চীনের জিডিআই: নতুন দরজা, নাকি নতুন কূটনীতি?
সানবিডি২৪ প্রকাশ: ২০২৬-০৬-২৫ ১৩:১৫:২৯
বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন কোনো একটি ধারণা বন্দরের ক্রেন, মহাসড়কের কংক্রিট কিংবা যুদ্ধজাহাজের শক্তিকে ছাড়িয়ে গিয়ে রাষ্ট্রগুলোর কল্পনাশক্তিকে দখল করে নেয়। একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে চীনের “গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ” বা জিডিআই ঠিক তেমনই একটি ধারণা। এটি কোনো সামরিক জোট নয়, কোনো মুক্তবাণিজ্য চুক্তিও নয়। আবার এটি কেবল উন্নয়ন সহায়তার আরেকটি নামও নয়। বরং জিডিআইকে বোঝার জন্য আমাদের বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান সংকট, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের ক্রমবর্ধমান হতাশাকে একসঙ্গে দেখতে হবে।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৬তম অধিবেশনে চীনের প্রেসিডেন্ট Xi Jinping এই উদ্যোগের ঘোষণা দেন। তখন পৃথিবী করোনাভাইরাস মহামারির অভিঘাতে বিপর্যস্ত। বহু উন্নয়নশীল দেশ ঋণের চাপে জর্জরিত, খাদ্য নিরাপত্তা অনিশ্চিত, স্বাস্থ্যব্যবস্থা দুর্বল এবং জাতিসংঘের ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছিল। সেই প্রেক্ষাপটে বেইজিং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছিল—বিশ্ব কি উন্নয়নকে তার কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক এজেন্ডা হিসেবে হারিয়ে ফেলেছে? জিডিআই সেই প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা।
একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, গত এক দশকে চীনের বৈদেশিক কৌশল ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে। ২০১৩ সালে ঘোষিত Belt and Road Initiative ছিল মূলত অবকাঠামোভিত্তিক। বন্দর, রেলপথ, মহাসড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র—এসব ছিল তার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমালোচকরাও প্রশ্ন তুলেছেন, কেবল অবকাঠামো কি উন্নয়নের নিশ্চয়তা দিতে পারে? রাস্তা তৈরি হলো, কিন্তু দক্ষ জনশক্তি তৈরি হলো কি? বন্দর দাঁড়াল, কিন্তু ডিজিটাল অর্থনীতি এগোল কি? জিডিআই সেই শূন্যস্থান পূরণের দাবি করছে। বলা যায়, বিআরআই যেখানে ছিল ইট-পাথরের গল্প, জিডিআই সেখানে মানুষের গল্প।
এই উদ্যোগের আটটি প্রধান ক্ষেত্র—দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, উন্নয়ন অর্থায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, ডিজিটাল অর্থনীতি, শিল্পায়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন—খুব সচেতনভাবেই নির্বাচন করা হয়েছে। কারণ এগুলোই আজকের উন্নয়নশীল বিশ্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ এশিয়া, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র থেকে লাতিন আমেরিকা—সব জায়গায় একই ধরনের প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কীভাবে কর্মসংস্থান বাড়বে? কীভাবে প্রযুক্তিগত বৈষম্য কমবে? কীভাবে জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করা হবে? জিডিআই নিজেকে এই প্রশ্নগুলোর উত্তরদাতা হিসেবে তুলে ধরতে চায়।
তবে জিডিআইকে কেবল উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর ভেতরে রয়েছে এক গভীর ভূরাজনৈতিক বার্তা। শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন কাঠামো দীর্ঘদিন পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণে ছিল। World Bank, International Monetary Fund কিংবা বিভিন্ন দাতা সংস্থা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থায়নের প্রধান উৎস ছিল। কিন্তু গত দুই দশকে চীনের উত্থান সেই বাস্তবতায় পরিবর্তন এনেছে। বেইজিং এখন শুধু কারখানা বা রপ্তানি শক্তি নয়; এটি উন্নয়ন অর্থনীতিরও একটি বড় খেলোয়াড়। জিডিআই সেই নতুন অবস্থানকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা।
এখানেই বিতর্কের শুরু। চীনের ভাষ্যে জিডিআই হলো “উন্নয়নকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার” উদ্যোগ। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতা এত সরল নয়। কোনো বৃহৎ শক্তি কখনোই নিছক দাতব্য প্রতিষ্ঠানের মতো কাজ করে না। যুক্তরাষ্ট্র যেমন Marshall Plan ব্যবহার করে ইউরোপে প্রভাব বিস্তার করেছিল, তেমনি চীনও উন্নয়ন সহযোগিতার মাধ্যমে তার কূটনৈতিক উপস্থিতি সুদৃঢ় করতে চাইবে—এটাই স্বাভাবিক। প্রশ্ন হলো, সেই প্রভাব কতটা পারস্পরিক লাভজনক হবে এবং কতটা রাজনৈতিক নির্ভরতা সৃষ্টি করবে।
