কোটি টাকা হাতিয়ে এখনো পলাতক সেই মিঠুন রায়
সানবিডি২৪ আপডেট: ২০২৪-০৫-২২ ১৮:১৭:২৮
গোল্ডেন রিচ অ্যাপস এর সত্ত্বাধিকারী হেড অব অ্যাডমিন মিঠুন রায় (৩৪) টেলিগ্রাম অ্যাপস এর মাধ্যমে গোল্ডেন রিচ এফটিএফের কোটিকোটি টাকা আত্মসাৎ করে এখনো পলাতক রয়েছে। প্রতারণার জন্য মিঠুন রায়সহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় একটি জামিন যোগ্য এবং অন্যটি অযোগ্য মামলা ধার্য রয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক মোঃ কামাল হোসেন ও ডিবির সূত্র জানিয়েছে, উক্ত পলাতক আসামি মিঠুন রায় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পালিয়ে আছে বলে তাদরা ধারণা করছে। এছাড়াও তার ভিন্ন নামে দুইটি জাতীয় পরিচয় পত্রেরও খোঁজ পেয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম।
তাকে কিভাবে ভারত থেকে গ্রেপ্তার করা হবে জানতে চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, আমরা ইমিগ্রেশনের সহায়তা নিয়ে তাকে আইনের আওতায় আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আশা করি দ্রুতই সেটা কার্যকর হবে।
দুই বছর আগে গোল্ডেন রিচ নামে একটি অ্যাপস দিয়ে প্রতারণার স্বীকার হন আবু সাঈদ অমি নামক ভুক্তভোগী। সেখানে অভিযোগ প্রমাণিত আসামিরা তাকে পিরামিড আকারে লভ্যাংশ দিবে বলে আশা দেখায়। এছাড়াও এখানে বিনিয়োগ করলে নব্বই দিনের মধ্যে দ্বিগুণ মুনাফার আশ্বাস দেওয়া হয়।
শুধু তাই নয়; তাদের প্রাথমিক ব্যবসা কক্সবাজারে রিসোর্ট ক্রয় করার মাধ্যমে বিনিয়োগকৃত টাকার লভ্যাংশও তারা এ অ্যাপস ব্যবহারকারীদের প্রদান করবে বলেও লোভ দেখান। এমনকি গোল্ডেন রিচ নামে অনলাইন মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানির কক্সবাজার আর কুয়াকাটায় রিসোর্টে বিনিয়োগ করে সেখান থেকে এই লভ্যাংশ দেওয়া হবে। ওই বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে অ্যাপের মাধ্যমে আবু সাঈদ ইমন বিনিয়োগ করেছিলেন। তবে বিনিয়োগের লভ্যাংশ তুলতে গিয়ে দেখেন প্রতারণার স্বীকার হন তিনি।
শুধু আবু সাঈদই নন, অনলাইনে কথিত এই এমএলএম ব্যবসার নামে গোল্ডেন রিচের পালায় পরে প্রতারিত হয়েছেন কয়েক হাজার ব্যক্তি। তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া কয়েক কোটি টাকা, যা পাচার হয়ে গেছে দেশের বাইরে।
এরপরে মামলার বাদি আবু সাঈদ অমি (৩৪) থানায় হাজির হয়ে এক নাম্বার আসামি মোঃ রিয়াজুল ইসলাম ফকির (৩৫), মোঃ তরিকুল ইসলাম (৫৫), মিঠুন কুমার রায়(৪৩), গোল্ডেন রিচ আ্যাপের মালিকসহ (অজ্ঞাত) আরও অজ্ঞাতনামা সাত থেকে দশজন অ্যাপস পরিচালনাকারীর বিরুদ্ধে এজাহার দায়ের করেন।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ২২শে ডিসেম্বর মিরপুরের শেওড়াপাড়ার বাসায় টেলিগ্রামের মাধ্যমে আবু সাইদ অমি এ অ্যাপস সম্পর্কে জানতে পারে। সেখানে দেখে সে বুঝে যে, গোল্ডেন রিচ অ্যাপস একটি রিস্কমুক্ত ও বিশ্বস্থ ইনভেস্টমেন্ট অনলাইন প্লাটফর্ম। এরপর এখানে একাউন্ট করে ইনভেস্ট করলে নব্বই দিনে বিনিয়োগের টাকার দ্বিগুণ মুনাফা পাওয়ার বিজ্ঞাপন পায়।
পরবর্তীতে আরও জানতে পারে যে, তাদের প্রাথমিক ব্যবসা কক্সবাজারে রিসোর্ট ক্রয় করার মাধ্যমে বিনিয়োগকৃত টাকার লভ্যাংশ তারা প্রদান করবে।
এরই প্রেক্ষিতে গোল্ডেন রিচ অ্যাপস এর এজেন্ট আসামি মোঃ রিয়াজুল ইসলাম ফকির এর সাথে অমির শেওড়াপাড়ার বাসার সামনে সাক্ষাৎ হয়। তখন রিয়াজুল ইসলাম ফকির (৩৫) এর সাথে এ অ্যাপসের মাধ্যমে ব্যবসা করার জন্য প্রস্তাব দেয়। গোল্ডেন রিচ একটি মাল্টি লেভেল মার্কেটিং এর অংশ বলে জানায় আসামি রিয়াজুল।
পরবর্তীতে অমি এটিকে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং এর অংশ মনে করে রিয়াজুল ইসলাম ফকিরের প্রস্তাবে রাজি হয়। এছাড়াও অ্যাপটির মাধ্যমে ব্যবসা করা সহ ইলেকট্রনিক্স পণ্য (রোবট) সামগ্রী ক্রয় করার জন্য মৌখিক চুক্তিবদ্ধ হয়। পরে এজেন্ট রিয়াজুল অমির সাথে দেখা করে গোল্ডেন রিচে যুক্ত হওয়ার নির্দেশনা দেয়। কিভাবে প্লে স্টোর থেকে ডাউনলোডসহ রেফার কোড ব্যবহার করতে হবে এ সম্পর্কে জানায়।
আসামি মোঃ রিয়াজুল ইসলাম ফকির তাকে আরও জানায় যে এ অ্যাপসটির মালিক এ মামলার তিন নাম্বার আসামি মিঠুন কুমার রায় (৪৩) এবং দুই নাম্বার আসামি মোঃ তরিকুল ইসলাম (৫৫) কে বাংলাদেশি ম্যানেজার হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়। সে বাংলাদেশি নাগরিক, দেশেই আছেন; তাই নিঃসন্দেহে অমিকে বিনিয়োগ করতে বলেন।
এর প্রেক্ষিতে ভুক্তভোগী বাদি আবু সাঈদ অমি অ্যাপসটি ডাউনলোড এবং রেজিট্রেশন করে। রেজিট্রেশনের পরে অ্যাপস থেকে এজেন্টের মাধ্যমে কিভাবে ইনভেস্টমেন্ট করতে হবে সেই বিষয়ে বিস্তারিত জানে। পরবর্তীতে আসামি রিয়াজুল ইসলাম ফকির এর টেলিগ্রাম নম্বর থেকে তার টেলিগ্রাম নম্বরে মেসেজ দেয়। মেসেজে গোল্ডেন রিচ অ্যাপসে কিভাবে বিনিয়োগ করতে হবে এবং বিনিয়োগের টাকা গুলো তার কোন নাম্বারে পাঠাবে তা মেসেজের মাধ্যমে বিকাশ/নগদের বিভিন্ন নম্বর বাদিকে প্রদান করেন আসামিরা।
রিয়াজুল ইসলাম ফকির এর কথামতো অমি নগদ থেকে ৪৬ হাজার ২৫ টাকা ও বিকাশ থেকে এক নাম্বারে আসামিকে ২০ হাজার ৫ শত ৩৫ টাকা প্রদান করে। এছাড়াও বাদি অমি আরও বিভিন্ন নাম্বার থেকে নগদ ও বিকাশে টাকা পাঠান বলে উল্লেখ করেন।
পরবর্তীতে ২০২৩ এর মার্চে আসামিরা টেলিগ্রাম গ্রুপ গোল্ডেন রিচ এফটিএফ এর মাধ্যমে প্রচার করতে থাকে যে, গোল্ডেন রিচ অ্যাপস ক্রিপ্টোকারেন্সির ট্রেডিং এর সাথে সংযুক্ত হতে যাচ্ছে। পরে এ অ্যাপসটি বাদির কাছে অবৈধ মনে হওয়ায় তার বিনিয়োগকৃত টাকা মোঃ রিয়াজুল ইসলাম ফকির কে ফেরত দিতে বলে। কিন্তু রিয়াজুল ইসলাম ফকির অমিকে জানায় তার টাকা তিন নাম্বার ও চার নাম্বার আসামি তরিকুল ইসলাম ও মিঠুন কুমার ক্রিপ্টোকারেন্সির ট্রেডিং করার জন্য দেশের বাহিরে পাচার করেছে।
এজন্য তখন গোল্ডেন রিচ অ্যাপসে আবু সাঈদ অমির আইডিতে কোন প্রকার ব্যালেন্স দেখায়নি। পরবর্তীতে আসামির সাথে যোগাযোগ করে টাকা চাইলে সে কোনো যুক্তিসঙ্গত উত্তর না দিয়ে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলে। তখন সে বুঝতে পারে যে প্রতারনার স্বীকার হয়েছে।
অমি জানান, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ভুয়া অ্যাপস এর মাধ্যমে তার বিনিয়োগকৃত অর্থ আত্মসাৎ করে প্রতারণা করেছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশনের উপ-পরিদর্শক মোহাম্মদ কামাল হোসেন। তার তদন্তে বাদি ও সাক্ষীসহ স্হানীয় গোপন প্রকাশ্য তদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্ট অনুযায়ী এ প্রতারণার প্রমাণ পাওয়া যায়। তার দাখিলকৃত অভিযোগপত্রে দেখা যায়, সিআইডি কর্তৃক আসামি রিয়াজুলের ফোন থেকে টেলিগ্রাম গ্রুপে রোবটের কথা বলে অ্যাপস ব্যবহারকারীদের থেকে টাকা লেনদেনের প্রমাণ পায়। সেখানে আসামি বলেন, (যারা রোবট নিবেন তারা অমুক নাম্বারে টাকা পাঠিয়ে স্ক্রিনশট দেন)।
মুলত; তদন্তে গ্রেফতারকৃত অন্যান্য আসামিরা যোগসাজশে বাদির বিনিয়োগকৃত অর্থ আত্মসাৎ করে করেছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
মামলার দুই নাম্বার আসামি মোঃ তরিকুল ইসলাম কাবুল (মৃত) এর থেকে জব্দকৃত আলামত মোবাইল ফোনে হোয়াটসঅ্যাপ লগইন করে ব্যবহারের তথ্য ও গোল্ডেন রিচ নামীয় সদস্য হিসেবে পাওয়া যায়। উক্ত গ্রুপ দিয়ে এ সংক্রান্ত মেসেজ আদান প্রদান করার তথ্য পাওয়া যায়।
উল্লেখ্য, মোঃ তরিকুল ইসলাম ও কাবুল জেল হাজত হতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। এর জন্য তাকে এ মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এ ছাড়াও, মামলার তদন্তে প্রাপ্ত চার নাম্বার আসামি মোঃ তাজিরুল ইসলাম ডলারের থেকে জব্দকৃত আলামত মোবাইল ফোনের হোয়াটসঅ্যাপে এ অ্যাপস ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়াও এ অ্যাপস সংক্রান্ত ডাচ বাংলা ব্যাংকের ট্রানজেকশন স্লিপ পাওয়া যায়। এবং গোল্ডেন রিচ অ্যাপস এর বিজ্ঞাপন দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। তদন্তকরী কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে বলেন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদন্তের ফলাফলের সাথে একমত হয়ে চূড়ান্ত আদেশ দেন।






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













