সত্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ

করোনায় ত্রাণ সহায়তার তালিকা নিয়ে অসন্তুষ্ট সরকার

সান বিডি ডেস্ক আপডেট: ২০২০-০৫-১০ ০৮:২১:২৫


দেশে চলমান ভয়ঙ্কর করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে সরকারি ত্রাণ আত্মসাৎ, বিতরণে স্বজনপ্রীতি ও ত্রাণের তালিকায় নাম ওঠাতে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে দেশের নানা প্রান্ত থেকে। এ ধরনের অনিয়মের অভিযোগে এরই মধ্যে বরখাস্তও হয়েছেন অর্ধশতাধিক জনপ্রতিনিধি। তালিকায় নাম ওঠানোর আশ্বাস দিয়ে ঘুষ চাওয়ায় সম্প্রতি গ্রেফতার হয়েছেন কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্য। এ অবস্থায় ত্রাণের জন্য তৈরি করা অসহায় মানুষের তালিকার ১০ শতাংশের সত্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ/মুখ্য ব্যক্তিদের এ সত্যায়নের কাজটি করতে নির্দেশ দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।

এই মহামারিতে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সারা দেশ থেকে ৫০ লাখ মানুষের একটি তালিকা তৈরি করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। তালিকা অনুযায়ী, এসব মানুষকে দেয়া হবে মানবিক সহায়তা কার্ড। এই কার্ড ধরে স্বল্পমূল্যে চালসহ খাদ্য সহযোগিতা এবং নগদ অর্থ সহায়তা দেবে সরকার। এরই মধ্যে মানবিক সহায়তা কার্ডের জন্য জেলা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায় থেকে অসহায় মানুষের তালিকা পাঠানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সিটি করপোরেশন এলাকার অসহায় মানুষদের তালিকা প্রস্তুত করেছেন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তারা। উপজেলাগুলো তালিকা নিয়েছে ইউনিয়ন পরিষদগুলোর কাছ থেকে। পৌরসভার কাছ থেকে তথ্য নিয়েছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন। অর্থাৎ তালিকাটি তৈরি করেছেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য, চেয়ারম্যান, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন কাউন্সিলর ও মেয়ররা। সরকারি সহায়তার জন্য তালিকা প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে বিতরণ পর্যন্ত একাধিক ধাপে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ বেশ পুরনো বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। অভিযোগ রয়েছে, ঘুষের বিনিময়ে তালিকায় নাম ওঠানোর পাশাপাশি স্বজনপ্রীতি, দলীয় কর্মীপ্রীতি করা হচ্ছে। ফলে যাদের জন্য সরকারের এ সহায়তা কার্যক্রম, তাদের একটা বড় অংশই থেকে যাচ্ছে বঞ্চিত।

সরকারি সহায়তা কার্যক্রমে চারটি ধাপে অনিয়ম হয় জানিয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর জানান, সরকার সহায়তা দিচ্ছে খাদ্য। তো খাদ্য কেনার সময় এক দফা অনিয়ম হবে। এসব খাদ্য গুদামজাত করার সময় আরেক দফা অনিয়ম হবে। এই দুই ধাপে অনিয়ম করবেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা। পরের ধাপে ট্রাকে করে খাদ্য পরিবহনের সময় অনিয়ম হবে। গুদাম থেকে বের হওয়ার পর দেখা যাবে অনেক ট্রাক চলে যাবে প্রভাবশালীদের বাড়িতে বা গোপন আস্তানায়। শেষ ধাপে গিয়ে, যারা ত্রাণ বা সহায়তা পাওয়ার যোগ্য না, তারা সেটি পাবেন।

তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই মানবিক সহায়তার তালিকাটি প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি। যারা প্রকৃত অসহায়, সহায়তা কার্ড যেন তারাই পান, সেজন্যই তালিকার তথ্য সত্যায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মানবিক সহায়তা কার্ডে অন্তর্ভুক্তির জন্য অসহায় ব্যক্তি বা পরিবারের প্রধানের নাম, জন্ম তারিখ, সেলফোন নম্বর, বর্তমান ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর এবং আগে কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ছিল কিনা—এসব তথ্য পাঠানো হয়েছে মাঠ পর্যায় থেকে। এসব তথ্যের অন্তত ১০ শতাংশের সত্যতা যাচাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। তবে এ কাজটি মন্ত্রণালয় নয়, মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ/মুখ্য কর্মকর্তাদের মাধ্যমে করানো হবে।

সিটি করপোরেশন এলাকা থেকে পাঠানো তালিকার অন্তত ১০ শতাংশের সত্যতা যাচাই করবেন সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। একইভাবে বিভিন্ন উপজেলা থেকে দুস্থ মানুষের তালিকা সত্যায়ন করবেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। পৌরসভার তালিকার ১০ শতাংশ জেলা প্রশাসক অথবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সত্যায়ন করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের স্বজনপ্রীতি বা রাজনৈতিক মতাদর্শ থেকে বের হয়ে করোনায় কর্মহীন মানুষের তালিকা করতে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের কোনো কোটা দেয়া হয়নি। স্থানীয় কমিটি তালিকাটি তৈরি করেছে। কার্যক্রমে স্বচ্ছতার জন্য কমিটিতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও মসজিদের ইমামকে যুক্ত করা হয় বলে জানান তারা।

প্রশাসন বা জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে তালিকা করলে সেখানে স্বজনপ্রীতি, দলপ্রীতিসহ নানা অভিযোগ আসে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। এজন্য তারা খাদ্যের বদলে নগদ অর্থ সহায়তা দিতে বলছেন। আর এই কাজটি করতে বলছেন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে।

তবে তালিকা প্রস্তুতে অনিয়ম হয়নি বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এনামুর রহমান। তিনি বলেন, এতদিন আমরা সপ্তাহে দুবার করে দরিদ্র মানুষকে সহায়তা দিয়ে আসছিলাম। এই কাজটিই এখন ডাটাবেস আকারে নিয়ে আসা হয়েছে। তালিকা করা ৫০ লাখ পরিবারকে আমরা একবারে ২০ কেজি চাল দিয়ে দেব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও এই তালিকা ধরে তাদের নগদ অর্থ সহায়তা দেবেন। যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করেই এই তালিকাটি তৈরি করা হয়েছে। এতে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি। মাঠ পর্যায় থেকে সঠিক তালিকা এসেছে কিনা, তা যাচাইয়েরও আমরা উদ্যোগ নিয়ে। তালিকার অন্তত ১০ শতাংশ আমরা যাচাই-বাছাই করছি।