মূলধন ঘাটতিতে ১১ ব্যাংক

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি || প্রকাশ: ২০২১-০৬-০৮ ১১:২৩:০২ || আপডেট: ২০২১-০৬-০৮ ১১:২৩:০২

ব্যাংকগুলো গ্রাহক থেকে আমানত নিয়ে ঋণ প্রদান করে। সেই ঋণ খেলাপি হয়ে পড়লে সেই অনুপাতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হয়। আবার খারাপ ঋণের ওপর অতিরিক্ত মূলধন রাখার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। তবে করোনার বছরে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমলেও মূলধন সংরক্ষণ পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। চলতি বছরের মার্চ শেষে সরকারি-বেসরকারি ১১ ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে।

করোনার কারণে ব্যাংকগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ধরে রাখতে গত বছর থেকে লভ্যাংশ ঘোষণার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ দেওয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাই এ বছর যেসব ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে আছে সেসব ব্যাংক লভ্যাংশও দিতে পারবে না।

মূলধন ঘাটতি সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে দুর্বল হয়ে পরে। পুরো অর্থনীতিতেই বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা থাকে। বিদেশি বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে ঘাটতির মুখে পড়া ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বিদেশি ব্যাংকগুলো লেনদেন করতে আস্থার সংকট দেখা দেয়। এতে পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে গ্যারান্টি হিসেবে তাদের বাড়তি ফি দিতে হয়, যার প্রভাবের ব্যবসা ব্যয় বেড়ে যায়।
বাজেট থেকে বারবার অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও মূলধন ঘাটতি বেড়েই চলেছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর।

গত কয়েক বছরে বাজেট থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার ওপরে সরকারি ব্যাংকগুলোকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে ঘুরেফিরে সরকারি ব্যাংকগুলোতে মূলধন ঘাটতি থাকছে। এসব ব্যাংকে জনগণের করের টাকায় বারবার মূলধন জোগান দেওয়ায় বিভিন্ন মহলে সমালোচনা রয়েছে।

গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০টি ব্যাংক মূলধন ঘাটতি পরেছিল। এসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা। তবে তিন মাসে কিছুটা কমলেও যোগ হয়েছে আরও একটি ব্যাংক। এখন ঘাটতিতে থাকা মোট ১১টি ব্যাংকের চলতি বছরের মার্চ শেষে পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশে ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফরাস উদ্দিন বলেন, গত বছরের ডিসেম্বর চেয়ে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকগুলো রিকভারি করেছে চার হাজার কোটি টাকার উপরে। আমি মনে করি ক্রমান্বয়ে মূলধন ঘাটতি কমে আসবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযাই দেখা গেছে, চলতি বছরের মার্চ শেষে ১১ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি ৭টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ২১ হাজার ৬৮ কোটি টাকা। সরকারি ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১১ হাজার ২২৯ কোটি টাকা বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা ঘাটতি সোনালী ব্যাংকের। অগ্রণী ব্যাংক মার্চ শেষে ২ হাজার ৯২১ কোটি টাকার ঘাটতিতে পড়েছে। বেসিকের ঘাটতি ১ হাজার ৭১ কোটি টাকা। রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে ১ হাজার ৫১৮ কোটি ও রূপালী ব্যাংকে ঘাটতি রয়েছে ৭৬১ কোটি টাকা।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি ১ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে ১ হাজার ৫১ কোটি টাকা ও পদ্মা ব্যাংকে ৩৮২ কোটি টাকা। আরব বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০১ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে।

সরকারি ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১১ হাজার ২২৯ কোটি টাকা বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের। এ বিষয়ে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলী হোসেন প্রধানিয়া বলেন, আমরা ঋণ দিতে হয় ৯ শতাংশ সুদে। ৪ শতাংশ সুদেও কিছু ঋণ দেওয়া হয়। তবে এ সুদের হার আমাদের কষ্টিং ফান্ডের চেয়ে অনেক কম এর ফলে এত বেশি মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

তিনি বলেন, এ মুলধন ঘটাতি থেকে উত্তরণ হতে ইতমধ্যে আমাদের পরিকল্পনা সরকারের কাছে তুলে ধরেছি। আমরা সরকারি বন্ড চেয়েছি। সম্প্রতি সরকারে ঘোষিত বাজেট ছিল কৃষি বান্ধব। আমরা আশা করি এ বাজেটে আমাদের সমস্যা উত্তরণে ভালো কিছু থাকবে।

আন্তর্জাতিক ব্যাসেল-৩ নীতিমালা অনুযায়ী, ঝুঁকি বিবেচনায় ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। বর্তমান নিয়মে একটি ব্যাংকের মোট ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশ অথবা ৪০০ কোটি টাকার মধ্যে যেটি বেশি, সেটি ন্যূনতম পরিমাণ হিসাবে মূলধন রাখতে হয়। কোনো ব্যাংক এ পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণে ব্যর্থ হলে মূলধন ঘাটতি হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

এদিকে ২০১৬ সাল থেকে ক্যাপিটাল কনজারভেশন বাফার বা আপৎকালীন সুরক্ষা সঞ্চয় হিসাবে ব্যাংকগুলোকে অতিরিক্ত মূলধন রাখতে হচ্ছে। ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়নের আওতায় ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে শূন্য দশমিক ৬২, ২০১৭ সালে ১ দশমিক ২৫, ২০১৮ সালে ১ দশমিক ৮৭ ও ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে এই বাড়তি পুঁজি সংরক্ষণ করার নির্দেশনা ছিল। এভাবে ন্যূনতম মূলধন এবং সংস্থান বজায় রেখে ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার হারের লক্ষ্যমাত্রা যথাক্রমে ১০ দশমিক ৬২, ১১ দশমিক ২৫, ১১ দশমিক ৮৭ ও ১২ দশমিক ৫০ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলা ছিল।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •