ধারাবাহিক জরিমানায় বাজারে আস্থা ফিরল; নাকি দায় বাড়লো বিএসইসির?
সানবিডি২৪ প্রকাশ: ২০২৬-০৩-২৯ ০৯:৫৬:৩৯
শুধুমাত্র বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপ করলেই সমস্যার সমাধান হয় না-ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী
জরিমানাগুলো বাস্তবে আদায় করা কঠিন হবে-আহমেদ রশিদ লালী
মামলা পরিচালনার চাপ বাড়বে কমিশনের-ডিবিএ প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম
জরিমানা আদায়ে আত্মবিশ্বাসী বিএসইসির চেয়ারম্যান
পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পুঁজিবাজারের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে শাস্তি হিসেবে বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপ করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বিগত সময়ে অনিয়ম ও কারসাজিতে যুক্ত থাকা ও সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে গত ১৮ মাসে প্রায় ১৫শ কোটি টাকা জরিমানা আরোপ করেছে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। তবে দন্ড হিসেবে আরোপিত এসব অর্থ আদায়ের হার অত্যন্ত কম হওয়ায় জরিমানার অর্থ আদায় নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বাজার সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বিএসইসির এই বিপুল পরিমাণ অর্থ নিকট ভবিষ্যতে আদায় হওয়ার সম্ভাবনা কম। সেইসাথে এ প্রশ্নও উঠেছে যে বিশাল অঙ্কের এই জরিমানায় কি বাজারে আস্থা ফিরেছে, নাকি উল্টো কমিশনের ওপর মামলার চাপ আর দায় বাড়ছে?
বিএসইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত ১১৪টি অনুসন্ধান ও তদন্ত এবং ৬৪টি পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময়ে বিভিন্ন অনিয়মের ঘটনায় মোট ১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকার অর্থদণ্ড আরোপ করা হলেও আদায় হয়েছে মাত্র ৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এর পাশাপাশি মানি লন্ডারিং সংশ্লিষ্ট ১৬টি মামলা দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে।
জরিমানার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ১৮ মাসে পুঁজিবাজার ঘিরে সংস্কারের কথা শোনা গেলেও আস্থা ফিরে আসেনি। ধারাবাহিকভাবে বিএসইসির জরিমানা আরোপে উল্টো পুঁজিবাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অবস্থার পরিবর্তনে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, শুধুমাত্র বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপ করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। তিনি বলেন, “এভাবে শুধু শুধু বিশাল অঙ্কের দণ্ড দেওয়া অর্থহীন। তদন্তে আরও গভীরে গিয়ে প্রকৃত দোষীকে শনাক্ত করা উচিত ছিল। শুধু জরিমানা করলেই হবে না—এটা আদায় করা যাবে কি না সেটাও বিবেচনায় রাখতে হবে।”
তাঁর মতে, তদন্তে পর্যাপ্ত গভীরতা না থাকায় হয়তো প্রকৃত দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা যায়নি। তিনি বলেন, “এগুলো এখন আদালতে যাবে এবং ১০ থেকে ২০ বছর ধরে মামলার প্রক্রিয়া চলতে পারে।”
একই সঙ্গে শাস্তির চেয়ে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “অপরাধ যেন না ঘটে সে ব্যবস্থা নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শুধু শাস্তি দিলে বাজারে ভীতিকর বার্তা যায়।”
আদালতে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের আশঙ্কা
প্রচলিত ব্যবস্থায় বিএসইসির আরোপিত জরিমানার অর্থ আদায় নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তাঁরা বলছেন, আইনি মারপ্যাঁচে বিএসইসির আরোপ করা এই জরিমানার অর্থ নিকট ভবিষ্যতে আদায় হওয়ার সম্ভাবনা কম।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সাবেক সভাপতি আহমেদ রশিদ লালীও মনে করেন, এই জরিমানাগুলো বাস্তবে আদায় করা কঠিন হবে। তার ভাষ্য, “এগুলো আদালতে যাবে এবং চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে বহু বছর লাগবে। আদালতে গিয়ে জরিমানার ভিত্তি ব্যাখ্যা করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, বড় অঙ্কের জরিমানার ক্ষেত্রে হিসাব নির্ধারণের পদ্ধতি স্পষ্টভাবে দেখাতে না পারলে তা আইনি জটিলতায় পড়বে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে কোনো বিনিয়োগকারী শেয়ার কিনে কাগুজে লাভ দেখালেও বাস্তবে পুরো শেয়ার বিক্রি করতে পারেন না। কিন্তু জরিমানা নির্ধারণ করা হয় পুরো পরিমাণের ওপর যা নিয়ে আইনি প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। এমন আরও বিষয় রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কমিশনের ওপর বাড়ছে মামলার চাপ, বাড়ছে দায়
বিএসইসির এমন কর্মকান্ড শুধু বাজারে আস্থা ফেরাতেই ব্যর্থ হয়নি বরং সংস্থাটির উপর মামলার বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে বলেও মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টদের অনেকেই।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম বলেন, নিকট ভবিষ্যতে এসব জরিমানা আদায় সম্ভব নয়। কারণ জরিমানাপ্রাপ্তরা আদালতের আশ্রয় নেবেন। তার মতে, “বিপুল পরিমাণ জরিমানা আদায়ের পাশাপাশি মামলা পরিচালনার চাপও কমিশনের ওপর বাড়বে।”
জরিমানা আদায়ে আত্মবিশ্বাসী বিএসইসি
বাজার সংশ্লিষ্টদের ভিন্ন মত থাকলেও বিএসইসি বলছে আইনি পদ্ধতি যথাযথভাবে অনুসরণ করেই এসব জরিমানা আরোপ করা হয়েছে। আইনি কার্যক্রমে যতটুকু সময় প্রয়োজন সেই সময় শেষেই এসব জরিমানার অর্থ আদায় হবে।
সম্প্রতি একটি সেমিনারে এ বিষয়ে ব্যাখা দিয়ে বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, “আইন অনুযায়ী তাঁরা বিভিন্ন ধাপের পরে ৯ মাস সময় পান। ৯ মাস পরে ওনারা টাকাটা ফেরত দেবেন। সাধারণভাবেই ওনাদের আইনি রেকর্ডস আছে, তাঁরা কোর্টে যাচ্ছে। কিন্তু যেহেতু আইনের প্রতিটি লাইন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করে জরিমানা করা হয়েছে, ২০২৭ হোক বা ২০২৮ হোক এই ১৫শ কোটি টাকা আমরা ফেরত পাবই।”






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন














