ডিরেক্টর সৈয়দ এম তানভীর বলেন, ‘চীনের ওপর আমাদের নির্ভরতা এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে যে আমাদের দেশে যেসব কাঁচামাল উৎপাদন হচ্ছে, তার প্রয়োজনীয় উপকরণও আনতে হচ্ছে চীন থেকে। ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজে আমরা কতটা পিছিয়ে আছি, সে বিষয়টি আমাদের এখনই অনুধাবন করা উচিত। এখন পর্যন্ত আমাদের ভ্যালু এডিশনের পার্সেন্টেজ অনেক লো। আমাদের রফতানি ৩৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, কিন্তু সেখানে ভ্যালু এডিশন কত হচ্ছে, এটার পার্সেন্টেজ বের করলে দেখা যাবে, অর্থের বড় একটা অংশ বাইরে চলে যাচ্ছে কাঁচামাল আমদানি করতে গিয়ে।

উৎপাদনকারী, রফতানিকারক, ট্রেড বডি, সরকার—সব পক্ষ মিলে কাঁচামালের ক্যাপাসিটি অ্যানালাইসিস করে কোন কোন প্রডাক্টে কী গ্যাপ আছে, তা নির্ণয় করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এ ধরনের ডাটাবেজ তৈরি করতে পারলে বিনিয়োগকারীরা গাইডলাইন পাবে এবং সেক্টর বুঝে বিনিয়োগ করতে পারবে।

গতি হারাবে চট্টগ্রাম বন্দর: পণ্য হ্যান্ডলিং গড়ে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলে চট্টগ্রাম বন্দরের ক্ষেত্রে সেটাকে আদর্শ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরের প্রবৃদ্ধির হার কমে ৬ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। জাহাজ আগমনের হার সাধারণত ১১ শতাংশ হলেও ২০১৯ সালে তা ১ শতাংশে নেমে এসেছে। মার্চে করোনাভাইরাসের প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করলে চট্টগ্রাম বন্দরের আমদানি-রফতানি কার্যক্রমও গতি হারাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বেসরকারি আমদানির পাশাপাশি সরকারি আমদানি কমে গেলে পরিস্থিতি অরো ভয়াবহ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারিভাবে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রকল্প ছাড়াও ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ প্রকল্প রয়েছে পাইপলাইনে। এছাড়া অবকাঠামো খাতে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প, কর্ণফুলী টানেল, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎ খাতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং জ্বালানি খাতের এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি নিয়মিত খালাস হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরকে ব্যবহার করে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ও মুখপাত্র মো. ওমর ফারুক এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের দিক থেকে করোনাভাইরাসের কোনো প্রভাব এখনো দেখা দেয়নি।

তবে আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পারছি চীনের সঙ্গে নতুন করে আমদানি কার্যক্রমে স্থবিরতা চলছে। যদি এমনটা চলতে থাকে, তাহলে আগামী মাসে বন্দরে এর নেতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হবে। আমদানি না হলে রফতানিও বাধাগ্রস্ত হবে। বন্দরের পণ্য হ্যান্ডলিং কমে এলে নিশ্চিতভাবেই চট্টগ্রাম বন্দরের প্রবৃদ্ধিতে খারাপ চিত্র উঠে আসবে।’ সূত্র: বণিক বার্তা
সানবিডি/ঢাকা/এসএস