করোনা সংক্রমণ রুখতে নিউজিল্যান্ডের এত সফলতার কারণ

সান বিডি ডেস্ক প্রকাশ: ২০২০-০৭-১২ ১৩:২১:২০


 

করোনাভাইরাসে যখন পুরো পৃথিবী বিপর্যস্ত তখন নিউজিল্যান্ডের সাফল্য চমকপ্রদ। দেশটিতে গত জুনের শেষ দিকে মাত্র দুইজনের দেহে করোনা শনাক্ত হয়েছে। তারা লকডাউন অমান্য করেছিলেন বলে দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। তার আগের ২০ দিন কোনো করোনা রোগী পাওয়া যায়নি। নিউজিল্যান্ডে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৫৪৪ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। ভাইরাসটিতে দেশটির মাত্র ২২ জন মারা গেছে।

পৃথিবীব্যাপী এখন যে প্রশ্নটি উঠেছে তা হলো করোনা মোকাবিলায় নিউজিল্যান্ড এতটা সফল কী করে হলো? আর সে উত্তরই খোঁজার চেষ্টা করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

নিউজিল্যান্ড কবে সীমান্ত বন্ধ করেছিল?

গত ফেব্রুয়ারিতে চীনের বাইরে ফিলিপাইনে প্রথম করোনাভাইরাস ধরা পরে। নিউজিল্যান্ডে তখন করোনার লেশমাত্র না থাকলেও তার পরদিন থেকেই চীন থেকে বা চীন হয়ে আসা সব বিদেশির প্রবেশ নিষিদ্ধ করে নিউজিল্যান্ড। এ ছাড়া নিউজিল্যান্ডের কোনো নাগরিক চীন থেকে দেশে ফিরলেই তাকে ১৪ দিন আইসোলেশনে থাকতে হতো।

নিউজিল্যান্ড প্রথমে ইরানের সঙ্গে বিমান চলাচলা বন্ধ করে। এরপর একে একে উত্তর ইতালি ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আসা যাত্রী এবং সংক্রমণ লক্ষণ দেখা যাচ্ছে এমন যে কারও ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি হলো। মার্চের ১৬ তারিখ থেকে নিউজিল্যান্ডে আগমনকারী নাগরিক-বিদেশি নির্বিশেষে সবার জন্য দেশটিতে অবতরণের পর আইসোলেশন বাধ্যতামূলক করা হয়। তবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর নাগরিকদের জন্য এ নিয়ম শিথিল করা হয় কারণ তখন সেখানে করোনাভাইরাস প্রায় ছড়ায়নি বলা যায়।

বিধি-নিষেধ নিয়ে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন বলেছিলেন, ‘এটা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে কঠোর বিধিনিষেধ, যে জন্য তিনি কারও কাছে দুঃখ প্রকাশ করবেন না।’

এরপর তিনি এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিলেন। তিনি নিউজিল্যান্ডের নাগরিক বা বাসিন্দা নন- এরকম প্রায় সবার জন্যই দেশটির সীমান্ত বন্ধ করে দিলেন।

নিউজিল্যান্ডের ম্যাসি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মার্টিন বেরকা বলেন, ‘যখন সারা বিশ্বে সংক্রমণ ছিল মাত্র কয়েক হাজার, সে সময়ই এমন পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে নিউজিল্যান্ডের পক্ষে দেশের জনগণের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া ঠেকিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।’

আগেই করোনা নির্মূলের পরিকল্পনা

নিউজিল্যান্ডে শীর্ষস্থানীয় সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মাইকেল বেকার বলেন, ‘মার্চ মাসের মাঝামাঝি এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে সাধারণ ফ্লু মহামারির কর্মপরিকল্পনা দিয়ে এই নতুন করোনাভাইরাস ঠেকানো যাবে না।’

তিনি বলেন, ‘চীনের উহান শহরের লকডাউনের সাফল্যের ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক রিপোর্টে এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে নিউজিল্যান্ডকে শুরু থেকেই সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিতে হবে এবং তার উদ্দেশ্য হতে হবে ভাইরাসটি একেবারে উচ্ছেদ করা।’

নিউজিল্যান্ডে গত মার্চের শেষ দিকে নাগরিকদের দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়। নিউজিল্যান্ডে জারি করা হয় চার-স্তর বিশিষ্ট এক সতর্কতা ব্যবস্থা। মার্চ মাসের ২৫ তারিখ এই হুঁশিয়ারি চতুর্থ স্তরে উন্নীত করা হয়। এর আওতায় জারি করা হয় দেশব্যাপী এক সার্বিক লকডাউন, সবাইকে বাড়িতে থাকতে বলা হয়। শুধুমাত্র জরুরি সেবাসমূহ চালু থাকে।

পর্যাপ্ত টেস্ট আর কনট্যাক্ট ট্রেসিং

নিউজিল্যান্ডে লকডাউনের সময় ব্যাপকভাবে টেস্ট ও কনট্যাক্ট ট্রেসিংএর এক কর্মসূচি কার্যকর করা হয়। দেশটি এখন প্রতিদিন ১০ হাজার টেস্ট করাতে পারছে এবং কোনো সংক্রমিত ব্যক্তি চিহ্নিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সংস্পর্শে আসা লোকদের আইসোলেশনে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছে।

করোনা মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) নিউজিল্যান্ডের প্রশংসা করে তাদেরকে অন্য দেশের জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরেছে।

তবে করোনা মোকাবিলার পদ্ধতি নিয়ে নিউজিল্যান্ডের সমালোচনাও হয়েছে। লকডাউনের প্রথমদিকে যে রাজনৈতিক ঐকমত্য ছিল তাতে ফাটল ধরতে শুরু করে।

তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা সাইমন ব্রিজেস লকডাউনের ফলে অর্থনীতি এবং মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতির কথা তুলে ধরে বলেন, ‘এ ক্ষতি লকডাউন না থাকলে যে ক্ষতি হতো তার চেয়ে বেশি।’

নিউজিল্যাণ্ডে লকডাউন ভাঙার জন্য পুলিশ যে শত শত লোককে অভিযুক্ত করে। আর এ বিষয়টি দেশটির ৮০ শতাংশ লোকই সমর্থন করেছে।
সানবিডি/ঢাকা/এসএস