শিক্ষিত বেকার: রাষ্ট্রের শক্তি না দায়?

সানবিডি২৪ প্রকাশ: ২০২৬-০৬-২৩ ১২:০০:৩১


বাংলাদেশ আজ এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তরুণ জনগোষ্ঠী, অন্যদিকে সেই জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সামনে কাজের দরজা বন্ধ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ শ্রমশক্তির সংখ্যা ২ কোটি ৬৭ লাখ ৬০ হাজার। এর মধ্যে কর্মে নিয়োজিত আছেন ২ কোটি ৪৮ লাখ ২০ হাজার এবং বেকার ১৯ লাখ ৪০ হাজার। সংখ্যাটি প্রথম দেখায় খুব ভয়াবহ মনে নাও হতে পারে। কিন্তু পরিসংখ্যানের গভীরে নামলেই দেখা যায় আসল সংকটটি কোথায়। দেশের মোট বেকার জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশই শিক্ষিত, আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীদের মধ্যেই বেকারত্ব সবচেয়ে বেশি। সাম্প্রতিক শ্রমশক্তি জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক কাজহীন অবস্থায় আছেন এবং প্রতি তিনজন বেকারের একজনই বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী।

সমস্যাটি কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও। কোনো রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। সেই জনগোষ্ঠী যদি দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকে, তাহলে হতাশা, সামাজিক অস্থিরতা, মেধা পাচার এবং রাজনৈতিক চরমপন্থার ঝুঁকি বাড়ে। ইতিহাস বলছে, তরুণ বেকারত্ব কখনোই শুধু শ্রমবাজারের সমস্যা হয়ে থাকে না। ২০১১ সালের আরব বসন্তের পেছনে খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি উচ্চ শিক্ষিত যুবকদের দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব বড় ভূমিকা রেখেছিল। উত্তর আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত বহু দেশে রাষ্ট্রব্যবস্থা নড়বড়ে হয়ে উঠেছিল মূলত কর্মসংস্থানের সংকটের কারণে। বাংলাদেশ এখনো সেই অবস্থায় পৌঁছায়নি, কিন্তু সতর্ক সংকেতগুলো স্পষ্ট।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশে প্রায় ৮০ লাখ তরুণ এমন অবস্থায় আছে যারা শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা কোনো প্রশিক্ষণের মধ্যেই নেই। আন্তর্জাতিক পরিভাষায় এদের বলা হয় NEET—Not in Education, Employment or Training। এদের মধ্যে প্রায় ৬২ শতাংশ নারী। অর্থাৎ দেশের বিপুল মানবসম্পদ কার্যত উৎপাদন প্রক্রিয়ার বাইরে পড়ে আছে।

প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি শতভাগ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারে? অর্থনীতির ভাষায় এর সরল উত্তর হচ্ছে—না। পৃথিবীর কোনো দেশেই শতভাগ কর্মসংস্থান বাস্তব নয়। এমনকি বিশ্বের অন্যতম সফল শ্রমবাজারের দেশগুলোর মধ্যেও কিছু মাত্রার স্বাভাবিক বেকারত্ব থাকে। কিন্তু রাষ্ট্র এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারে যেখানে কর্মক্ষম ও শিক্ষিত মানুষের জন্য কাজের সুযোগ এত বেশি থাকবে যে দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব ব্যতিক্রম হয়ে দাঁড়াবে, নিয়ম নয়।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হচ্ছে আমরা শিক্ষা পরিকল্পনা এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে আলাদা খাতে পরিচালনা করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতি বছর হাজার হাজার স্নাতক তৈরি করছে, কিন্তু অর্থনীতি সেই অনুপাতে জ্ঞানভিত্তিক চাকরি সৃষ্টি করতে পারছে না। ফলাফল হলো ডিগ্রি বাড়ছে, আয় বাড়ছে না। এই অসামঞ্জস্য দূর করতে হলে প্রথমেই জাতীয় পর্যায়ে “শিক্ষা-শিল্প সমন্বয় কমিশন” গঠন করা প্রয়োজন। কোন খাতে আগামী দশ বছরে কতজন দক্ষ কর্মী লাগবে, কোন বিষয়ে কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি হবে, কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়বে—এসব বিষয়ে বাধ্যতামূলক পরিকল্পনা দরকার।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের কর্মসংস্থান কৌশলকে পোশাকশিল্পনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিশ্বের অর্থনীতি দ্রুত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, ডেটা সেবা, সাইবার নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ডিজিটাল বাণিজ্যের দিকে যাচ্ছে। ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ভারত গত এক দশকে প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে লাখ লাখ দক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। বাংলাদেশ যদি শুধুমাত্র গার্মেন্টসের ওপর নির্ভর করে থাকে, তাহলে শিক্ষিত বেকারত্ব আরও বাড়বে। কারণ একজন বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকের কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা এবং শিল্পখাতের বিদ্যমান চাহিদার মধ্যে বড় ফারাক রয়েছে।

