বিয়ের গুরুত্ব ও উপকারিতা:মুফতি নূর মুহাম্মদ রাহমানী
:: প্রকাশ: ২০২০-০৭-১৭ ১১:১৮:০৪
বিয়ে মানুষের প্রাকৃতিক প্রয়োজন। স্বভাগত পরিচ্ছন্নতা, মানসিক ভারসাম্য, চারিত্রিক উৎকর্ষতা ও পবিত্রতার অন্যতম উপায়। ফিতরাতের ধর্ম ইসলামও দিয়েছে এর প্রতি যারপরনাই গুরুত্ব। সৃষ্টিগতভাবেই নারী ছাড়া পুরুষ এবং পুরুষ ছাড়া নারীর জীবন অসম্পূর্ণ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তার এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই মধ্য হতে স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে গিয়ে শান্তি লাভ করো এবং তিনি তোমাদের পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এর ভেতর নিদর্শন আছে সেই সব লোকের জন্য, যারা চিন্তা-ভাবনা করে।’ (সূরা রূম : ২১) বিয়ের মাধ্যমে শুধুমাত্র জৈবিক চাহিদাই পুরা হয় না; বরং অন্তরের প্রশান্তি মানসিক প্রশান্তিসহ সব রকমের প্রশান্তি অর্জিত হয় এতে সহজতরভাবে। এ প্রসঙ্গে স্বভাজাত প্রয়োজনীয় হওয়া সত্ত্বেও যদি পুরুষ বিয়ে থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টায় থাকে তখন তাকে ভয়ানক ফলাফলের সম্মুখীন হতে হয়। বিয়ে ব্যতীরেকে জীবনশৃঙ্খলা ল-ভ- হয়ে যায়।
দৃষ্টি ও লজ্জাস্থান হেফাজতের মাধ্যম বিয়ে : হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের বর্ণনায় রাসূল (সা.) বলেন, ‘হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মাঝে যারা বিয়ে করতে সক্ষম তারা যেন বিয়ে করে নেয়। কারণ বিয়ে দৃষ্টি অবনত রাখতে এবং লজ্জাস্থানের পবিত্রতায় অধিক সহায়ক। আর যে বিয়ে করতে সক্ষম নয় সে যেন রোজা রাখে। কেননা রোজা তার যৌনবাসনাকে দমিত করবে।’ (সহিহ বুখারি ২/৭৫৮) হাদিসটিতে উম্মতের যুবদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে এবং তাদেরকে বিয়ের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। সাথে সাথে বিয়ের দু‘টি বড় উপকারিতার কথা বলা হয়েছে। ১. দৃষ্টির হেফাজত। ২. লজ্জাস্থানের হেফাজত। এ দু‘টি ফেতনা-ফ্যাসাদের বড় মাধ্যম। অশ্লীলতার সবগুলো দিকের সূত্র দৃষ্টি থেকে আরম্ভ হয়ে অপকর্মের রূপ নেয়। বিয়ের মাধ্যমে এ সব অশ্লীলতার মূলোৎপাটন হয়ে যায়। ফেতনার অনেক বড় দরজা হয়ে যায় তালাবদ্ধ। এক স্থানে নবীজি (সা.) বলেন, ‘আমার পরে আমার উম্মতের পুরুষদের নারীদের চেয়ে ভয়ঙ্কর কোনো ফেতনা হবে না।’ (মিশকাত) নিশ্চিতভাবে এ ফেতনা থেকে বাঁচতেও বিয়ে করা জরুরি। যার দ্বারা ফেতনাটি নিজে নিজেই খতম হয়ে যাবে। ঈমানের রাস্তা খুলে যাবে।
বিয়ে ঈমানের অর্ধেক : নবি কারিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি যখন বিয়ে করল তখন সে দ্বীনের অর্ধেকটা পূর্ণ করে ফেলল। এখন সে যেন বাকি অর্ধাংশের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে।’ (মিশকাতুল মাসাবিহ ২/২৬৮) একজন মুসলমানের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো ঈমান। আর বিয়ে মূল্যবান এই সম্পদের হেফাজতের উত্তম মাধ্যম।
বৈরাগ্যতার স্থান নেই ইসলামে : ইসলাম জীবনমুখী ধর্ম। বৈরাগ্যতার স্থান নেই এতে। একবার কিছু সাহাবি নবীজি (সা.) এর কাছে তাদের যৌনবাসনাকে খতম করে দিতে অনুমতি চাইলে তিনি তাদেরকে এটা করতে নিষেধ করে দিলেন এবং বিয়ে না করাকে জীবন থেকে পলায়ন করা আখ্যা দিলেন। এজন্য ইসলাম জীবন থেকে পলায়ন করাকে অপছন্দ ঘোষণা করেছে। নবী কারিম (সা.) বলেন, মানুষের কি হলো? তারা এমন এমন কথা বলে। কিন্তু আমি নামাজ পড়ি এবং ঘুমাই, নফল রোজা রাখি, আবার কখনও রাখি না। আবার বিয়ে-শাদীও করি। অতএব যে ব্যক্তি আমার সুন্নত হতে মুখ ফিরিয়ে নিবে সে আমার উম্মতের অন্তর্ভূক্ত নয়।’ ( সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৪০১)
বিয়ে শুদ্ধভাবে বংশধারা টিকিয়ে রাখে : বিয়ে শুধুমাত্র বনি আদমের বংশধারাই ঠিক রাখে না, বরং বংশ ধারাবাহিকতার সাথে সাথে সহিহ-শুদ্ধ তরিকায় বংশের বৃদ্ধি ঘটায়। বংশের মধ্যে যে কোনো ধরনের বিচ্ছিন্নতাকে অপছন্দ করে। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনের ঘোষণা : ‘তিনিই পানি দ্বারা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তাকে বংশগত ও বৈবাহিক আত্মীয়তা দান করেছেন। তোমার প্রতিপালক সর্বশক্তিমান।’ (সূরা ফুরকান : ৫৪)
বিয়ের মাধ্যমে স্বচ্ছলতা আসে : বিয়ের মাধ্যমে স্বচ্ছলতা আসে এটি একটি পরীক্ষিত বিষয়। তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত (তারা পুরুষ হোক বা নারী) তাদের বিয়ে সম্পাদন করো এবং তোমাদের গোলাম ও বাদীদের মধ্যে যারা বিয়ের উপযুক্ত, তাদেরও। যদি নিঃস্ব হয়, তাহলে আল্লাহ (বিয়ের বরকতে) নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে সচ্ছলতা দান করবেন। আল্লাহ বড় প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সূরা নূও : ৩২) এ আয়াত দ্বারা পরিষ্কার বুঝা গেলো, আগে বিয়ে তারপর স্বচ্ছলতা। কিন্তু এই সহজ বিষয়টি আমরা বুঝতে চেষ্টা করি না। আমরা বরং মনে করি একটা পরিমাণ অর্থ-কড়ি না থাকলে বিয়ে অসম্ভব। কোরআন তাদের এ ধারণাকে ভুল ঘোষণা করেছে।
বিয়ের সঠিক সময় : প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরেই বিয়ের প্রয়োজন অনুভূত হয়। মানুষের শরীর এ প্রয়োজনের এতটাই চাহিদা রাখে, যেমন মানুষের শরীর পানি এবং খাদ্যের চাহিদা রাখে। মৌলিক প্রয়োজনকে যেমন স্থগিত রাখা বিবেক বিরোধী ঠিক তেমন প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বিয়েকে দেরি করা এতটাই চিন্তার দৈন্যতা। শারীরিক ও আর্থিক সক্ষমতার দিক থেকে বিয়ের যোগ্য হলে এবং জৈবিক চাহিদা প্রবল হলে বিয়ে করা ফরজ হয়ে যায়।
বিয়ে যে কোনো বয়সে করা যায়। বয়সের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই ইসলামে। অবশ্য ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণিত একটি হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর (যত তাড়াতাড়ি পারা যায়) সন্তানাদিকে বিয়ে করিয়ে দেওয়া। পিতা যদি বিয়ে না করায় ফলে সন্তান কোনো অপকর্মে লিপ্ত হয়ে যায় তখন ত্রুটির কারণে পিতাও গোনাহগার হবে।’ (মিশকাত, হাদিস : ৩১৩৮)
বিয়ে না করার পরিণতি : নবি আকরাম (সা.) বলেন, ‘দ্বীনদারি ও চারিত্রিক দিক বিবেচনায় তোমাদের পছন্দ হয়, এমন ব্যক্তি তোমাদের নিকট বিয়ের প্রস্তাব দিলে (উপযুক্ত পাত্রীকে) তার সাথে বিয়ে দিয়ে দাও। যদি বিয়ে না দাও, তাহলে সমাজে বিরাট ফেতনা ও ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিবে।’ (সুনানে তিরমিজি ১/২০৭)
বিয়ের ব্যাপারে পূর্বসূরীদের সতর্কতা : ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, তাঁর স্ত্রী মৃত্যুর দ্বিতীয় দিনেই তিনি আরেকটি বিয়ে করে ফেলেন। যাতে মন-মস্তিষ্কে কোনো রকম প্রভাব না ফেলে। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘বিয়ে ছাড়া আবেদের ইবাদত পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।’
ব্যভিচারের রাস্তা বন্ধ করতে বিয়েকে সহজ করতে হবে : হাদিস শরিফে এসেছে : হজরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, স্বল্প খরচের বিয়ে সর্বাপেক্ষা বরকতময়। (বায়হাকি ফি শুআবিল ঈমান, হাদিস : ৬৫৬৬) হাদিসে দেখা যাচ্ছে বিয়েতে কম খরচ করাকে রাসূল (সা.) বরকতময় বলেছেন। অথচ বর্তমানে মানুষ বিয়েকে কত কঠিন করে ফেলেছে। এই কঠিন করে ফেলার কারণেই সমাজে ব্যভিচারের রাস্তা খুলে গেছে।
লেখক :মুফতি নূর মুহাম্মদ রাহমানী
মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলূম বাগে জান্নাত
৪৩ নবাব সলিমুল্লাহ রোড, চাষাড়া, নারায়ণগঞ্জ সদর, নারায়ণগঞ্জ
মোবাইল: ০১৯৪৫-৫৮৬৪২২






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













