এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের অর্ধেকের বেশি আমানত ইসলামী ধারার ব্যাংকে
সানবিডি২৪ প্রতিবেদক প্রকাশ: ২০২৬-০৬-০৫ ১৬:৪০:২০
- মোট আমানত ৫০৫৬২ কোটি টাকা
- রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ৮৮ কোটি টাকা
- প্রচলিত ধারার বাণিজ্যিক ব্যাংকের ২৩৪০৯ কোটি টাকা
- ৮টি ইসলামি ব্যাংকের ২৭০৬৫ কোটি টাকা
গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যাংকিং সেবা সমপ্রসারণ, ক্ষুদ্র সঞ্চয় সংগ্রহ এবং সহজ আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থার কারণে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এজেন্ট ব্যাংকিং। ইউএনডিপির সহায়তায় বাংলাদেশে এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর উদ্যোগ শুরু হয় ২০১৩ সালে। ওই বছর পরীক্ষামূলকভাবে বিশেষায়িত ব্যাংকিং সেবা হিসেবে এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর অনুমোদন পায় বেসরকারি খাতের ব্যাংক এশিয়া। এরপর ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর একটি নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নীতিমালা জারির কিছুদিনের মধ্যে ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করে ব্যাংক এশিয়া। এরপর থেকে অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও সারাদেশে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করতে থাকে। চলতি বছরের মার্চ শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মোট আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৫৬২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এই আমানতের মধ্যে অর্ধেকের বেশি রয়েছে ৮টি ইসলামি ধারার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে। আর মোট আমানতের প্রায় অর্ধেকই রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির দখলে।
এজেন্ট ব্যাংকিং নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানতের পরিমাণ ছিল ৪৯ হাজার ৭২০ কোটি ১৬ লাখ টাকা। আর চলতি বছরের মার্চ শেষে আমানতের পরিমাণ দাড়িয়েছে ৫০ হাজার ৫৬২ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। সেই হিসাবে তিন মাসে এজেন্ট ব্যাংকিয়ে আমানত বেড়েছে ৮৪২ কোটি টাকা।
তথ্য মতে, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ৫০ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা আমানতের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আমানত রয়েছে ৮৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা। আর পুরো টাকাটাই সোনালী ব্যাংক পিএলসির।
তথ্য বলছে, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আমানতের পরিমাণ হল ৫০ হাজার ৪৭৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রচলিত ধারার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আমানত রয়েছে ২৩ হাজার ৪০৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।
প্রচলিত ধারার বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে আমানতের শীর্ষে রয়েছে ডাচ বাংলা ব্যাংক পিএলসি। ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ হল ৭ হাজার ৯০ কোটি টাকা। আর ৬ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ব্যাংক এশিয়া। এছাড়া আমানতের দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক। ব্যাংকটির আমানত রয়েছে ১ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা। আর চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে সিটি ব্যাংক পিএলসি। ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ হল ১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ৫০ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা আমানতের মধ্যে ২৭ হাজার ৬৫ কোটি টাকা রয়েছে বেসরকারি খাতের ৮টি ইসলামী ব্যাংকের দখলে। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ হল ২২ হাজার ৯৪ কোটি টাকা। আর ৩ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা আমানত নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি।
এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রাহক বিল্লাল হোসেন বলেন, এজেন্ট ব্যাংকিং চালু হওয়ার পর ব্যাংকে যাওয়ার ঝামেলা অনেক কমেছে। এখন বাড়ির কাছেই টাকা জমা, উত্তোলন ও রেমিট্যান্স গ্রহণ করা যায়। এতে সময় বাঁচছে, খরচও কম হচ্ছে। বিশেষ করে নারী ও বয়স্ক মানুষদের জন্য এটি অনেক উপকারী সেবা।
ইসলামী ধারার একটি ব্যাংকের একজন এজেন্ট বলেন,আগে গ্রামের মানুষ সামান্য টাকা জমা দিতে বা তুলতে উপজেলা শহরে যেতে হতো। এতে সময় ও যাতায়াত ব্যয় দুটোই লাগত। এখন স্থানীয়ভাবে ব্যাংকিং সেবা পাওয়ায় কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও প্রবাসী পরিবারের সদস্যরা বেশি সুবিধা পাচ্ছেন। ফলে গ্রাহকের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে মোট হিসাবধারীর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৫৮ লাখ ৩২ হাজার ৯৮১টি। আর চলতি বছরের মার্চ শেষে হিসাবধারীর সংখ্যা দাড়িয়েছে ২ কোটি ৬৪ লাখ ৬৪ হাজার ২০৩টি। সেই হিসাবে তিন মাসে হিসাব বেড়েছে ৬ লাখ ৩১ হাজার ২২৪টি।
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, এজেন্ট ব্যাংকিং খাতে আমানত ও ঋণ উভয় ক্ষেত্রেই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে, যদিও আউটলেট ও এজেন্ট সংখ্যায় সামান্য হ্রাস একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবুও গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর গভীর প্রভাব স্পষ্ট। ক্ষুদ্র সঞ্চয়কে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যুক্ত করা, নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং প্রান্তিক অঞ্চলে আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং এখন দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে।
একটি বেসরকারী ব্যাংকের ডিএমডি বলেন, এজেন্ট ব্যাংকিং এখন শুধু একটি বিকল্প ব্যাংকিং সেবা নয়, বরং দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনতে এ সেবার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমানত ও হিসাবধারীর সংখ্যা বৃদ্ধিই প্রমাণ করে যে সাধারণ মানুষের মধ্যে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রতি আস্থা বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ক্ষুদ্র সঞ্চয় আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্ত হচ্ছে, যা দেশের সঞ্চয়ভিত্তি শক্তিশালী করছে। তবে শুধু আমানত বৃদ্ধিই নয়, এই তহবিল কতটা উৎপাদনশীল খাতে ঋণ হিসেবে যাচ্ছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
এএ






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