তৃতীয়ত, রাষ্ট্রকে উদ্যোক্তা তৈরির দিকে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। বাংলাদেশে ব্যাংকঋণের কাঠামো এখনো মূলত প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের পক্ষে। নতুন উদ্যোক্তা, বিশেষ করে তরুণ উদ্যোক্তা, ঋণ পাওয়ার আগেই জামানতের দেয়ালে আটকে যায়। অথচ বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির জন্ম হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ ধারণা থেকে। সরকার যদি জেলা পর্যায়ে “স্টার্টআপ তহবিল”, কর অবকাশ এবং সরকারি ক্রয়ে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সংরক্ষিত অংশ চালু করে, তাহলে হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। রাষ্ট্র নিজে সব চাকরি দিতে পারবে না; কিন্তু চাকরি সৃষ্টিকারী উদ্যোক্তা তৈরি করতে পারে।

চতুর্থত, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষাকে জাতীয় আন্দোলনের পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশের শ্রমবাজারে একটি বড় বৈপরীত্য রয়েছে। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক বেকার, অন্যদিকে শিল্পকারখানা দক্ষ প্রযুক্তিবিদ খুঁজে পায় না। জার্মানির ডুয়াল ভোকেশনাল মডেল কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্পসংযুক্ত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা দেখিয়েছে, দক্ষতা ও শিল্পের সংযোগ ঘটলে যুব বেকারত্ব দ্রুত কমে।বাংলাদেশের প্রতিটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে নির্দিষ্ট কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সংযুক্ত করা উচিত।

পঞ্চমত, বিদেশে কর্মসংস্থানের কৌশল আমূল বদলাতে হবে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে স্বল্পদক্ষ শ্রমিক রপ্তানির ওপর নির্ভর করেছে। ফলে রেমিট্যান্স এসেছে, কিন্তু মানবসম্পদের মূল্যবৃদ্ধি হয়নি। আগামী দশকে ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে জনসংখ্যার বার্ধক্যের কারণে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি বাড়বে। বাংলাদেশ যদি ভাষা শিক্ষা, আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতার সনদায়নে বিনিয়োগ করে, তাহলে লাখ লাখ তরুণ উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরকারি চাকরির প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ বছরের পর বছর বিসিএস, ব্যাংক বা অন্যান্য নিয়োগ পরীক্ষার পেছনে সময় ব্যয় করেন। বাস্তবতা হচ্ছে রাষ্ট্র কখনোই কোটি কোটি তরুণকে সরকারি চাকরি দিতে পারবে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব চাকরি দেওয়া নয়, চাকরির পরিবেশ সৃষ্টি করা। এই মানসিক পরিবর্তন শিক্ষা ব্যবস্থা থেকেই শুরু করতে হবে।

সবশেষে যে বিষয়টি সবচেয়ে জরুরি, তা হলো বিনিয়োগ। কোনো অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ছাড়া কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতি-স্থিতিশীলতা, দ্রুত সেবা, আইনের শাসন এবং অবকাঠামোগত নিশ্চয়তা দিতে না পারলে নতুন শিল্প আসবে না। আর নতুন শিল্প না এলে শিক্ষিত তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হবে না। প্রতি বছর গড়ে ১৩ লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। এই প্রবাহের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করতে না পারলে বেকারত্বের চাপ আরও বাড়বে।

বাংলাদেশ এখন একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি পদ্মা সেতু নয়, মেট্রোরেল নয়, গভীর সমুদ্রবন্দরও নয়। সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু এই শক্তি যদি কর্মহীন থাকে, তাহলে তা আশীর্বাদ থেকে বোঝায় পরিণত হবে। রাষ্ট্রের সামনে তাই একটাই পথ খোলা আছে—ডিগ্রিকেন্দ্রিক অর্থনীতি থেকে দক্ষতাকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে রূপান্তর, আমলাতান্ত্রিক চাকরির স্বপ্ন থেকে উদ্যোক্তাভিত্তিক সমাজে উত্তরণ, আর বিনিয়োগবিমুখ নীতি থেকে উৎপাদনমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে যাত্রা। নচেৎ আগামী দিনের ইতিহাস হয়তো লিখবে, বাংলাদেশ তার জনমিতিক সুযোগকে সম্পদে রূপান্তর করার আগেই সেটিকে হারিয়ে ফেলেছিল।

মো. মাহমুদুল হাসান

ভূরাজনৈতিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন কৌশল বিশ্লেষক

এনজে