১ হাজার কোটি টাকা ব্যায়ে যমুনার ভাঙ্গন প্রতিরোধ শুরু

সান বিডি ডেস্ক আপডেট: ২০২০-০২-১৮ ১১:০৯:০৩


সিরাজগঞ্জে বর্ষাকালে ধ্বংসলীলা সাধন করা  প্রমত্তা যমুনাকে বশে আনতে চলতি বছর যমুনাপাড় জুড়ে শুরু ১ হাজার কোটি টাকার বিশাল নির্মাণযজ্ঞ । নদী তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় যমুনার ভয়ঙ্কর ভাঙ্গন প্রতিরোধে সিসি ব্লক দিয়ে পাড় মুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। কাজিপুর সীমানায় খুদবান্দি-সিংড়াবাড়ি-শুভগাছা এলাকায় প্রায় ৬ কিমি নদী তীর সিসি ব্লক দিয়ে মুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে চারটি স্পার সংস্কার এবং চার কিমি নদী খনন কাজ শুরু হয়েছে। প্রমত্তা যমুনাকে বশে আনার নিরন্তর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমপাড়ে সেতুর উজানে নদী তীর রক্ষা, বাঁধ নির্মাণ এবং নদী ড্রেজিং করার কাজও শুরু হয়েছে।

বিধ্বংসী যমুনার ভয়ঙ্কর ভাঙ্গন প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। যমুনা নদীর গতিবিধি লক্ষ্য রেখে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়ে থাকে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া বলে সংশ্লিষ্ট পানি উন্নয়ন বিভাগ জানিয়েছে। এদিকে যমুনায় ক্যাপিটাল ড্রেজিং করে অপসারিত পলি মাটি দিয়ে চারটি ক্রসবার নির্মাণ করার পর নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। নদীর পশ্চিম তীরে সাড়ে ১৬ বর্গকিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।

বিগত ষাটের দশকের শুরুতে ১৯৬৩ সালে ব্রহ্মপুত্র ডানতীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ প্রকল্পে যমুনা নদীর ডানতীরে রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ এবং পাবনা জেলার বেড়াখোলা পর্যন্ত ২১৭ কিমি বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু করে ১৯৬৮ সালে তা সমাপ্ত করা হয়। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জ অংশে বাঁধের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮০ কিমি। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে যমুনার ভাঙ্গন থেকে প্রায় ১২ লাখ মানুষের সহায় সম্পদ রক্ষা করা হয়।

কিন্তু অপ্রতিরোধ্য যমুনায় সিরাজগঞ্জ অংশে প্রতি বছরই কোন না কোন এলাকা ভয়ঙ্কর ভাঙ্গনের কবলে পড়ে। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর সিরাজগঞ্জ শহর ভয়ঙ্কর ভাঙ্গনের মুখে পড়ে। জোড়াতালি দিয়ে চলতে চলতে এক সময় দাবি উঠে শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের। এ প্রেক্ষিতে ১৯৯৫ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সিরাজগঞ্জ শহর বরাবর ২ দশমিক ৫৫ কিমি নদী তীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এ প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ১৯৯৯ সালে। ব্যয় করা হয় ৩শ’ ৩৫ কোটি টাকা। এ প্রকল্প সিরাজগঞ্জ হার্ড পয়েন্ট নামে পরিচিত। এটি একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। এরপর ২০১৩ সালে যমুনায় ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্প হাতে নিয়ে ২২ কিমি নদী খনন করা হয়। যমুনার তলদেশের পলি মাটি দিয়ে চারটি ক্রসবার নির্মাণ করা হয়। এই ক্রসবার নির্মাণের ফলে যমুনার গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। যমুনা নদীর পশ্চিম তীরে সাড়ে ১৬ বর্গকিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার হয়েছে। এ প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ১৯১৭ সালে। ১৯৯৭ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত যমুনারপাড়ে একশ; কোটি টাকা খরচ করে ১১টি স্পার নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু তা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকার্যকর হয়ে যমুনা গর্ভে বিলীন হয়েছে।

যমুনা নদী প্রকৃতপক্ষেই অপ্রতিরোধ্য প্রকৃতির নদী। এই যমুনা ব্রহ্মপুত্র নদের নিম্ন প্রবাহ। ১৭৮২ থেকে ১৭৮৭ সালের মধ্যে সংঘটিত এক ভূমিকম্পে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে যমুনা নদী নামে প্রবাহিত হচ্ছে। কুড়িগ্রাম জেলা সীমানা থেকে শুরু হয়ে গাইবান্ধা, বগুড়া এবং সিরাজগঞ্জ জেলা হয়ে মানিকগঞ্জ জেলার আরিচায় পদ্মা নদীতে মিলিত হয়েছে। যমুনা নদীর দৈর্ঘ্য ২০৫ কিমি এবং প্রস্থ তিন কিমি থেকে ২০ কিমি পর্যন্ত। অর্থাৎ গড়ে ১০ কিমি। এ নদীতে বর্ষা মৌসুমে প্রতিদিন ১২ লাখ টন পলিমাটি বহন করে। বাহাদুরাবাদে পরিমাপকৃত যমুনায় বার্ষিক পলি বহন ক্ষমতা প্রায় ৭শ’ ৩৫ মিলিয়ন টন। প্রতি বছরই নতুন নতুন চর জেগে উঠে। আবার প্রতি বছরই নদীর ডানতীরে ভয়াবহ ভাঙ্গনে গ্রাম জনপদ যমুনাগর্ভে বিলীন হয়। বর্ষায় ভয়ঙ্কর বিধ্বংসী রূপে এই যমুনায় পানিপ্রবাহ একক খাতে পরিণত হয়। আবার শুকনো মৌসুমে নদীতে চর জেগে উঠে এবং কোথাও নদী সর্পাকৃতি, কোথাও চুলের বেণীর মতো এঁকে বেঁকে চলে।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম  জানান- যমুনাপাড়ের নদী তীর সংরক্ষণ প্রকল্প একটি চলমান প্রক্রিয়া। কাজিপুরের খুদবান্দি-সিংড়াবাড়ি-শুভগাছা এলাকায় প্রায় ৬ কিমি নদী তীর সিসি ব্লক দিয়ে মুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে চারটি স্পার সংস্কার এবং চার কিমি নদী খনন কাজ শুরু হয়েছে।

প্রমত্তা যমুনাকে বশে আনার নিরন্তর চেষ্টা করা হচ্ছে। যমুনার ভয়ঙ্কর ভাঙ্গন প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। এছাড়াও নদী তীর সংরক্ষণ প্রকল্প নামে একাধিক স্থানে প্রকল্প গ্রহণ করে নদী শাসন কাজ করে যমুনাকে বশে এনে সিরাজগঞ্জে উন্নয়ন কর্মকান্ড চালানো হচ্ছে। যমুনা নদীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করে যমুনার দুর্গম চরে খাদ্যশস্য উৎপাদনে ভূমিকা পালন করছে। যমুনার পাড়কে দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও হাতে নেয়া হয়েছে।