বিদেশ ভ্রমণে সতর্ক করলো আইইডিসিআর

সান বিডি ডেস্ক প্রকাশ: ২০২০-০২-২৪ ১২:০৮:০৩


চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাস পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল রূপ ধারণ করছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এরই মধ্যে বিশ্বের প্রায় ৩২টি দেশে এ ভাইরাসের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে। গতকাল রোববার পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা আড়াই হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আক্রান্তের সংখ্যাও ৮০ হাজার ছুঁইছুঁই। চীনের বাইরে আরো আটটি দেশে কভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ইরানে সর্বোচ্চ আটজন মারা গেছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে শুধু চীন নয়, বিশ্বের যে কোন দেশেই বাংলাদেশীদের ভ্রমণের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট (আইইডিসিআর)। এমনকি জরুরি প্রয়োজন না হলে বিদেশ ভ্রমণ থেকে বিরত থাকতে বলেছে প্রতিষ্ঠানটি।

গতকাল রোববার কভিড-১৯ নিয়ে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এ পরামর্শ দেন আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এএসএম আলমগীর।

সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, চীনের বাইরে হঠাৎ করে রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। যাদের চীন ভ্রমণের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি তারাও এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অর্থাৎ এ ভাইরাস স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। নিজ নিজ দেশেই কারও মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছে। আবার অনেক রোগীর ক্ষেত্রে সংক্রমণের সোর্স (কিভাবে সংক্রমিত হয়েছে) জানা যাচ্ছে না। এ তিন কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা পরিস্থিতি জটিল হিসেবে উল্লেখ করে এক্ষেত্রে নজরদারি বাড়িয়েছে।

তিনি বলেন, পুরো বিষয় বিশ্লেষণ করে এ পরিস্থিতিতে আইইডিসিআর মনে করছে, যে কোনো দেশেই ভ্রমণের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। অত্যাবশ্যকীয় না হলে এ সময়ে বিদেশ ভ্রমণ এড়িয়ে চলাই ভালো।

একান্তই ভ্রমণ করতে হলে অবশ্যই ভ্রমণকালীন সতর্কতা মেনে চলতে হবে। পাশাপাশি কোনো রোগীর শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ রয়েছে কিনা সেদিকে নজর রাখা, তার কাছাকাছি না যাওয়া, হাত মেলানো-কোলাকুলি থেকে বিরত থাকা এবং জনসমাগম স্থলে না যেতে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এছাড়া বিদেশ থেকে ফেরার পরে (যে দেশ থেকেই হোক) শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের কোনো লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা দিলে অবশ্যই আইইডিসিআরের হটলাইনে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানান তিনি। অধ্যাপক ফ্লোরা বলেন, আমরা বিশ্লেষণ করে যদি নমুনা সংগ্রহ করার প্রয়োজন হয় তাহলে সেটিও করা হবে।

বিশ্ব পরিস্থিতি জানিয়ে তিনি বলেন, চীনে রোগীর সংখ্যা দ্রুত কমছে তবে চীনের বাইরে নতুন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ায় লেবানন এবং ইসরাইল নতুন করে আক্রান্ত দেশের তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

গত ডিসেম্বরের শেষের দিকে চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান থেকে ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব ঘটে। এর পর থেকে দ্রুত প্রদেশটিতে ভাইরাসটি মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। চীনের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের কারণে ভাইরাসটিতে সংক্রমিত ও মৃতের সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে। এ মাসের শেষের দিকে ভাইরাসটি নির্মূলের দিকে যেতে পারে বলেও মনে করছে চীন সরকার।

তবে চীনের বাইরে এখন সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ায়। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর দেইগুর একটি গির্জা থেকে ভাইরাসটি এখন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। গতকাল পর্যন্ত ভাইরাসটিতে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৫৬। এর মধ্যে গতকালই নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১২৩ জন। আক্রান্তের ৩০০ জনের বেশি গির্জা থেকে আক্রান্ত হয়েছে। এছাড়া গতকাল ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে আরো দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গতকাল পর্যন্ত দেশটিতে মরণঘাতী এ ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে চার। এছাড়া ১ হাজার ২৪০ জনের শরীরে ভাইরাসটির লক্ষণ দেখা গেছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে উচ্চমাত্রায় সতর্কতা জারির পাশাপাশি দেইগুসহ অন্যান্য শহরকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে সিউল। কোরিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের তথ্যানুযায়ী, যে গির্জা থেকে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে বলে বলা হচ্ছে, সেখানকার ৯ হাজার ৩০০ সদস্যকে কোয়ারান্টাইনে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জা-ইন জানান, আগামী কয়েক দিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরিস্থিতি বিবেচেনা করে এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হতে পারে। তবে ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে সরকার, সেটি নির্দিষ্ট করেননি তিনি।

দক্ষিণ কোরিয়ার পর চীনের বাইরে কভিড-১৯ নিয়ে এখন ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় আতঙ্ক বাড়ছে। ইতালিতে এরই মধ্যে দেশটির দুজন নাগরিক ভাইরাসটিতে সংক্রমিত হয়ে মারা গেছে। দেশটি এখন চীনের হুবেই প্রদেশের মতো কয়েকটি শহর কোয়ারান্টাইনে রাখার ব্যবস্থা করছে। এরই মধ্যে ইতালির অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র মিলানের পার্শ্ববর্তী এক ডজনের মতো শহরের ৫০ হাজারের বেশি বাসিন্দাকে বাইরে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া এসব শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দোকান বন্ধ রাখা হয়েছে। সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার আরো কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জোসেফ কন্তে।

অন্যদিকে ইরানে মরণঘাতী ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে গতকাল ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কিনাউশ জাহানপোর জানান, গতকাল পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে আট। এছাড়া আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৪৩-এ ঠেকেছে।

ইরানের পবিত্র নগরী কোয়ামে প্রথম ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। গতকাল আক্রান্ত হওয়া ১৫ জনের সাতজনই কোয়ামের বাসিন্দা। বাকিরা রাজধানী তেহরানসহ অন্যান্য এলাকার। পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশটির ১৪টি প্রদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। আর প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগে কড়া সতর্কতা অবলম্বন করছে কুয়েত, ইরাকসহ অন্যান্য দেশ।

আর অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যসেবায় ভঙ্গুর অবস্থায় থাকা আফ্রিকাকে নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। মিসরে প্রথমবারের মতো একজনের সংক্রমিত হওয়ার খবর জানার পর জাতিসংঘের সংস্থাটি বলছে, আফ্রিকা মহাদেশটি এমনিতেই খুব ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। এ অবস্থায় নভেল করোনাভাইরাস মোকাবেলায় আফ্রিকা ইউনিয়নকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

ডব্লিউএইচওর প্রধান টেড্রোস অ্যাডহ্যানম মনে করেন, আফ্রিকার অনেক দেশে শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সরঞ্জামের পর্যাপ্ত অভাব রয়েছে, যা ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়লে উদ্বেগের অন্যতম কারণ হবে।