প্রভিশন ঘাটতিতে ১১ ব্যাংক

:: সাখাওয়াত প্রিন্স || প্রকাশ: ২০২১-০৬-১৬ ২১:১৩:১৭ || আপডেট: ২০২১-০৬-১৬ ২১:১৬:৩৮

আমানতের সুরক্ষাকল্পে এবং ব্যাংকের আগ্রাসী বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণে খেলাপিসহ ঋণমানের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সংরক্ষণ করতে হয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। অধিকাংশ ব্যাংক এ নিয়ম পুরোপুরি অনুসরণ করতে পারলেও ব্যার্থ ১১ ব্যাংক। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি ও বেসরকারি ব্যাংক রয়েছে ছয়টি আর বিশেষায়িত একটি ব্যাংক।

এসব ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ ১২ হাজার ৬৪৯কোটি টাকা। তবে এ সময়ে অন্য কয়েকটি ব্যাংকের প্রভিশন উদ্বৃত্ত থাকায় সার্বিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২৫৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের (ডিসেম্বর-মার্চ প্রান্তিক) হালনাগাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনায় উঠে এসেছে এসব তথ্য।

জানা গেছে, মূলত যে ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেশি সে ব্যাংকে প্রভিশন ঘাটতিও বেশি। যদিও নানা উপায়ে প্রভিশন ঘাটতি থেকেও অনেক ব্যাংক বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ডিসেম্বর শেষে ১০ শতাংশ বা তার চেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে ১৫ ব্যাংকের।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবার ওপরে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। মার্চ শেষে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি তিন হাজার ৫৬৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।

এই সময় পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ১৩ হাজার ৫৭০ কোটি ৮১ লাখ টাকা। যা বিতরণ করা ঋণের ২৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এছাড়া প্রভিশন ঘাটতির তালিকায় রয়েছে বেসিক ব্যাংক ৩৫৬৫ কোটি টাকা, অগ্রণী ১৩৫৬ কোটি টাকা, রূপালী ৭৮৮ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ৪৫১ কোটি টাকা, ঢাকা ব্যাংক ২৪৬ কোটি টাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ১৯৫ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ৭৩ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংক ৩৮৮, স্টান্ডার্ড ব্যাংক ১৫৭ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ১৬৪ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকগুলো প্রভিশন ঘাটতে থেকে বেড়িয়ে আসতে হলে পুরাতন সকল ক্লাসিফাইউ লোন আছে সেগুলো আদায় করতে হবে অথবা পুন তফঃশিল করতে হবে। এছাড়া নতুন ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে সঠিক যায়গায় বিনিয়োগ করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নিয়োমিত পর্যবেক্ষণে রাখছে। এই খেলাপি ঋণগুলো আদায়ের মাধ্যমে প্রভিশন ঘাটতি, মুলধন ঘাটতিসহ সকল ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের দিকনির্দেশনা রয়েছে। তবে ভালো দিক হলো খেলাপি ঋণের পরিমাণ ওয়ান ডিজিটে।

ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং নিয়ে তিন মাস পরপর প্রতিবেদন তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিবেদনটি মঙ্গলবার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় গভর্নর। এতে দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ৬০টি ব্যাংক ১১ লাখ ৭৭ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৫ হাজার ৮৫ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৮.০৭ শতাংশ।

তিন মাস আগে গত ডিসেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ ছিল ৮৮ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। সেই হিসাবে বছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। আর গত বছরের মার্চের তুলনায় খেলাপি বেড়েছে দুই হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। এর আগে ২০২০ সালের মার্চে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯২ হাজার ৫১০ কোটি টাকা।

এদিকে সবচেয়ে বেশি প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে জনতা ব্যাংক। এ বিষয়ে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুছ ছালাম আজাদকে একাধিকবার মোবাইল ফোনে কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। এছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংকের এমডিকে মোবাইল ফোনে কল দিলে তিনিও রিসিভ করেননি।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে ঋণগ্রহীতা তাঁর ঋণের কিস্তি শোধ না করলেও তাকে খেলাপির তালিকায় দেখানো যাবে না, পুরো ২০২০ সাল এমন সুবিধা পেয়েছেন ঋণ গ্রাহীতারা। এছাড়া খেলাপি ঋণ পুনঃ তফসিল, পুন:গঠনে বিভিন্ন নীতিমালার শর্ত শিথিলতা আনা হয়। এতে করে গত এক বছরে ঋণের কিস্তি না দিয়েও নতুন করে কোনো ঋণ খেলাপি হয়নি। তবে এ সুবিধা এখন সরাসরি ঋণ পরিশোধ না করার সুবিধা থাকলেও কিস্তির মাধ্যমে ঋণ পরিশোধসহ বেশ কিছু সুবিধা দেয়া হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, ২০২১ সালের মার্চ শেষে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপির পরিমাণ দাড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ১৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

বেসরকারি ব্যাংকগুলো খেলাপি মোট ঋণের ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ বা ৪৫ হাজার ৯০ কোটি টাকা। বিদেশী ব্যাংকের খেলাপি হয়েছে ২ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা যা মোট ঋণের ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ। এছাড়া বিশেষায়িত তিনটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ হয়েছে ৪ হাজার ৮৬ কোটি টাকা। এ অংক বিতরণ করা ঋণের ১৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ঋণ খেলাপির শীর্ষে রয়েছে জনতা ব্যাংক। মার্চ মাস শেষে ব্যাংকটির মোট ঋণের ১৩ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা বা ২৩ শতাংশ খেলাপি। বেসরকারি ব্যাংকের টাকার অংকে সবচেয়ে বেশি খেলাপি এবি ব্যাংকের চার হাজার ৬০৭ বা প্রায় ১৭ শতাংশ। বিদেশি খাতের সব চেয়ে বেশি খেলাপি ন্যাশনাল ব্যাংক অফ পাকিস্তানের। তাদের মোট ঋনের প্রায় ৯৮ শতাংশ বা ১৩৫৯ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি।

এদিকে খেলাপিদের জন্য বরাবরই বিশেষ সুবিধা দিয়ে আসছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত বছরে ঋণ পরিশোধ না করেও বিশেষ সুবিধায় যাঁরা খেলাপি হননি, তাঁদের জন্য নতুন করে সুবিধা দিয়ে গত ২৪ মার্চ সার্কুলার জারি করা হয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব চলমান ঋণের মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে এবং নতুন করে নবায়ন করা হয়নি, এসব ঋণের শুধু সুদ পরিশোধ করে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত নিয়মিত রাখতে হবে।

এছাড়া যেসব গ্রাহকের ২০২০ সালের সুদ বকেয়া রয়েছে তাদের চলতি বছরের মার্চ থেকে আগামী বছরের জুনের মধ্যে ৬টি কিস্তির ত্রৈমাসিক কিস্তির মাধ্যমে পরিশোধ করতে পারবেন। একই সঙ্গে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত যে সুদ আসে, তা–ও ত্রৈমাসিক কিস্তির মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে। আগে চলমান ঋণের কিস্তি প্রতি মাসে পরিশোধ করতে হতো। এ ছাড়া তলবি ঋণ চলতি মার্চ থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮টি ত্রৈমাসিক কিস্তিতে পরিশোধ করা যাবে।

সানবিডি/এএ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •