সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত এক বছরে বেড়েছে ৪১%

সানবিডি২৪ প্রতিবেদক প্রকাশ: ২০২৬-০৬-১৮ ২১:৪৮:৩৭


  • বাংলাদেশিদের আমানত ৪১% বেড়ে ১২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা
  • মোট আমানতের ৯৮.৬% বিভিন্ন বাংলাদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের
  • দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান
  • সুইস তথ্য বিনিময় চুক্তিতে নেই বাংলাদেশ, সম্পদের পূর্ণ তথ্য অজানা

সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে (সুইস ব্যাংক) বাংলাদেশি নাগরিক ও ব্যাংকগুলোর জমা রাখা অর্থের পরিমাণ এক বছরে ৪১ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালের শেষে এই আমানতের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪২ লাখ সুইস ফ্রাঁ। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক’ (এসএনবি) বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ব্যাংক খাতের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখান থেকে আমানতের এই চিত্র পাওয়া গেছে।

এসএনবি’র তথ্য অনুযায়ী, আমানতের পরিমাণ সুইজারল্যান্ডের ইতিহাসে বাংলাদেশিদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আমানতের রেকর্ড। এর আগে ২০২১ সালে সর্বোচ্চ ৮৭ কোটি ১১ লাখ সুইস ফ্রাঁ জমা ছিল।

তবে সুইস ব্যাংকের এই প্রতিবেদনে কর ফাঁকি দিয়ে বা অবৈধ উপায়ে দেশ থেকে পাচার করা ‘কালো টাকা’র কোনো হিসাব থাকে না। এগুলো কেবল বিভিন্ন দেশের গ্রাহক ও ব্যাংকগুলোর অফিশিয়াল বা বৈধ হিসাব।

বাণিজ্যিক ব্যাংকের আমানত বেশি

প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আমানতের এই বড় লাফের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তহবিল। এক বছরের ব্যবধানে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর আমানত ৪৩ শতাংশ বেড়ে ৫৭ কোটি ৬৬ লাখ ফ্রাঁ থেকে ৮২ কোটি ২৭ লাখ ফ্রাঁতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, সুইজারল্যান্ডে থাকা বাংলাদেশিদের মোট আমানতের ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশই বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের অর্থ।

এই বিষয়ে একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর এই তহবিল মূলত তাদের স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম বা বাণিজ্যের অংশ, কোনো অবৈধ সম্পদ নয়। ব্যাংকগুলো নিয়মিতভাবে বিভিন্ন দেশে এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তহবিল জমা রাখে, যেখানে তারা সবচেয়ে ভালো রিটার্ন বা মুনাফা পায়। মুনাফা ও বিনিয়োগের সুযোগের ওপর ভিত্তি করে ব্যাংকগুলো তহবিল এক দেশ থেকে অন্য দেশে স্থানান্তর করে, তাই একে অস্বাভাবিক বলার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে, ব্যাংকগুলোর আমানত বাড়লেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে বাংলাদেশিদের আমানত কমেছে। ব্যক্তিগত গ্রাহকদের অ্যাকাউন্টে জমার পরিমাণ প্রায় ১০ শতাংশ কমে ১ কোটি ২৬ লাখ ফ্রাঁ থেকে ১ কোটি ১৪ লাখ সুইস ফ্রাঁতে নেমে এসেছে।

তথ্য বিনিময়ের বৈশ্বিক চুক্তিতে নেই বাংলাদেশ

গ্রাহকের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য সুইস ব্যাংকগুলোর যে সুনাম বা দুর্নাম ছিল, তা ভাঙতে ২০১৮ সাল থেকে তারা কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার রোধে ‘অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ অব ইনফরমেশন’ (এইওআই) বা স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা চালু করে। এর অধীনে ২০২৫ সালে সুইজারল্যান্ড বিশ্বের ১০১টি দেশের প্রায় ৩৪ লাখ আর্থিক অ্যাকাউন্টের গ্রাহকের নাম, ঠিকানা ও করসংক্রান্ত তথ্য বিনিময় করেছে।

উন্নত দেশগুলোর সংগঠন ওইসিডি’র গ্লোবাল ফোরামের ২০২৬ সালের মে মাসের সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার ভারত ও পাকিস্তান এই তথ্য বিনিময় চুক্তিতে অংশ নিলেও বাংলাদেশ এখনো এতে যুক্ত হয়নি। ফলে বাংলাদেশিরা সেখানে কী পরিমাণ সম্পদ রাখছেন, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে জানার আইনি সুযোগ এখনো তৈরি হয়নি।

দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় বাংলাদেশ

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সুইস ব্যাংকে আমানত রাখার দিক থেকে ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। এই অঞ্চলে ভারতের নাগরিক ও ব্যাংকগুলোর আমানতের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি—৩২০ কোটি সুইস ফ্রাঁ (যদিও আগের বছরের চেয়ে তাদের আমানত ৮ শতাংশ কমেছে)।

সার্বিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৫ সালে ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও ভুটান সুইস ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে নিয়েছে; অন্যদিকে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান এবং মালদ্বীপের আমানত বেড়েছে। শতাংশের হিসেবে আফগানিস্তানে সবচেয়ে বেশি (৪৮.২%) প্রবৃদ্ধি হলেও অঙ্কের বিচারে তা খুবই সামান্য (৪৭ লাখ ফ্রাঁ)।

অতীতের রেকর্ড কী বলছে?

প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২১ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা রাখা অর্থের পরিমাণ ৮৭১.১ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে পৌঁছায়। যা দেশটির ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ জমা।

তবে ২০২০ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ তার আগের বছরের তুলনায় কম ছিল। ওই বছর সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ ছিল ৫৬ কোটি ৩০ লাখ সুইস ফ্রাঁ; যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ হাজার ২০৩ কোটি টাকার বেশি।

তার আগের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে দেশটির বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা করা অর্থের পরিমাণ ছিল ৬০ কোটি ৩০ লাখ ফ্রাঁ। ২০১৮ সালে এই অর্থের পরিমাণ ছিল ৬২ কোটি সুইস ফ্রাঁ। আর ২০১৭ সালে এর পরিমাণ ছিল ৬৬ কোটি ১৯ লাখ সুইস ফ্রাঁ।

সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের ‘মোট দায়ের’ মধ্যে ব্যক্তিগত, ব্যাংক এবং অন্যান্য উদ্যোগের আমানতসহ সব ধরনের তহবিল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার মানুষ সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বৈধ-অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থ গচ্ছিত রাখেন। দেশটির কঠোর গোপনীয় ব্যাংকিং নীতির কারণে সারা দুনিয়ার মানুষ সেখানে অর্থ জমা রাখেন।

সুইজারল্যান্ডের আইনে গ্রাহকদের গোপনীয়তা দৃঢ়ভাবে রক্ষার নিয়ম রয়েছে। এ আইনের ফলে দেশটির ব্যাংকগুলো কোনো পরিস্থিতিতেই গ্রাহকদের তথ্য কারও কাছে প্রকাশে বাধ্য নয়।

ফলে কারা, কেন অথবা কীভাবে অর্থ ব্যাংকে রাখছেন, সে সম্পর্কে ব্যাংকগুলো কাউকে কোনো তথ্য দেয় না। তবে সম্প্রতি গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় ও সমালোচনা দেখা দেওয়ায় অনেকে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংক থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশে তাদের অর্থ সরিয়ে নিচ্ছেন।

এএ