হাজারো ভাঙা- গড়া গল্পের সাক্ষী নোবিপ্রবির নীলদিঘী

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আপডেট: ২০২০-০৭-০১ ২১:২৮:২৭


প্রকৃতির মায়া সে যে বড়ই অদ্ভুত! প্রকৃতির মাতাল করা সৌন্দর্য্যে ডুব দিতে কার না ভালো করে! স্বচ্ছ নীল আকাশের নিচে খোলা কোন প্রান্তর মন ভালো করে দেয় সবার। চার দেয়ালের মাঝে বন্দী আত্না আত্নতৃপ্তি খোঁজে প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধে আর মুক্তি খোঁজে খোলা আকাশের নিচে। মন খারাপের দিনে ছোট্ট কোন লেকের পাড় কিংবা দীঘির পাড়ের সঙ্গ পেলে কিন্তু বেশ হয়। সকল ক্যাম্পাসিয়ানদের কাছে তার আপন ক্যাম্পাসটি ধীরে ধীরে প্রাণের ক্যাম্পাস হয়ে উঠে। নিজ ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য্যের স্নিগ্ধতা আঁকড়ে ধরে প্রত্যেককে। তাইতো ছুটির দিনগুলোতে ক্যাম্পাসের আনাচেকানাচের স্মৃতিগুলো ভাবিয়ে তুলে মনকে।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও অন্য সবার মতই আজ ঘরবন্দী। এই অফুরন্ত সময়ে প্রিয় ক্যাম্পাস সাথে প্রিয় জায়গাগুলোর সুখস্মৃতি ভাবিয়ে তুলছে নোবিপ্রবিয়ানদের। “নীলদিঘী” নামটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জরিয়ে আছে প্রত্যেক নোবিপ্রবিয়ান যা কিনা নোবিপ্রবির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র, ক্লাশ কিংবা পরীক্ষা শেষে যেখানে দেখা মিলতো প্রকৃতি ও আড্ডাপ্রেমীদের ।

নীলদিঘীর নীলজলের ঢেউ অনেককে এনে দিত প্রশান্তি, থামিয়ে দিত অনেকের মনের উত্তালতা। সারাদিনের ক্লাশ, ল্যাবের একঘেয়েমিতা কাটিয়ে শান্তির পরশ খুঁজতে অনেকেই ছুটতো নীলদিঘীর পাড়ে। পড়ন্ত বিকেলে জমতো আড্ডা, গিটারের সুরে বসতো গানের আসর। কেউবা প্রেয়সীর টানে ছুটে যেত নতুন কোন গল্প বাঁধতে কিংবা কোন গল্পের ইতি টানতে। আবার অনেক গল্পগুলো ছোট গল্প হয়েই থাকে। ক্যাম্পাসের কপোত-কপোতীদের ভীর সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে এই নীলদিঘীতেই। কতই না স্মৃতি জরিয়ে আছে নীলদিঘীর সারি সারি বেঞ্চ গুলোতে !

বন্ধুদের সাথে খুনসুটি থেকে শুরু করে চড়ুইভাতি, বারবিকিউ পার্টি, জন্মদিন উদযাপন সবকিছুই হয়ে থাকে ১০১ একরের এই ছোট্ট নীলদিঘীকে ঘিরে। শরতের আকাশের মিছিমিছি রোদ-বৃষ্টির খেলা উপভোগ করার আদর্শ স্থান নীলদিঘীর সৃজনঘাট, যেখানে শরতের মেঘের উপর বসে কল্পনারাজ্যে হারিয়ে যাওয়া যায় । আবার, হরেকরকম বৃক্ষের ছায়াতল থেকে রোদ্রৌজ্জল আকাশটা দেখতেও মন্দ লাগে না। অন্যদিকে, সন্ধ্যা নামার বেলায় রঙ-বেরঙের আলোতে এক অন্যরকম সুভাস ছড়ায় নীলদিঘী। তখন চায়ের কাপ হাতে নীলদিঘীর পাড়ে হাটতে দেখা যায় সৌন্দর্য্যবিলাসীদের। মনোমুগ্ধকর এই পরিবেশ নিমিষেই চাঙা করে দেয় মনকে।

বাংলাদেশ এন্ড লিবারেশন ওয়ার স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী হিমেল শাহরিয়ার বলেন, ক্লাসের আগে অবসর ক্ষনিক সময়ে, দুই ক্লাসের ফাঁকে, দুপুর বেলার বিরতিতে বন্ধু -বান্ধবের আড্ডার জায়গা নোবিপ্রবির নীলদিঘী। কখনো চড়ুইভাতি উৎসব শেষ বিকেলে কপোত- কপোতীর মিলন, সন্ধ্যায় গানের আসর আর রাতে বারবিকিউ পার্টিতে মুখরিত থাকে ক্যাম্পাসের সকলের প্রিয় এই জায়গাটি। আবার কখনো সাহিত্য, সাংস্কৃতিক ও সেচ্ছাসেবী সংগঠন সমূহের মিটিং কখনো বা কারো জন্মদিন উৎসব পালনে সর্বদা ব্যস্ত থাকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নীদদিঘী প্রাঙ্গন। এটি আমাদের ক্যাম্পাসের সবচেয়ে ঐশ্বর্যমন্ডিত স্থান। বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট এমন কেউ নেই যার কোন স্মৃতি জড়িত নেই এই স্থানে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব স্মৃতি বারবার সামনে ভাসে নীলদিঘীর গল্পে মেশানো স্মৃতিসমূহ তারমধ্যে অন্যতম। যতদিন শিক্ষার্থীরা এই ক্যাম্পাসে আসতে থাকবে নীলদিঘীকে ঘিরে গল্প বাড়তে থাকবে। ভালো থাকুক প্রিয় ক্যাম্পাস, নিজস্ব সাজে সুন্দর থেকে আরো সুন্দর হয়ে উঠুক প্রিয় দীঘী প্রাঙ্গন, পরিনত হোক হাজারো গল্পের সেরা স্থানে।

ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী বায়েজীদুল ইসলাম মজুমদার বলেন, নীল দিঘীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য হলো প্রতিদিন সন্ধ্যা নামার সাথে সেন্ট্রাল ফিল্ডে ফুটবল খেলে এসে সবার একসাথে ঝাঁপিয়ে পরাটা। কখনও শিক্ষার্থীরা আবার কখনও শিক্ষকরা। আর মাঝেমাঝে তো দুইয়ে এক হয়ে যায়। বিকালের কপোত কপোতিদের খুনশুটি তো যে কোন সিঙ্গেলের মনে আগুন ছড়িয়ে দিতে বাধ্য করে। আর একটা দেখার মত দৃশ্য হলো জুনিয়র ব্যাচগুলোর ক্লাসের সবাইকে নিয়ে উত্তর পাশের পুরো সিঁড়ি জুড়ে আড্ডায় বসাটা। এই দৃশ্যটা ক্যাম্পাসের কাশফুল আর সূর্যমুখী ফুলের মত মৌসুমি দৃশ্য। জানুয়ারি ফেব্রুয়ারিতে দেখা যায় শুধু।

ইনফরমেশন সায়েন্স এন্ড লাইব্রেরী ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী মিরাজ হোসেন হৃদয় বলেন, নীলদিঘী নোবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের কাছে সত্যিকারের স্বর্গ। ক্লাশের ক্লান্তি, পরীক্ষার ব্যার্থতায় পর্যবসিত হওয়ার পর অবিরাম স্বস্তির জায়গা এই নীলদিঘী। শত প্রেমের উপক্ষান রচিত হওয়া,অভিমান ভাঙ্গানো এবং বন্ধুদের জন্মদিনের উৎসব সবকিছুর এক অনবদ্য জায়গা আমাদের নীলদিঘী। ছোট্ট একটি জায়গা এতসহজে এত আপন হয়ে উঠবে ভাবতেই পারিনি। করোনাকালীন ঘরবন্দী হয়ে নীলদিঘীকে কতটা মিস করছি সেটা আসলে বলে বোঝানো যাবে না। প্রতিদিন স্মৃতির পাতায় ঘুরে আসি প্রিয় ক্যাম্পাসের প্রিয় জায়গাগুলো ছুঁয়ে দেখার জন্য।

ছবিঃ শাহরিয়ার আহমেদ সিয়াম