ব্যাংক খাতে লাগামহীন খেলাপি ঋণ

:: সাখাওয়াত প্রিন্স || প্রকাশ: ২০২১-০৬-১৫ ১৮:৫৮:৩৭ || আপডেট: ২০২১-০৬-১৫ ১৯:০১:০৩

করোনা ভাইরাসের প্রভাবে সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক মন্দায় বাংলাদেশেও বিরাট বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। দেশের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে বিনিয়োগে নানা ধরনের সুবিধা দিয়েছে সরকার। কোভিড এ পরিস্থিতিকালীন ঋণ গ্রহীতাদের ঋণের টাকা পরিশোধ এর নানা সুযোগ প্রদান করলেও খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে পারছে না সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাস শেষে দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি বা মন্দ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৫ হাজার ৮৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের মার্চে শেষে ব্যাংকিং খাতের মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৭৭ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ৯৫ হাজার ৮৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ। কিন্তু তিন মাস আগেও গত ডিসেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ ছিল ৮৮ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। সেই হিসাবে বছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। আর গত বছরের মার্চের তুলনায় খেলাপি বেড়েছে দুই হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা।এর আগে ২০২০ সালের মার্চে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯২ হাজার ৫১০ কোটি টাকা।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে ঋণগ্রহীতা তাঁর ঋণের কিস্তি শোধ না করলেও তাকে খেলাপির তালিকায় দেখানো যাবে না, পুরো ২০২০ সাল এমন সুবিধা পেয়েছেন ঋণ গ্রাহীতারা। এছাড়া খেলাপি ঋণ পুনঃ তফসিল, পুন:গঠনে বিভিন্ন নীতিমালার শর্ত শিথিলতা আনা হয়। এতে করে গত এক বছরে ঋণের কিস্তি না দিয়েও নতুন করে কোনো ঋণ খেলাপি হয়নি। তবে এ সুবিধা এখন সরাসরি ঋণ পরিশোধ না করার সুবিধা থাকলেও কিস্তির মাধ্যমে ঋণ পরিশোধসহ বেশ কিছু সুবিধা দেয়া হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, ২০২১ সালের মার্চ শেষে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপির পরিমান দাড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ১৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

বেসরকারি ব্যাংকগুলো খেলাপি মোট ঋণের ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ বা ৪৫ হাজার ৯০ কোটি টাকা। বিদেশী ব্যাংকের খেলাপি হয়েছে ২ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা যা মোট ঋণের ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ। এছাড়া বিশেষায়িত তিনটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ হয়েছে ৪ হাজার ৮৬ কোটি টাকা। এ অংক বিতরণ করা ঋণের ১৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ঋণ খেলাপির শীর্ষে রয়েছে জনতা ব্যাংক। মার্চ মাস শেষে ব্যাংকটির মোট ঋণের ১৩ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা বা ২৩ শতাংশ খেলাপি। বেসরকারি ব্যাংকের টাকার অংকে সবচেয়ে বেশি খেলাপি এবি ব্যাংকের চার হাজার ৬০৭ বা প্রায় ১৭ শতাংশ। বিদেশি খাতের সব চেয়ে বেশি খেলাপি ন্যাশনাল ব্যাংক অফ পাকিস্তানের। তাদের মোট ঋনের প্রায় ৯৮ শতাংশ বা ১৩৫৯ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি।

এদিকে খেলাপিদের জন্য বরাবরই বিশেষ সুবিধা দিয়ে আসছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত বছরে ঋণ পরিশোধ না করেও বিশেষ সুবিধায় যাঁরা খেলাপি হননি, তাঁদের জন্য নতুন করে সুবিধা দিয়ে গত ২৪ মার্চ সার্কুলার জারি করা হয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব চলমান ঋণের মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে এবং নতুন করে নবায়ন করা হয়নি, এসব ঋণের শুধু সুদ পরিশোধ করলেই ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত নিয়মিত রাখতে হবে।

এছাড়া যেসব গ্রাহকের ২০২০ সালের সুদ বকেয়া রয়েছে তাদের চলতি বছরের মার্চ থেকে আগামী বছরের জুনের মধ্যে ৬টি কিস্তির ত্রৈমাসিক কিস্তির মাধ্যমে পরিশোধ করতে পারবেন। একই সঙ্গে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত যে সুদ আসে, তা–ও ত্রৈমাসিক কিস্তির মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে। আগে চলমান ঋণের কিস্তি প্রতি মাসে পরিশোধ করতে হতো। এ ছাড়া তলবি ঋণ চলতি মার্চ থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮টি ত্রৈমাসিক কিস্তিতে পরিশোধ করা যাবে। এভাবে শোধ হলে খেলাপি করা যাবে না।

সানবিডি/এএ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •