নিরীক্ষা প্রতিবেদন

মুনাফা দেখাতে হিসাবে কারসাজি, নথিহীন হিসাব ও গরমিলের ছড়াছড়ি ন্যাশনাল ফিডে’র

::জাকির হোসাইন প্রকাশ: ২০২৬-০৩-১৬ ২০:২৯:৪৯


আর্থিক প্রতিবেদনে হিসাবে গরমিল, তথ্য গোপন করে মুনাফা বেশি দেখানো, বিভিন্ন হিসাবের নথিপত্র সংরক্ষণ না করাসহ একাধিক অসঙ্গতি ও অনিয়ম উঠে এসেছে। গত বছরের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের উপর নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও এসব অসঙ্গতি ও অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।

আর্থিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ন্যাশনাল ফিড মিলস ৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকার কাঁচামাল ক্রয়ের কথা বললেও ভ্যাট রিটার্নে তা ১০ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ কোম্পানিটি প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ টাকার ক্রয় হিসাব কম দেখিয়েছে। এর ফলে কোম্পানির নিট মুনাফা ও শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) প্রকৃত অংকের চেয়ে অনেক বেশি প্রদর্শিত হয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিশাল অংকের কেনাকাটার বিপরীতে কোনো লেজার, ভাউচার বা প্রমাণপত্র নিরীক্ষককে দেখাতে পারেনি কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।

৮৭ কোটি টাকার পাওনা, নেই প্রভিশন

কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে ‘অ্যাকাউন্টস রিসিভেবল’ বা ক্রেতাদের কাছে পাওনা হিসেবে গত বছরের জুন পর্যন্ত ৮৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। তবে নিরীক্ষকের মতে, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (আেইএফআরএস-৯) অনুযায়ী পাওনা অর্থের মধ্যে যেসব অর্থ আদায়যোগ্য নয়, সেগুলোর বিপরীতে রাইট-অফ বা প্রভিশন করতে হয়। কিন্তু কোম্পানিটি কোন প্রভিশন সংরক্ষণ করেনি। এছাড়া প্রয়োজনীয় নথিপত্রের ঘাটতির কারণে এই পাওনা অর্থের পরবর্তী অবস্থা বা আদায়ের অগ্রগতিও যাচাই করতে পারেনি নিরীক্ষক।

সরবরাহকারীদের পাওনা হিসাবেও অস্পষ্টতা

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আর্থিক বিবরণীতে ‘অ্যাকাউন্টস পে-অ্যাবল’ বা সরবরাহকারীদের কাছে পরিশোধযোগ্য অর্থ হিসেবে ৮৪ লাখ ২১ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। তবে এই অর্থের বিপরীতে কোনো লেজার বা পর্যাপ্ত সহায়ক নথিপত্র পায়নি নিরীক্ষক। সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারীদের কাছে চিঠি পাঠানো হলেও নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশের তারিখ পর্যন্ত তারা কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

সুদ ব্যয় কম দেখিয়ে মুনাফায় বাড়তি

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আর্থিক বিবরণীর নোট–১৩ এ ‘লং-টার্ম লোন’ বা দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে চলতি বছরে সুদ ও চার্জ হিসেবে ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। তবে একই সময়ে আর্থিক ব্যয় খাতে টার্ম লোনের সুদ হিসেবে দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। ফলে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা আর্থিক ব্যয় কম দেখিয়েছে, যার ফলে কোম্পানির মুনাফা বেশি দেখানো হয়েছে এবং শেয়ারপ্রতি লোকসানের (ইপিএস) ওপরও এর প্রভাব রয়েছে। কোম্পানিটি ব্যাংক এশিয়া থেকে নেওয়া ২৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকার ঋণের কোনো স্টেটমেন্ট বা বিবরণী নিরীক্ষককে সরবরাহ করেনি। এছাড়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ বা ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকার সমন্বয়ের বিষয়েও কোনো উপযুক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

শ্রমিক তহবিল ও লভ্যাংশ বণ্টনেও অনিয়ম

কোম্পানিটির শ্রমিক মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিলে (ডব্লিউপিপিএফ) ২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা জমা থাকলেও তা কয়েক বছর ধরে শ্রমিকদের পরিশোধ করা হচ্ছে না। এর পাশাপাশি অদাবিকৃত বা আনক্লেমড ডিভিডেন্ড বাবদ ৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরের ১ লাখ ৭০ হাজার টাকার অদাবিকৃত লভ্যাংশ রয়েছে। যেটি তিন বছর পর ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডে হস্তান্তরের নিয়ম থাকলেও তা করা হয়নি। উল্টো সংশ্লিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ২ লাখ ৩৮ হাজার টাকার ঘাটতি পাওয়া গেছে।

জেনারেল রিজার্ভে গরমিল, নেই সহায়ক নথি

আর্থিক প্রতিবেদনে ‘জেনারেল রিজার্ভ’ হিসেবে ৬১ লাখ ৯০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। তবে নিরীক্ষার সময় এই অর্থের বিপরীতে কোনো সহায়ক নথিপত্র পায়নি নিরীক্ষক। কোম্পানি এই অর্থ সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করার কথা উল্লেখ করলেও এ সংক্রান্ত কোনো কাগজ নথিপত্র পাওয়া যায়নি এবং এটিকে বিনিয়োগ হিসেবে আর্থিক প্রতিবেদনেও উল্লেখ করেনি।

৫৫ কোটি টাকার ইনভেন্টরি যাচাই সম্ভব হয়নি

২০২৫ সালের জুন শেষে কোম্পানির গুদামে ৫৫ কোটি ৩১ লাখ টাকার পণ্য বা ইনভেন্টরি থাকার কথা জানানো হয়েছে। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী ইনভেন্টরি ভ্যালুয়েশন রিপোর্ট বা মালামাল গণনার কোনো শিট নিরীক্ষককে দেওয়া হয়নি। এমনকি কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের অসযোগিতার কারণে মালামালের বাস্তব উপস্থিতিও যাচাই করতে পারেনি নিরীক্ষক।

সর্বশেষ অর্থবছরে ন্যাশনাল ফিড লোকসান থেকে লাভে ফিরেছে। কোম্পানিটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৩ লাখ ৫৪ হাজার টাকা নিট মুনাফা করেছে। ফলে শেয়ার প্রতি মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৩ পয়সা। এসময়ে শেয়ার প্রতি সম্পদ মূল্য দাঁড়িয়েছে ১১ টাকা ৯ পয়সা এবং শেয়ার প্রতি নগদ প্রবাহ ছিল ১২ পয়সা। এর আগের অর্থবছরে কোম্পানিটির লোকসানের পরিমাণ ছিল ৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এ সময়ে শেয়ার প্রতি লোকসান ছিলো ৭১ পয়সা। আলোচ্য সময়ে শেয়ার প্রতি সম্পদ মূল্য ছিল ১১ টাকা ৭ পয়সা এবং শেয়ার প্রতি নগদ প্রবাহ ১২ পয়সা।

২০০ কোটি অনুমোদিত মূলধনের বিপরীতে ৯৩ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধনের এই কোম্পানিটি ২০১৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। কোম্পানির মোট শেয়ার সংখ্যা ৯ কোটি ৩৩ লাখ ৬১ হাজার ৩২৪। এর মধ্যে ৩০ দশমিক ৪০ শতাংশ রয়েছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ১২ দশমিক ৩০, বিদেশি বিনিয়োগকারী দশমিক ১৮ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে বাকি ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

কোম্পানির ব্যক্তব্য

এসব বিষয়ে জানতে ন্যাশনাল ফিড মিলসের কোম্পানি সেক্রেটারী জাহিদুল ইসলামকে ফোন দিলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে পরের দিন যোগাযোগ করতে বলেন। পরের দিন একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও ফোন ধরেননি। এছাড়াও কোম্পানিটির সিএফও আনোয়ার হোসাইনকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলে তিনিও ফোন ধরেননি।

এএ