রাশেদ মাকসুদ কমিশনে শিল্পায়নে পুঁজিবাজারের অবদান ‘শূন্য’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আপডেট: ২০২৬-০৩-০৮ ১০:১৫:২৫
# আইপিও শূন্য দেড় বছর
# বাজারে আসেনি কোন নতুন কোম্পানি
# ড. ইউনূসের নির্দেশনাও বাস্তবায়ন হয়নি
# নীতিগত অনিশ্চয়তায় পুঁজিবাজারমুখী নয় উদ্যোক্তারা
>> নেতিবাচক অবস্থান থেকে আস্থাকে শূন্যে আনা, সেখান থেকে ইতিবাচক এর পর নতুন কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসতে আগ্রহী হবে-বিএপিএলসি সভাপতি রিয়াদ মাহমুদ
> শিল্পায়নের জন্য পুঁজিবাজারের অর্থায়ন খুবই জরুরি: বিএমবিএ সভাপতি ইফতেখার আলম
> পুরোনো বিধিমালা কার্যকর থাকলেও স্বচ্ছতার কঠোর অবস্থান, রেস্ট্রিকটেড প্রাইস মডেল এবং অতীতের অনিয়মের কারণে অনেক কোম্পানি আবেদন করতে সাহস পায়নি। কয়েকটি আবেদন এলেও অসংগতির কারণে তা বাতিল করা হয়েছে:- বিএসইসির মুখপাত্র ও পরিচালক আবুল কালাম
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকা শক্তি হলো পুঁজিবাজার। যে দেশের পুঁজিবাজার যতো উন্নত,সে দেশের আর্থিক খাত ততো বেশি শক্তিশালী। দেশের শিল্পায়নের গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় না পৌঁছানোর পেছনে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ঘাটতি অন্যতম বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ও সম্প্রসারণে বিপুল মূলধনের প্রয়োজন হলেও দেশের অর্থায়ন কাঠামো এখনো মূলত ব্যাংকনির্ভর। উচ্চ সুদের চাপ, ঋণ পরিশোধের সময়সীমা এবং আর্থিক ঝুঁকি অনেক উদ্যোক্তার জন্য বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। ফলে শিল্পখাতের সম্প্রসারণ কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে পারে না।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পুঁজিবাজারকে শিল্পায়নের টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন উৎস হিসেবে গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের মতে, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে পুঁজিবাজারই হতে পারে দেশের শিল্পায়নের নতুন চালিকাশক্তি। জনগণের সঞ্চয় উৎপাদনমুখী খাতে প্রবাহিত করার মাধ্যমে শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে পুঁজিবাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রাশেদ মাকসুদের আমল
২০২৪ সালে অসহযোগ আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকার পদত্যাগ করলে ১০ আগস্ট বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম পদত্যাগ করেন। এর পর ১৩ আগস্ট এম মাসরুর রিয়াজকে চেয়ারম্যান করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও সমালোচনার মুখে তিনি দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেন। ফলে প্রজ্ঞাপন বাতিল করে ১৮ আগস্ট রাশেদ মাকসুদকে ৪ বছরের জন্য চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
রাশেদ মাকসুদ দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের পুঁজিবাজারে নজিরবিহীন স্থবিরতা বিরাজ করছে। গত ১৮ মাসে কোনো নতুন কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি। এমনকি এ সময়ে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) অনুমোদনের জন্যও কোনো আবেদন জমা পড়েনি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিতে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা মহামারি ছাড়া এত দীর্ঘ সময় আইপিও শূন্য থাকার ঘটনা দেশের পুঁজিবাজার ইতিহাসে প্রায় নজিরবিহীন।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সর্বশেষ কোম্পানি হিসেবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় টেকনো ড্রাগস। এরপর আর কোনো আইপিও অনুমোদন বা নতুন তালিকাভুক্তির ঘটনা ঘটেনি।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, টানা দেড় বছর নতুন কোম্পানি না আসায় পুঁজিবাজার কার্যত দুই বছর পিছিয়ে গেছে। বাজারে বিনিয়োগযোগ্য ভালো কোম্পানির সংখ্যা সীমিত হয়ে পড়েছে। অন্তত কয়েকটি সরকারি বা বড় বেসরকারি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলে বাজারে সরবরাহ বাড়ত এবং আস্থার সংকট কিছুটা কাটত।
প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনাও বাস্তবায়ন হয়নি
পুঁজিবাজারে গতি ফেরাতে গত ১১ মে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস পাঁচটি নির্দেশনা দেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল—সরকারি মালিকানাধীন বহুজাতিক কোম্পানিগুলো দ্রুত তালিকাভুক্ত করা। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে লাভজনক কোম্পানির সংখ্যা সীমিত। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্তির আলোচনায় থাকলেও নীতিগত জটিলতা রয়েছে। পাশাপাশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে বোর্ড অনুমোদন ও কর-সুবিধা সংশ্লিষ্ট বিষয়ও বাধা হিসেবে কাজ করছে।
পুঁজিবাজারে শিল্পায়নে সীমিত অবদান
অর্থনীতিতে প্রকৃত মূলধন জোগায় প্রাইমারি বা আইপিও বাজার। কিন্তু গত ১৫ বছরে মূল ও এসএমই বাজার মিলিয়ে মাত্র ১৪৭টি কোম্পানি প্রায় ১০ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির তুলনায় অতি নগণ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শুধু ব্যাংক ঋণই বেড়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। এর তুলনায় পুঁজিবাজারের অবদান অত্যন্ত সীমিত।
কেন আগ্রহ হারাচ্ছে উদ্যোক্তারা?
বিশ্লেষকদের মতে, বড় কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারমুখী না হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম কারণ হলো-মালিকানা ভাগাভাগিতে অনীহা,আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার চাপ,ব্যাংক থেকে সহজে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পাওয়া,কর কাঠামোয় তালিকাভুক্তির পর্যাপ্ত প্রণোদনার অভাব,আইপিও অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা এবং এজিএম পার্টির খপ্পরে পড়ার ভয়,নতুন কমিশনের কঠোর অবস্থান ও বিধিমালা পরিবর্তনের অনিশ্চয়তায় উদ্যোক্তারা অপেক্ষার কৌশল নিয়েছেন বলেও মনে করছেন অনেকে।
সামনে কী?
বর্তমানে কোনো আইপিও আবেদন অপেক্ষমাণ নেই। ফলে আগামী ছয় মাসেও নতুন আইপিও আসার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরে অন্তত চার থেকে পাঁচটি ভালো ও বড় কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হলে পুঁজিবাজারে গতি ফিরবে না।
নীতিগত স্বচ্ছতা, দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া, কর-প্রণোদনা এবং সরকারি উদ্যোগ এই চারটি বিষয় একসঙ্গে কার্যকর না হলে আইপিও খরা দীর্ঘায়িত হতে পারে। দেশের আইপিও বাজার কার্যত অচলাবস্থায়। নতুন বিধিমালা চূড়ান্ত ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য:
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি ইফতেখার আলম বলেন, শিল্পায়নের জন্য পুঁজিবাজারের অর্থায়ন খুবই জরুরি। তবে কয়েকটি কারণে পুঁজিবাজারে কোম্পানি আসেনি। তার মধ্যে অন্যতম হলো রেগুলেটরি জটিলতা,সঠিক মূল্য না পাওয়ার আশঙ্কা অন্যতম। পুঁজিবাজারে কোম্পানি না আশায় উদ্যোক্তাদের সাথে কর্মসংস্থানেরও সমস্যা হয়েছে। তিনি বলেন, কোম্পানি ব্যবসা সম্প্রসারণ করলে যেমন কর্মসংস্থান হয়;তেমনি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহযোগিতা করে।
বিএপিএলসি সভাপতি ও ন্যাশনাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে দেশের শিল্পায়নে পুঁজিবাজার থেকে কার্যত কোনো অর্থায়ন হয়নি। বর্তমানে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির আরও সহযোগী বা নতুন কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসার মতো সক্ষমতা রয়েছে। একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য অতিরিক্ত মূলধনের প্রয়োজন হলেও তারা পুঁজিবাজার থেকে সেই অর্থ পাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে, যা ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় (কস্ট অব ডুইং বিজনেস) উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, যদি পুঁজিবাজার থেকে ইকুইটি ফান্ডিং পাওয়া যেত, তাহলে ব্যবসা পরিচালনার খরচ অনেক কম হতো। ব্যাংক ঋণ সাধারণত স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি—পাঁচ থেকে ছয় বছরের জন্য হয়ে থাকে। কিন্তু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রকল্প সম্প্রসারণ বা ক্যাপিটাল এক্সপেনডিচারের মতো বড় বিনিয়োগের জন্য ১২ থেকে ১৪ বছরের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন প্রয়োজন, যা ইকুইটি ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে সহজে সম্ভব। কিন্তু সেই সুযোগ না থাকায় কোম্পানিগুলোর কস্ট অব অপারেশন ও কস্ট অব ফান্ডিং বেড়ে গেছে এবং এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রক্রিয়াও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
রিয়াদ মাহমুদ বলেন, এর ফলে পরিস্থিতি অনেকটা “গোলের ওপর বিষফোঁড়া” হওয়ার মতো হয়েছে। বড় একটি সময় পুজিবাজারে একটি নতুন কোম্পানি বাজারে আনা বা রাইট শেয়ার অনুমোদন হয়নি। ব্যাংক ঋণের কারণে ব্যবসার ব্যয় প্রায় ৫ থেকে ৬ শতাংশ বেড়ে গেছে। ফলে কোম্পানির সামগ্রিক সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, গত ১৮ মাসে পুঁজিবাজারে একটি নতুন কোম্পানিও না আসা বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। নতুন রাজনৈতিক সরকার আসার পর মানুষের মধ্যে কিছুটা আস্থা তৈরি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে কোনো নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হওয়ায় যারা বাজারে আসার কথা ভাবছিল, তারাও সেই পরিকল্পনা থেকে সরে গেছে। ফলে আস্থার মাত্রা শূন্যে থাকার বদলে অনেক ক্ষেত্রে নেতিবাচক পর্যায়ে নেমে গেছে।
তার মতে, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই নেতিবাচক অবস্থান থেকে আস্থাকে আবার শূন্যে আনা এবং সেখান থেকে ইতিবাচক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া—যেখানে নতুন কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসতে আগ্রহী হবে।
সার্বিক বিষয়ে বিএসইসির মুখপাত্র ও পরিচালক আবুল কালাম বলেন, পুরোনো বিধিমালা কার্যকর থাকলেও স্বচ্ছতার কঠোর অবস্থান, রেস্ট্রিকটেড প্রাইস মডেল এবং অতীতের অনিয়মের কারণে অনেক কোম্পানি আবেদন করতে সাহস পায়নি। কয়েকটি আবেদন এলেও অসংগতির কারণে তা বাতিল করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন,তবে নতুন কমিশন আইন যুগপোযগি করেছে। এখন পুঁজিবাজারে কোম্পানি আসবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোন কোম্পানি যদি পুরোনে আইনে আবেদন করে থাকে; তাহলে নতুন আইনি যে কাগজপত্রের কথা বলা আছে অতিরিক্ত সেই কাগজগুলো দিলেই হবে।






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন














