ড. শহিদুল ইসলাম জাহিদ
২০৪১ সালে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির জন্য বীমা খাতের অবদান ১০ গুণ বাড়াতে হবে
সানবিডি২৪ প্রতিবেদক প্রকাশ: ২০২৬-০৬-২৭ ১৭:৫৬:৩৪
২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে হলে দেশের বীমা খাতের পেনিট্রেশন বা অবদান আগামী ৮ থেকে ১০ বছরের মধ্যে বর্তমানের চেয়ে অন্তত ১০ গুণ বাড়াতে হবে। দেশের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির সাথে তাল মিলিয়ে এই খাতের আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি।
শনিবার (২৭ জুন) রাজধানীর বিজয়নগরের হোটেল একাত্তরে ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরাম (আইআরএফ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বীমা খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শহিদুল ইসলাম জাহিদ এসব কথা বলেন।
অর্থনীতির অন্যতম দুর্বল স্তম্ভ বীমা খাত
ড. শহিদুল ইসলাম জাহিদ তাঁর বক্তব্যে অর্থনীতির কাঠামো বিশ্লেষণ করে বলেন, “বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত চারটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে— পুঁজিবাজার, মানি মার্কেট (ব্যাংকিং খাত), বন্ড মার্কেট এবং বীমা খাত। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, দেশের এই অর্থনৈতিক জাগরণ ও বিস্তারে ইন্স্যুরেন্স সেক্টর বা বীমা খাত এখনো একেবারে নগণ্য ভূমিকা পালন করে চলেছে।”
তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, “বর্তমানে দেশের জিডিপির আকার প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার। ২০৪১ সালের ভিশন পূরণ করতে হলে আগামী ৮-১০ বছরের মধ্যে এই জিডিপিকে ডাবল বা ১ ট্রিলিয়ন ডলারে রূপান্তর করতে হবে। এর জন্য প্রতি বছর গড়ে ৬ থেকে ৭ শতাংশ হারে স্টেডি এবং সাস্টেইনেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা জরুরি। অথচ বর্তমানে জিডিপিতে বীমার অবদান মাত্র ০.৩২ শতাংশ। এই লক্ষ্য ছুঁতে হলে আগামী এক দশকের মধ্যে বীমার অবদান ৩ থেকে ৪ শতাংশে উন্নীত করতেই হবে।”
ঝুঁকি বাড়ছে, বীমা খাতকে ‘ত্রাণকর্তা’ হতে হবে
দেশের ১৮ থেকে ২০ কোটি মানুষের জীবন ও সম্পদের ঝুঁকির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “বিশ্বব্যাপী ঝুঁকির কোনো শেষ নেই। গতকাল রাতেই রাজধানীর কাটাবনে বহুতল ভবনে আগুন লেগেছে, রাস্তাঘাটে প্রতিদিন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু হচ্ছে, আবার মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় হু হু করে বাড়ছে। অন্যদিকে হাওরে ফসল হারিয়ে কৃষকরা চরম সংকটে পড়ছেন। এই যে ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতি, এই ঝুঁকি মিটিগেট বা সেফগার্ড করার দায়িত্ব কিন্তু আপনাদের। বীমা খাতকে এ দেশের সাধারণ মানুষের সুরক্ষায় ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হতে হবে।”
তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, “ব্যবসা করতে গেলে শুধু শর্ট-টার্ম প্রফিট দেখলেই চলে না, টেকসই বিজনেস গ্রোথের কথা চিন্তা করতে হবে। দেশের মানুষকে ফিন্যান্সিয়ালি লিটারেট (আর্থিক জ্ঞানসম্পন্ন) করতে না পারলে যেকোনো অর্থনৈতিক উন্নয়ন আসলে ভেস্তে যাবে।”
বীমা খাতের ৩টি বড় চ্যালেঞ্জ ও সমাধান
অধ্যাপক জাহিদ বীমা খাতের সামগ্রিক স্থবিরতার পেছনে তিনটি প্রধান সংকট বা চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেন:
১. রেগুলেটরি ফেইলিওর (বাজার ব্যর্থতা): বাজারে চাহিদার তুলনায় যুগোপযোগী প্রডাক্টের জোগান না থাকা।
২. মোরাল হ্যাজার্ড (নৈতিক বিপত্তি): তথ্য লুকিয়ে রাখা বা ইনফরমেশন অ্যাসিমেট্রি, যা গ্রাহক ও কর্পোরেশন উভয় পর্যায়েই হচ্ছে।
৩. এজেন্সি প্রবলেম (স্বার্থের দ্বন্দ্ব): মালিক, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) আইনি সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আইডিআরএ-এর হাত-পা আইনের বেড়াজালে কিছুটা বাঁধা। তবে মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে আইনের ফাঁকফোকর বন্ধ করে রেগুলেটরি ফেইলিওর মেকআপ করতে হবে। একই সাথে এই খাত নিয়ে কোনো আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র বা ক্রস-বর্ডার কর্পোরেশনের বাজার দখলের চেষ্টা আছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা দরকার।”
সবশেষে তিনি বীমা খাতের টেকসই বিকাশের লক্ষ্যে যথাযথ গবেষণা জোরদার করা, দক্ষ লোকবল সৃষ্টি এবং গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে বক্তব্য শেষ করেন।
সেমিনারে ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরামের (আইআরএফ) সভাপতি গোলাম মওলার সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন বিআইএ সভাপতি সাঈদ আহমেদ এবং আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দৈনিক যুগান্তরের বিজনেস এডিটর মনির হোসেন এবং অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বাণিজ্য প্রতিদিন পত্রিকার সম্পাদক ও আইআরএফ’র সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন।
বিএইচ






সানবিডি২৪ এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













