নোবেল নিয়ে যত বিতর্ক

|| প্রকাশ: ২০১৫-১০-১২ ২১:১৪:৩৬ || আপডেট: ২০১৫-১০-১২ ২১:১৭:৩৭

medal1444205123‘পাছে লোকে কিছু বলে’ কথাটি নতুন নয়। পৃথিবীতে অনেক ভালো কাজেরই সমালোচনা হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে। সময়ের পরিক্রমায় সেই সমালোচনা থেমেও যায়। নোবেল পুরস্কারের মান নিয়ে কারো মনে কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়। এটি বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার। আবার এই পুরস্কার নিয়েও কিন্তু আলোচনা-সমালোচনা কম নেই। বিশেষ করে ওকে দেওয়া হলো, একে দেওয়া হলো না কেন?- এ নিয়ে প্রতিবারই অনেককে মুখর হতে দেখা যায়। অপাত্রে দান হলো কিনা এ নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তোলেন! ১৯০১ অর্থাৎ পুরস্কার প্রদানের বছর থেকে আমরা যদি পইপই করে নোবেলের ইতিহাস ঘাঁটি তবে বিষয়টির সত্যতা মিলবে। পাঠক চলুন, নোবেল পুরস্কার নিয়ে এখন পর্যন্ত যে বিতর্কগুলো হয়েছে সেদিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক।

বিসমিল্লায় গলদ : পুরস্কার প্রবর্তনের প্রথম বছর সাহিত্যমোদীদের বিশ্বাস ছিল প্রথম সাহিত্যে নোবেল পাবেন লিও টলস্টয়। সত্যি বলতে কি সে সময় তাকে ছাড়া অন্য কাউকে চিন্তা করা একটু কষ্টকর ছিল বৈকি! কিন্তু সুইডিশ একাডেমি সবাইকে বুড়ো আঙুল দেখালেন। তারা মনোনীত করলেন কবি সুলি প্রুধমকে। সমালোচকদের মতে প্রুধম ছিলেন মধ্যম সারির কবি। পরে কিন্তু লিও টলস্টয়কে আর পুরস্কার দেওয়া হয়নি। বিষয়টিকে এখন পর্যন্ত নোবেল কমিটির ব্যর্থতা বলে মনে করেন অধিকাংশ সাহিত্যপ্রেমী। শুধু তাই নয়, শুরুর বছর থেকে ১৯০৫ পর্যন্ত শান্তিতে নোবেল পান ৫ জন। পরে দুটি সংগঠনের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। আরো জানা যায় যে, নোবেল কমিটির অধিকাংশ সদস্য ওই দুটি সংগঠনের সমর্থক ছিলেন। এটা জানাজানি হওয়ার পর বিতর্কের ঝড় ওঠে বিশ্বজুড়ে।

যুদ্ধপ্রিয় হয়েও নোবেল জয় : থিওডর রুজভেল্ট ব্যক্তিগতভাবে খুব যুদ্ধপ্রিয় ছিলেন। তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে আমেরিকাকে পৃথিবীর অন্যতম সামরিক শক্তিধর দেশ হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর স্বপ্নপূরণে তিনি উঠেপড়ে লাগেন। অথচ এই লোকটিকে যখন নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই সমালোচনা শুরু হয়ে যায়। পাঠককে জানিয়ে রাখি, সে সময় ২৯ জনের নাম শর্টলিস্টে ছিল। সবাইকে টেক্কা দিয়ে রুজভেল্ট নোবেল পান।

এ সব নিয়ে নোবেল কমিটিতেও যে অসন্তোষ দানা বাঁধে না এমন নয়। যেমন ১৯৩৫ সালে নোবেল কমিটির দুই সদস্য পদত্যাগ করেন। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার নিয়েই বিতর্কটা শুরু হয়েছিল। ওই বছর শান্তিতে নোবেল দেওয়া হয় জার্মানির শান্তিবাদী লেখক কার্ল ভন ও জিতজকিকে। কিন্তু অনেকেই এটা মেনে নিতে পারেননি। শুরু হয় বিতর্ক। আর বিতর্ক ঠেকাতেই এই পদত্যাগ। শুধু তাই নয়, এতকিছুর পরও ১৯৩৯ সালে কমিটির এক সদস্য ভয়াবহ এক কাণ্ড করে বসেন। তিনি জার্মানির অ্যাডলফ হিটলারকে নোবেল দেওয়ার জন্য মনোনয়ন দিয়েছিলেন। ভাগ্যিস এটা হয়নি। হলে কী হতো বলা যায় না!

কিসিঞ্জার প্রসঙ্গ : উত্তর ভিয়েতনাম ও আমেরিকার মদদপুষ্ট দক্ষিণ ভিয়েতনামের মধ্যে সংঘটিত হয় দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ (১৯৫৯-৭৫)। আমেরিকা যোগ দেয় দক্ষিণ ভিয়েতনামের পক্ষে। তারপরও তারা হেরে যায়। উত্তর ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট সরকারের অধীনে এক হয় দুই ভিয়েতনাম। যুদ্ধের ভয়াবহতা মুছে ফেলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে ভিয়েতনামের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব লে দোউ থো ও যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেটের হেনরি কিসিঞ্জার সন্ধি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। তাদের এই অবদানে নোবেল ফাউন্ডেশন ১৯৭৩ সালে একই সঙ্গে দুজনকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেন। কিন্তু লে দোউ থো পুরস্কার নিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। এ নিয়ে অনেক সমালোচনা রয়েছে। সমালোচকদের মতে, কিসিঞ্জার শান্তি প্রয়োগ নয়, যুদ্ধবাজ ছিলেন। সুতরাং তার সঙ্গে লে দোউ থো পুরস্কৃত হতে পারেন না।

অর্থের অনর্থের দিন : অর্থনীতিতে সবচেয়ে বিতর্কিত পুরস্কার পান প্রভাবশালী অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান। ১৯৭৬ সালে তিনি যখন পুরস্কার নেন, তখন স্টোকহোমে শত শত বিক্ষোভকারী প্রতিবাদ জানান। আবার ইহুদিবাদী জঙ্গির ঘরে বিশ্বের এই নামি পুরস্কার যাওয়াতেও কম বিতর্ক হয়নি। ঘটনা হলো, মেনাহেম বেগিন তরুণ বয়সে ইহুদিবাদী জঙ্গি সংগঠন ইরগানের সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া ১৯৪৬ সালে জেরুজালেমে যুক্তরাজ্যের প্রধান কার্যালয়ে বোমা হামলার পেছনেও তার হাত ছিল। ওই হামলায় ৯১ জন নিহত হন। অথচ কী আশ্চর্য! তাকে (তৎকালীন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী) ১৯৭৮ সালে বিতর্কিত ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির জন্য মিসরের প্রেসিডেন্ট আনওয়ার আল সাদাত-এর সঙ্গে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল দেওয়া হয়।

যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়েও বিতর্ক : সঠিক মূল্যায়নে কেউ কেউ পুরস্কৃত হলে সেখানেও বিতর্কের ঢেউ উঠেছে। উদাহরণ হিসেবে ইয়াসির আরাফাতের নাম উল্লেখ করা যায়। শিমন প্যারেজ ও আইজ্যাক রবিনের সঙ্গে তাকে শান্তিতে পুরস্কৃত করা হলে ওই বছর (১৯৯৪)  নরওয়ের নোবেল কমিটির এক সদস্য তাকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন। পুরস্কার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রবঞ্চিত হতভাগ্যদের নিয়ে শুধু ষড়যন্ত্রই হয়নি, ষড়যন্ত্র হয়েছে নোবেল বিজয়ীদের ক্ষেত্রেও। ইয়াসির আরাফাত এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

অপচয়ের বৈধতা : ২০ কক্ষের আলিশান প্রাসাদে গ্যাস ও বিদ্যুতের অতিরিক্ত অপচয়ের জন্য সমালোচিত ছিলেন মার্কিন রাজনীতিক আল গোর। অথচ তিনিই বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি সম্পর্কে সচেতনতা বিকাশে ভূমিকা রাখার জন্য ২০০৭ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় সমালোচনা। তবে ইদানিংকালে সবচেয়ে সমলোচিত হয়েছে ২০০৯ সালে বারাক ওবামার নোবেল পুরস্কারটি। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের মাত্র ১১ দিন পর মনোনয়ন বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওবামা নিজেই জানান, ওই পুরস্কারের যোগ্য তিনি নন। বিশ্বজুড়ে এ নিয়ে বিতর্কের ঝড় ওঠে।

নিয়ম ভেঙে পুরস্কার : নিয়ম অনুযায়ী কোনো অবস্থাতেই মৃত ব্যক্তিকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া যাবে না। তা সত্ত্বেও ২০১১ সালে এ নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটে। র‌্যাল্ফ স্টাইনম্যান চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। নোবেল কমিটি এ কথা যখন ঘোষণা করেন তখন তারা জানতেন না যে, তার ঠিক তিনদিন আগে স্টাইনম্যান মারা গেছেন। কমিটির এমন অদক্ষতা মেনে নিতে পারেনি বিশ্বের অনেকেই।

সানবিডি/ঢাকা/রাআ