৬ চ্যালেঞ্জ নিয়ে নতুন অর্থবছরের যাত্রা শুরু

সান বিডি ডেস্ক প্রকাশ: ২০২০-০৭-০১ ১২:১৮:০৭


করোনার কারণে তালাবদ্ধ হয়ে পড়েছে শহরের ছোট-বড় সব হোটেল-রেস্টুরেন্ট। নিত্যপণ্য ছাড়া সীমিত আকারে লেনদেন চলছে প্রায় ৪০ লাখ পাইকারি ও খুচরা দোকানে। পাশাপাশি মন্দা কাটেনি আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যের খরা চলছেই। এছাড়া উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা বিরাজ করছে। নতুন করে কোনো ধরনের বিনিয়োগ হচ্ছে না।

এমন পরিস্থিতিতে বড় অঙ্কের রাজস্ব আহরণসহ ছয়টি সংকট মোকাবেলা করাই হবে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। অন্য চ্যালেঞ্জগুলো হচ্ছে- বিনিয়োগ বাড়ানো, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো, নতুন করে দারিদ্র্যের হার ঠেকানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ঘোষিত বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা। এসব চ্যালেঞ্জকে সঙ্গী করে আজ নতুন অর্থবছরের (২০২০-২১) যাত্রা শুরু হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, করোনার কারণে নতুন অর্থবছরে বাড়বে অপ্রত্যাশিত ও নির্ধারিত ব্যয়। অপরদিকে সরকারের আয় হবে সীমিত পরিসরে। এ তিনের মধ্যে সমন্বয় করাই হবে কঠিন কাজ। এজন্য আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে প্রতিশ্রুত অর্থ আদায় এবং স্বল্প সুদে ঋণ নিতে সরকারকে বেশি জোর দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

সাবেক সিনিয়র অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ মঙ্গলবার বলেন, রাজস্ব আহরণ হবে অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে সরকারের সীমিত আয়ের মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের ব্যয় ও আসন্ন বন্যায় পুনর্বাসনসহ অন্যান্য ব্যয়ের মধ্যে সমতা আনা কঠিন হবে। এছাড়া সরকারের চলমান প্রকল্প আছে। যেখানে বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নির্ধারিত ব্যয়ের বাইরে অপ্রত্যাশিত অনেক ব্যয় আসবে।

যা সরকারের কোনো পরিকল্পনায় থাকবে না হয়তো। ফলে সীমিত আয় দিয়ে চলমান প্রকল্পের নির্ধারিত ও অপ্রত্যাশিত ব্যয় সমন্বয় করা হবে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতিতে বহির্বিশ্বের দাতা সংস্থাগুলোর কাছে যেসব টাকা পাওয়ার প্রতিশ্রুতি আছে, আর পাইপলাইনে প্রতিশ্রুতির টাকা আছে কিন্তু ছাড় করা হয়নি- এমন অর্থ আনার ক্ষেত্রে বেশি জোর দিতে হবে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ আয়কে বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

জানতে চাইলে সাউথ এশিয়ান নেটওর্য়াক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান  বলেন, করোনার প্রভাবে কর্মসংস্থান স্থবির হয়ে পড়েছে। কাজ হারিয়ে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন অনেকে। অর্থনীতি সক্রিয় করতে হলে চলমান করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি অর্থনীতির বড় খাতগুলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালু করতে হবে।

এছাড়া প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলোকে আরও ভালো ভূমিকা রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, রাজস্ব আদায়সহ অর্থনীতিতে নানা চ্যালেঞ্জ আছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ববান হয়ে ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এর ৩ ভাগের ২ শতাংশও আদায় সম্ভব হবে না। তবে সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এশীয়ন উন্নয়ন ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদে ঋণ নেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশকে এখন থেকে তৎপর হতে হবে।

অন্য অর্থবছরগুলো স্বাভাবিকভাবে যাত্রা শুরু করলেও এবার ভিন্নভাবে সেটি শুরু হতে চলছে। বছরের শুরুতে করোনাভাইরাসের মহামারী নিয়ে যাত্রা শুরু হচ্ছে। সংকট রয়েছে স্বাস্থ্য খাতে। এর বাইরে করোনাকালীন মহামারী মোকাবেলা করতে গিয়ে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশের অর্থনীতির চাকা থেমে গেছে। দীর্ঘ সময় লকডাউনের প্রভাবে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী কর্মহীন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে রফতানি, প্রবাসী আয়, বিনিয়োগ ও রাজস্ব আয়ে ধস নেমেছে।

নতুন অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু ভ্যাট খাত থেকে আদায় করা হবে ১ লাখ ২৫ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। ভ্যাট আসে সাধারণ ব্যবসা-বাণিজ্য ও ভোক্তা থেকে। বর্তমান ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতার কারণে এটি আদায় পুরোপুরি হবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

মন্দা চলছে আমদানি-রফতানিতে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক, কাঠ ও ফার্নিচার এবং চামড়া রফতানি। এসব পণ্যের রফতানি ক্ষতি উঠে এসেছে বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও আংকটাডের প্রতিবেদনে। তবে আংকটাডের প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনাভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত ২০টি দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ।

চীনের মধ্যবর্তী পণ্য রফতানি ২ শতাংশ কমলে যে ২০টি দেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ক্ষতি হচ্ছে এর মধ্যে বাংলাদেশে হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। ফলে এমন পরিস্থিতিতে নতুন অর্থবছরে বড় অঙ্কের যে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা এটি অবাস্তব বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

এদিকে নতুন বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ, যা বর্তমান বাস্তবতায় প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে জিডিপির ২৫ দশমিক ৩ শতাংশ বেসরকারি বিনিয়োগ দরকার। বর্তমানে এ বিনিয়োগ হার হচ্ছে ১২ দশমিক ৭ শতাংশ। কিন্তু আগামী অর্থবছরে বিনিয়োগ আরও হ্রাস পাবে।

নতুন করে বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে না কেউ। এছাড়া বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহ অস্বাভাবিক হারে কমে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আংকটাড। সংস্থাটি বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে যেতে পারে।

এতে ক্ষতির মুখে পড়বে বাংলাদেশও। ফলে।এমন কি জাদু আছে এক বছরে সব পূর্বাভাসকে পাশ কাটিয়ে বিনিয়োগ পৌনে ১৩ শতাংশ বিনিয়োগ বাড়বে। বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে না। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নতুন অর্থবছরে কমবে এমন আভাস আগ থেকে দিয়ে আসছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা।

সর্বশেষ চলতি সপ্তাহে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বলেছে আগামী অর্থবছরে সাড়ে ৭ শতাংশ হতে পারে। এছাড়া দেশে করোনা মহামারীর কারণে লকডাউন জারি হওয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিপাকে পড়েছেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা প্রবাসীদের ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে।

করোনার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমায়ও ওই অঞ্চলের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব দেখা দেওয়ায় তারা অভিবাসী শ্রমিকদের ছাঁটাই করছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ওপর। এতে রেমিটেন্স বা প্রবাসী আয়ে বড় পতনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ)।

এদিকে কৃষি খাতেও এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। পরিবহন স্বল্পতা, ক্রেতার অভাবসহ নানা সমস্যায় কৃষিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে কৃষি খাত চাঙ্গা করতে সরকার সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনাসহ নানা ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এসব প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষি খাত চাঙ্গা করা হবে আরেক চ্যালেঞ্জ।
সানবিডি/ঢাকা/এসএস