ইসলামি ব্যাংকগুলোতে আস্থার সাথে বাড়ছে গ্রাহকদের নতুন শঙ্কা

::জাহাঙ্গীর আলম আনসারী আপডেট: ২০২৬-০৪-২৩ ১৬:৫১:৩৮


ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইসলামি ধারার কয়েকটি ব্যাংক। হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়ে পাচার করেছে বিদেশে। ফলে চরম তারল্য সংকটের কারণে সরকার পাঁচটি ব্যাংকে একীভূত করতে বাধ্য হয়েছে। এসব কারণে মানুষের আস্থাও উঠে গিয়েছিল ব্যাংক খাত থেকে। তবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ব্যাংক খাতে ব্যাপক সংস্কার শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর থেকে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর উপর মানুষের আস্থা আবার ফিরতে শুরু করে। ধারাবাহিক বাড়তে থাকে ব্যাংকগুলোর আমানতও। চলতি বছরের জানুয়ারি মানুষের তুলনায় ফেব্রুয়ারি মাসে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানত বেড়েছে ২ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা। আর এক বছরের ব্যবধানে ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানত বেড়েছে ২৪ হাজার ১৯৪ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

নতুন আইন নিয়ে উদ্বেগ

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশে পুরনো মালিকদের ফেরার সুযোগ রেখে আইন পাস করার পর ইসলামি ব্যাংকগুলোর গ্রাহকদের মধ্যে নতুন করে আবার উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, নতুন এই বিধান অনুযায়ী, একীভূত হওয়া দুর্বল ব্যাংকগুলোর সাবেক শেয়ারহোল্ডার বা মালিকরা চাইলে আবারও সেই ব্যাংকের মালিকানায় ফেরার সুযোগ পাবেন। এতে সাধারণ মানুষের মনে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ, যাদের অনিয়ম আর লুটপাটের কারণে একসময় ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হওয়ার পথে বসেছিল, এই আইনের ফলে সেই বিতর্কিত মালিকরাই আবারও ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে আসার আইনি পথ পেয়ে গেলেন।

সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত বিষয় হলো, মালিকানা ফিরে পেতে সাবেক মালিকদের পুরো অর্থ পরিশোধ করতে হবে না। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক এসব ব্যাংকের সংকট কাটাতে যে পরিমাণ আর্থিক সহায়তা দিয়েছে, তার মাত্র ৭.৫ শতাংশ জমা দিয়েই তারা পুনরায় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবেন।

বিশেষ করে পুরনো মালিকদের ফিরে আসার সুযোগ রেখে ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ আইনে পরিণত হওয়ার পরই হঠাৎ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে দেশের বৃহত্তর বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির এমডি ওমর ফারুক খানকে। এরপর দুই দিন পরই আবার এস আলমের কাছে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ফেরত দেয়ার দাবিতে চট্টগ্রাম থেকে কয়েক হাজার লোক এসে প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেছে। এতে করে ব্যাংকটির গ্রাহকদের মধ্যে আবার নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ব্যাংকটি আবারও এস আলমের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে মনে করছেন তারা। এ অবস্থায় ব্যাংকটিতে রাখা আমানত নিয়ে তারা আবারও নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই শিথিল শর্তের ফলে নামমাত্র অর্থ খরচ করেই পুরোনো অনিয়মকারীদের জন্য ব্যাংকের দরজা আবারও উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো। এতে করে ব্যাংকগুলো আবারো তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে এমন একটা শঙ্কা গ্রাহকদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে। ব্যাংকগুলোর প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ফিরে এসেছিল। ফলে প্রতি মাসেই আমানত বাড়ছে। এখন যদি গ্রাহকরা দেখেন যে পুরনো লুটেরা আবার ফিরে আসছে তাহলে জমাকৃত টাকা তারা তুলে নিতে পারেন।

এ বিষয়ে কথা বললে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেন বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, ইসলামি ব্যাংকগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে এসেছে। গত মঙ্গলবার শুধু আমাদের ব্যাংকেই ৩০০ কোটি টাকা আমানত এসেছে। আমরা গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখার চেষ্টা করছি। আশা করি ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে।

আমানতের সর্বশেষ চিত্র

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস শেষে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকের আমানত ছিল ৪ লাখ ৪ হাজার ২৩ কোটি টাকা। আর পরের মাস ফেব্রুয়ারি শেষে ব্যাংকগুলোর আমানতের স্থিতি দাড়িয়েছে ৪ লাখ ৬ হাজার ২০৬ কোটি টাকা।

সেই হিসাবে এক মাসে ব্যাংকগুলোর আমানত বেড়েছে ২ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা বা শূন্য দশমিক ৫৪ শতাংশ।

তথ্য মতে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি শেষে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকের আমানত ছিল ৩ লাখ ৮২ হাজার ১২ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি শেষে ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। সেই এক বছরের ব্যবধানে ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানতের স্থিতি বেড়েছে ২৪ হাজার ১৯৪ কোটি টাকা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক, প্রচলিত ব্যাংকগুলোর ইসলামিক শাখা ও উইন্ডোগুলোর মাধ্যমে প্রবাসী আয় এসেছিল ৭২ কোটি ডলার। আর পরের ফেব্রুয়ারি মাসে এগুলোর মাধ্যমে প্রবাসী আয় এসেছে ৬৩ কোটি ডলার।

সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে প্রবাসী আয় কম এসেছে ৯ কোটি ডলার।

তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে ইসলামি ব্যাংক, শাখা ও উইন্ডোগুলোর মাধ্যমে আমদানি বিল পরিশোধ হয়েছিল ৯২ কোটি ডলার। আর পরের মাস ফেব্রুয়ারিতে এগুলোর মাধ্যমে আমদানি বিল পরিশোধ করা হয়েছে ৬৯ কোটি ডলার। সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর আমদানি বিল পরিশোধ কমেছে ২৩ কোটি ডলার।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে আসা রপ্তানি আয়ও কমেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে রপ্তানি আয় এসেছিল ৫৪ কোটি ডলার। আর পরের ফেব্রুয়ারিতে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রপ্তানি আয় এসেছে ৪৯ কোটি ডলার। সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রপ্তানি আয় কমেছে ৫ কোটি ডলার।

অর্থনীতিবিদের বিশ্লেষণ

ইসলামি ব্যাংকগুলোর উপর মানুষের আস্থা এবং নতুন শঙ্কার বিষয় নিয়ে কথা বললে অর্থনীতি গবেষক হেলাল আহমেদ খান বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে আস্তে আস্তে গ্রাহকদের মধ্যে একটা আস্থা তৈরি হয়। বিশেষত বাংলাদেশ ব্যাংকের যে সমস্ত সংস্কার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় এবং সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য যে সকল ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করে, সে থেকে জনসাধারণ বিশেষ করে আমানতকারীরা যে আস্থাটা হারিয়ে ফেলছিল, সে আস্থাটা আস্তে আস্তে ফিরে আসে।

সেই প্রেক্ষাপটে আমরা দেখেছি যে বিগত ২০২৫ সালেই ব্যাংকগুলোর প্রতি মানুষের যে ধরণের একটা অনাস্থা তৈরি হয়ে গিয়েছিল, সে জায়গা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের চলমান রিফর্মগুলো সেক্ষেত্রে সেই গ্রাহকদের মধ্যে আরেকটু আশার সঞ্চার করে।

তিনি বলেন, এই সরকার গঠন হওয়ার দুই মাসের মধ্যেই সরকারের যে ধরণের পদক্ষেপ মানুষ দেখছে, এতে মানুষ আসলে খুবই হতাশ হয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংক খাত নিয়ে ব্যাংক রেজুলেশন পাস করার কারণে আবারও গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হতে যাচ্ছে। এবং গ্রাহকরা আবারও চিন্তা করছে যে এই ব্যাংকগুলো এস আলমের মতো বা অন্যান্য যারাই ব্যাংকগুলো থেকে টাকা লুটপাট করেছে, ঋণখেলাপী হয়েছে, আবারও যদি এভাবে ব্যাংকগুলো তাদের হাতে দিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আবারও গ্রাহকদের সেই টাকা না পাওয়া বা সেই টাকাগুলো আবারও হাতছাড়া হওয়ার একটা সম্ভাবনা থেকে যায়। সেই কারণে গ্রাহকরা এখন আবারও সিদ্ধান্তহীনতায় পড়েছে যে তারা ব্যাংকগুলোর ওপর কতটুকু আস্থা রাখবে এই বিষয়ে।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের যিনি গভর্নর হয়েছেন, তিনি নিজেও একজন ঋণখেলাপী হিসেবে বা একজন ব্যবসায়ী হিসেবে ইতিমধ্যেই এটা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ জেনেছে। এই কারণে গ্রাহকের আস্থার আরেকটা সংকট তৈরি হতে পারে।

হেলাল আহমেদ বলেন, সেই সাথে আরেকটি বিষয় মানুষ অবজার্ভ করছে যে ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুতরা একটা আন্দোলন করছে বা একটা মব সৃষ্টি বা এ ধরণের কিছু করা হচ্ছে। সেখানে অন্যদিকে গ্রাহকরা আবার একটা সমাবেশ করছে। এই কারণেও মানুষ মনে করতেছে যে বড় যে ইসলামী ব্যাংকটা, সেই ব্যাংকটাও হতে পারে এভাবে বা আনস্ট্যাবিলিটি হলে সেই ব্যাংকটাও যদি সরকারের আবার আগের মতোই এতে চলে যায়। সেজন্য সবচেয়ে বড় ইসলামী ব্যাংক যেটা, এই ব্যাংকটার ওপরও মানুষ আস্থা হারানো শুরু করেছে, বিশেষত গত এই ব্যাংক রেজোলিউশন পাসের পরে। এবং আপনি দেখবেন যারা চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, চট্টগ্রামের একটা অঞ্চলের বাসিন্দা, তারা এসে আবার বিভিন্নভাবে ব্যাংক চাকরিতে যোগদান করা বা ব্যাংক দখলের একটা চিন্তা করছে।

এএ