বন্ধ শিল্প সচলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ফান্ড গঠন
সানবিডি২৪ প্রতিবেদক আপডেট: ২০২৬-০৬-০৫ ১৭:৩৮:১০
- চলতি মূলধনের অভাবে পূর্ণ মাত্রায় উৎপাদন বা সেবা দিতে পারছে না, এমন প্রতিষ্ঠানগুলো এই ঋণ সুবিধা পাবে
- বাংলাদেশ ব্যাংক তফসিলি ব্যাংকগুলোকে ৪ শতাংশ সুদে এই প্রাক-অর্থায়ন ঋণ দেবে
- গ্রাহক বা উদ্যোক্তা পর্যায়ে এই ঋণের সর্বোচ্চ সুদের হার হবে ৭ শতাংশ
- উভয় ক্ষেত্রে ৬ মাসের একটি ‘গ্রেস পিরিয়ড’ থাকবে, অর্থাৎ ঋণ বিতরণের প্রথম ৬ মাস
- প্রতিটি ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ ১ বছর।
দেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, মন্থর অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রাক-অর্থায়ন স্কিম গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই তহবিলের আওতায় বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের— বিশেষ করে রপ্তানিমুখী খাতের সম্পূর্ণ বন্ধ কিংবা আংশিক সচল প্রতিষ্ঠানসমূহকে পুনরায় পূর্ণ উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল (চলতি মূলধন) ঋণ দেওয়া হবে। গতকাল (বৃহস্পতিবার) বাংলাদেশ ব্যাংক এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের নিকট পাঠিয়েছে। “বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত সহায়ক প্রাক-অর্থায়ন স্কিম” নামের আবর্তনযোগ্য এই বিশেষ তহবিলের মেয়াদ হবে ৩ বছর এবং ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে এই অর্থায়ন করা হবে।
ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা ও অগ্রাধিকার নীতিমালা
সার্কুলারে বলা হয়েছে, জাতীয় শিল্প নীতি অনুযায়ী বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ প্রতিষ্ঠান এবং সচল থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় চলতি মূলধনের অভাবে পূর্ণ মাত্রায় উৎপাদন বা সেবা দিতে পারছে না, এমন প্রতিষ্ঠানগুলো এই ঋণ সুবিধা পাবে। তবে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে রপ্তানিমুখী ও প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারকদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
এছাড়া কারিগরি দক্ষতা ও পরিকাঠামো রয়েছে এমন কোনো সচল প্রতিষ্ঠান যদি বন্ধ কোনো কারখানা চালু করার উদ্দেশ্যে অধিগ্রহণ করে বা ভাড়ার চুক্তিতে নেয়, তবে তারাও অগ্রাধিকার পাবে। ঋণ অনুমোদনের পূর্বে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিষ্ঠানটির বন্ধ হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ ও উৎপাদন সক্ষমতা যাচাই করতে হবে এবং একটি বিশদ প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি উৎপাদনের সক্ষমতার বিষয়টি এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ বা বিকেএমইএ-এর মতো প্রতিনিধিত্বকারী বাণিজ্য সংগঠনের সভাপতি ও সেক্রেটারির যৌথ স্বাক্ষরযুক্ত প্রত্যয়নপত্র দ্বারা সমর্থিত হতে হবে। সিআইবি-তে খেলাপী হিসেবে চিহ্নিত কোনো ঋণগ্রহীতা এই স্কিমের আওতায় ঋণ পাওয়ার যোগ্য হবেন না।
শ্রমিকদের বেতন যাবে এমএফএস অ্যাকাউন্টে
এই স্কিমের আওতায় প্রাপ্ত ঋণ দিয়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, কাঁচামাল সংগ্রহ এবং রপ্তানি অর্ডার বাস্তবায়নের মতো সরাসরি উৎপাদনমুখী ব্যয় নির্বাহ করা যাবে। তবে কোনোভাবেই এই ঋণ দিয়ে প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান অন্য কোনো ঋণ হিসাব সমন্বয় বা পরিশোধ করা যাবে না। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৪ মাসের সমপরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা যাবে। এই বেতন সরাসরি শ্রমিক-কর্মচারীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে পাঠাতে হবে এবং কোনো প্রকার নগদ (ক্যাশ) লেনদেন করা যাবে না। বেতন বিতরণের সময় ব্যাংক বাধ্যতামূলকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্মীর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পরীক্ষা করবে। যেসব শ্রমিকের অ্যাকাউন্ট নেই, প্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে তাদের অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যবস্থা করবে এবং ব্যাংকগুলো ন্যূনতম জমা (জিরো ব্যালেন্স) ছাড়াই কোনো চার্জ ছাড়া এই হিসাব খুলে দেবে।
সুদের হার ও ঋণ সীমা
বাংলাদেশ ব্যাংক তফসিলি ব্যাংকগুলোকে ৪ শতাংশ সুদে এই প্রাক-অর্থায়ন ঋণ দেবে। অন্যদিকে, গ্রাহক বা উদ্যোক্তা পর্যায়ে এই ঋণের সর্বোচ্চ সুদের হার হবে ৭ শতাংশ। উভয় ক্ষেত্রে ৬ মাসের একটি ‘গ্রেস পিরিয়ড’ থাকবে, অর্থাৎ ঋণ বিতরণের প্রথম ৬ মাস (দুই ত্রৈমাসিক) কোনো সুদ আদায় বা প্রদান করতে হবে না। প্রতিটি ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ ১ বছর। তবে সুবিধাবঞ্চিত অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সুযোগ নিশ্চিত করতে কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা শিল্প গ্রুপ কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে এই তহবিল থেকে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকার বেশি মূল ঋণ সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে না। ঋণের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে সংশ্লিষ্ট অর্থায়নকারী ব্যাংকের একজন প্রতিনিধি বা বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি নিয়োগের লিখিত সম্মতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
অপব্যবহারের শাস্তি ও কড়া নজরদারি
তহবিলের অপব্যবহার রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক অত্যন্ত কঠোর অবস্থান ঘোষণা করেছে। ব্যাংকগুলোকে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানের সেলস বা রেভিনিউ রিপোর্ট সংগ্রহ করতে হবে এবং ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ফ্যাক্টরি পরিদর্শন করে প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব পরিদর্শনে যদি কোনো ঋণের সদ্ব্যবহার না হওয়ার প্রমাণ মেলে, তবে ওই অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের চলতি হিসাব থেকে গ্রাহককে দেওয়া হার অপেক্ষা অতিরিক্ত ২% (অর্থাৎ ৯%) সুদে এককালীন কেটে নেওয়া হবে। কোনো ভুল বা মিথ্যা তথ্য, অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ নেওয়া হলে বা তা খেলাপী হলে গ্রাহকদের তথ্য সরকারের সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় পাঠানো হবে এবং অনিয়মের সাথে ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জারিকৃত এই নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এএ






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