বিশ্বব্যাপী জিডিআইয়ের গ্রহণযোগ্যতাও লক্ষণীয়।
জাতিসংঘে “গ্রুপ অব ফ্রেন্ডস অব গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ”-এ ৮০টিরও বেশি সদস্য যুক্ত হয়েছে বলে চীনা কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। ২০২৫ সালে এই গ্রুপের সদস্যসংখ্যা ৮৩ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি কেবল সংখ্যার খেলা নয়। এর অর্থ হলো, বৈশ্বিক দক্ষিণের একটি বড় অংশ বর্তমান উন্নয়ন কাঠামোর বিকল্প কিংবা পরিপূরক পথ খুঁজছে।
আজকের পৃথিবীতে উন্নয়ন এবং ভূরাজনীতি একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। উদাহরণ হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কথাই ধরা যাক। প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব এখন জাতীয় শক্তির নতুন মাপকাঠি। চীন ইতোমধ্যে বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে নতুন আন্তর্জাতিক উদ্যোগের কথা বলছে। এর পেছনেও একই দর্শন কাজ করছে—প্রযুক্তিগত সম্পদ যেন কেবল অল্প কয়েকটি দেশের হাতে সীমাবদ্ধ না থাকে। জিডিআইয়ের ডিজিটাল অর্থনীতি খাতকে তাই কেবল প্রযুক্তি প্রকল্প হিসেবে নয়, ভবিষ্যৎ ক্ষমতার রাজনীতির অংশ হিসেবেও দেখতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য এই উদ্যোগের তাৎপর্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে উন্নয়ন অর্থায়ন। অনুদান কমবে, সহজ শর্তের ঋণও ধীরে ধীরে সীমিত হবে। এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প অর্থায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের নতুন উৎস খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। জিডিআই যদি বাস্তব অর্থে প্রযুক্তি সহযোগিতা, ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শিল্পায়নকে এগিয়ে নিতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু সুযোগের পাশাপাশি সতর্কতার জায়গাও আছে। উন্নয়ন সহায়তার নামে কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি বরাবরই ভারসাম্য রক্ষা। সেই ঐতিহ্য বজায় রেখেই জিডিআইকে মূল্যায়ন করতে হবে। এখানে আবেগ নয়, প্রয়োজন হবে বাস্তববাদী হিসাব-নিকাশের। কোন প্রকল্পে কী লাভ হবে, প্রযুক্তি হস্তান্তরের শর্ত কী, স্থানীয় সক্ষমতা কতটা বাড়বে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
আসলে জিডিআইয়ের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য অর্থের অঙ্কে নয়, ধারণার অঙ্কে। এটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বিশ্বায়নের পুরোনো প্রতিশ্রুতিগুলো অনেক জায়গায় প্রশ্নবিদ্ধ। বৈষম্য বেড়েছে, উন্নয়ন লক্ষ্য পিছিয়ে পড়েছে, জলবায়ু সংকট তীব্র হয়েছে। এই বাস্তবতায় উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশ মনে করছে, তাদের কণ্ঠ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। জিডিআই সেই অসন্তোষকে একটি সংগঠিত ভাষা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
শেষ পর্যন্ত জিডিআই সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে তার ঘোষণাপত্রের ওপর নয়, বাস্তব ফলাফলের ওপর। উন্নয়নশীল দেশের কৃষকের আয় বাড়ে কি না, তরুণদের কর্মসংস্থান তৈরি হয় কি না, প্রযুক্তিগত বৈষম্য কমে কি না—সেই পরীক্ষাতেই এর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, বড় বড় আন্তর্জাতিক উদ্যোগের জন্ম অনেক হয়েছে; কিন্তু টিকে থাকে কেবল সেগুলোই, যেগুলো মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনে।
চীন আজ বিশ্বকে একটি নতুন উন্নয়ন ভাষ্য শোনাতে চাইছে। সেই ভাষ্যের নাম জিডিআই। এটি হয়তো বৈশ্বিক দক্ষিণের জন্য নতুন সম্ভাবনার জানালা খুলবে, আবার হয়তো আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের নতুন অধ্যায়ও লিখবে। সত্যি বলতে, দুই সম্ভাবনাই একসঙ্গে বিদ্যমান। আর আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে মজার বিষয়ও বোধহয় এটাই—এখানে কোনো উদ্যোগ কখনোই শুধু উন্নয়ন নয়, আবার শুধু ক্ষমতার খেলাও নয়। দুয়ের মাঝখানে কোথাও তার প্রকৃত অবস্থান।
মো. মাহমুদুল হাসান
ভূরাজনৈতিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন কৌশল বিশ্লেষক
এনজে






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন














